সম্পূর্ণ আকার পাইলে কুমরে-পােকারা আর সেই ছােট ঘরের অন্ধকারে আটক্ থাকিতে চায় না। দাঁত ও পা দিয়া বাসার দেওয়ালে ছিদ্র করিয়া বাহির হইয়া পড়ে। ইহাই সাধারণ কুমরে-পােকাদের ঘর-বাড়ীর ও জীবনের কথা।
৬.২.৪ ঝিল্লীপক্ষ পতঙ্গ : কাঁচ-পােকা
কাঁচ-পােকা
তােমরা কাঁচ-পােকা নিশ্চয়ই দেখিয়াছ। ইহাদের গায়ের রঙ্টি কেমন চক্চকে নীল! শরীরটা কাচের মত চক্চকে বলিয়াই বােধ হয় ইহাদিগকে কাঁচ-পােকা বলা হয়। কাঁচ-পােকা ধরিবার জন্য ছেলেবেলায় যে কত ছুটাছুটি করিয়াছি তাহা এখনাে মনে আছে। ইহাদের লেজে যে-সকল শক্ত আংটির মত আবরণ থাকে, তাহা কাটিয়া মেয়েদিগকে টিপ পরিতে দেখিয়াছি।
কাঁচ-পােকা বােল্তা-জাতীয় পতঙ্গ। কিন্তু ইহারা কখনই বােল্তাদের মত চাক বাধে না বা দলবদ্ধ হইয়া বাস করে না এবং কুমরে-পােকাদের মত ঘরও বানায় না। ইহারা একেবারে বুনাে পতঙ্গ। গাছের পচা রকমের কাঠে গর্ত্ত করিয়া ইহারা বাস করে। কয়েক জাতি কাঁচ-পােকাকে আমরা মাটিতে গর্ত্ত করিয়াও থাকিতে দেখিয়াছি।
ছােট বা বড় পােকা-মাকড়ই কাঁচ-পােকাদের প্রধান খাদ্য। যখন ইহারা তােমাদের বাগানে ঘুরিয়া বেড়ায়, তখন কেবল পােকা ধরিবারই ফন্দি করে। অনেক কাঁচ-পােকাকে গর্ত্তের মধ্যে গিয়া পােকা ধরিয়া আনিতে দেখা গিয়াছে।
ইহারা কি রকমে আরসুলা শিকার করে তোমরা দেখ নাই কি? আরসুলার মত বড় প্রাণীকে কাঁচ-পোকারা জব্দ করিয়া ছাড়ে। একটা ছোট কাঁচ-পোকা প্রকাণ্ড আরসুলাকে শুঁয়ো ধরিয়া হিড়্ হিড়্ করিয়া টানিতেছে ইহা প্রায়ই দেখা যায়। তখন আরসুলা বেচারা দড়ায়-বাঁধা শান্ত গোরুর মত কাঁচ-পোকার পিছনে পিছনে চলে। ইহা দেখিলে সত্যই হাসি পায় এবং দুঃখও হয়। নিজেকে রক্ষা করিবার জন্য আরসুলার হুল নাই, দাঁতে বিষ নাই, কেবল ছয়খানা পায়ে করাতের মত দাঁত লাগানো থাকে। আরসুলা দেখিলেই চতুর কাঁচ-পোকা তাহার পিঠে চড়িয়া বসে এবং হুল বাহির করিয়া তাহার গলার কাছে স্নায়ু-কেন্দ্রে খোঁচা দিতে থাকে। স্নায়ু-কেন্দ্রই প্রাণীদের বুদ্ধি-বিবেচনা ও চলা-ফেরার যন্ত্র। হুলের খোঁচায় তাহা নষ্ট হইয়া গেলে, আরসুলার অঙ্গ অবশ হইয়া পড়ে এবং সে বুদ্ধি-বিবেচনা হারায়। কাজেই তখন ছোট কাঁচ-পোকা আারসুলার গোঁফ ধরিয়া যেখানে ইচ্ছা টানিয়া লইতে পারে।
কাঁচ-পোকারা এই রকমে যে-সকল আরসুলা বা মাকড়সা শিকার করে, তাহা উহারা নিজে প্রায়ই খায় না। আধ-মরা শিকারগুলিকে বাসায় রাখিয়া সেখানে ডিম পাড়ে। ডিম হইতে বাচ্চা বাহির হইয়া ঐ-সকল শিকারকে খাইয়া শীঘ্র শীঘ্র বড় হয়। পুরুষ কাঁচ-পোকাদের পিছনে হুল থাকে না। ইহারা নিরীহ প্রাণী। স্ত্রীরাই পোকা-মাকড় শিকার করিয়া বেড়ায়।
৬.২.৫ ঝিল্লীপক্ষ পতঙ্গ : মৌমাছি
মৌমাছি
এইবার তোমাদিগকে মৌমাছির কথা বলিব। ইহারা বোল্তা-জাতীয় পতঙ্গ। বোল্তাদের মত ইহাদের চারিখানি ডানা, ছয়খানি পা, মাথার উপরে তিনটা ছোট চোখ, এবং দুই পাশে দুইটা বড় চোখ আছে। কিন্তু ইহাদের মুখ ঠিক বোল্তাদের মুখের মত নয় এবং গায়ের রঙ্ বোল্তার রঙের মত উজ্জ্বল নয়।
এখানে মৌমাছির মুখের একটা ছবি দিলাম। দেখ, মুখে এক জোড়া দাঁত আছে। ইহা দিয়া মৌমাছিরা কাটাকুটির ও চিবাইবার কাজ চালায়। ইহার নীচে যে আঙুলের মত অংশ রহিয়াছে তাহা দিয়া ইহারা খাবার আঁক্ড়াইয়া ধরে। সকলের নীচে শুঁড়ের মত জিনিসটা ইহাদের জিভ্। মৌমাছির ওষ্ঠ লম্বা হইয়া এই জিভের সৃষ্টি করিয়াছে। সুতরাং দেখা যাইতেছে, বোল্তার মুখের চেয়ে মৌমাছির মুখ কতকটা উন্নত। ইহাদের মাজা বোল্তার মাজার মত সরু নয়।
মৌমাছির সর্ব্বাঙ্গ—বিশেষতঃ পেটের তলার আগা-গোড়া বুরুসের মত ছোট লোমে ঢাকা থাকে। ফুলে মধু থাইতে বসিলে ঐ লোম দিয়া উহারা ফুলের রেণু সংগ্রহ করে। কুকুর ও ঘোড়া ছাই-গাদা ও ধূলায় গড়াগড়ি দিয়া কি-রকমে গায়ে ধূলামাটি মাথে, তোমরা তাহা নিশ্চয়ই দেখিয়াছ। মৌমাছিরা সুন্দর ফুল দেখিলেই ফুলের কেশরের উপর পড়িয়া লুটাপুটি খায়। ইহাতে উহাদের গায়ে ফুলের রেণু ধূলার মত আট্কাইয়া যায়। কিন্তু কুকুর যেমন গা-ঝাড়া দিয়া ধূলা ফেলিয়া দেয়, মৌমাছিরা তাহা করে না। মাথার চুলে ধূলা-বালি বা কাটাকুটা লাগিলে আমরা তাহা বুরুস বা চিরুণী দিয়া ঝাড়িয়া ফেলি। উহারাও সেই রকমে পায়ের-গায়ে-লাগানো চিরুণীর মত কাঁটাগুলি দিয়া সর্ব্বাঙ্গের রেণু ঝাড়িতে আরম্ভ করে, কিন্তু সেগুলিকে ফেলিয়া দেয় না। যেমন এক একটু রেণু জড় হয়, তেমনি তাহারা উহা মুখের মধ্যে জমা করিতে আরম্ভ করে এবং শেষে মুখের লালার সহিত মিশাইয়া তাহা দিয়া ছোট ছোট বড়ি পাকাইতে সুরু করে। বড়ি তৈয়ারি হইলে তাহা আর মুখে রাখে না। মুখ হইতে তাহা প্রথমে সম্মুখের পায়ে, তার পরে মাঝের পায়ে এবং শেষে পিছনের পায়ে চালান করে। এই পা দুটির মাঝামাঝি অংশে লোমে-ঢাকা কৌটার মত দুইটি খাঁজ কাটা থাকে। মৌমাছিরা পিছনের পা হইতে রেণুর বড়িগুলিকে ঐ কৌটায় জড় করিতে আরম্ভ করে।
ফুলের রেণুর বড়ি পাকাইয়া মৌমাছিরা কি করে, তাহা বোধ হয় তোমরা জান না। উহাই মৌমাছির বাচ্চাদের প্রধান খাদ্য। আমরা ভাত ডাল দুধ খাইয়া বাঁচিয়া থাকি। মৌমাছির বাচ্চারা ফুলের রেণু না খাইলে বাঁচে না। ফুলের রেণুর বড়ির সঙ্গে একটু মধু এবং একটু জল মিশাইয়া মৌমাছিরা বাচ্চাদের জন্য উপাদেয় খাদ্য তৈয়ার করে। দেখ—ইহারা কত সৌখীন্ প্রাণী। ভালো খাবার ভিন্ন অন্য কিছু ইহাদের মুখে ভালোই লাগে না। ইহাদের খাওয়া দাওয়ার আরো অনেক কথা তোমরা পরে জানিতে পারিবে।
