যাহা হউক, নূতন চাকে বোল্তাদের যে-সকল বাচ্চা হয়, তাহাদের মধ্যে স্ত্রী বা অকর্ম্মা পুরুষ খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। সকলেই বড় বড় হুলওয়ালা কর্ম্মী হইয়া জন্মে এবং তাড়াতাড়ি চাকগুলিকে বড় করিয়া তুলে। পুরানো স্ত্রী-বোল্তারা তখন ডিম-পাড়ার কাজেই সর্ব্বদা ব্যস্ত থাকে। এই রকমে এক একটা চাকে কখনো কখনো তিন চারি শত বোল্তা একত্র বাস করে। ইহাদের সকলেই নিজেদের কাজ করিয়া যায়; পরস্পরের মধ্যে প্রায়ই ঝগ্ড়াঝাঁটি করে না।
সাত-আট মাস এই রকমে চাকের কাজ চলিলে যখন শীতকাল আসে, তখন বোল্তাদের দল-ভাঙার সময় উপস্থিত হয়। এই সময়ে চাকে আর কর্ম্মী বোল্তা জন্মে না; ডিম হইতে কেবল স্ত্রী ও পুরুষ বোল্তা বাহির হইতে আরম্ভ করে। ইহারা বড় হইয়া আর চাকের দিকে তাকায় না। স্ত্রী ও পুরুষেরা দলে দলে চাক ছাড়িয়া দূরে উড়িয়া বেড়াইতে আরম্ভ করে এবং কয়েক দিনের মধ্যে পুরুষেরা মরিয়া যায়। স্ত্রীদের মধ্যে যাহারা বাঁচিয়া থাকে, তাহারা পেট-ভরা ডিম লইয়া দেওয়ালের ফাটালে বা চালের বাতায় লুকাইয়া শীত কাটায়। এদিকে চাক প্রায় খালি হইতে আরম্ভ করে; কারণ কর্ম্মী বোল্তা আর চাকে জন্মে না। পুরানো কর্ম্মী বোল্তারা আর চুপ করিয়া চাকে বসিয়া থাকিতে পারে না। তখন তাহাদের বড়-আদরের বাচ্চাগুলিকে মুখে করিয়া চাক ছাড়িয়া যে-দিকে ইচ্ছা বাহির হইয়া পড়ে। কিন্তু তাহারা কোনো জায়গাতেই আশ্রয় পায় না। শেষে ইহাদের সকলেই কেহ জলে ডুবিয়া, কেহ শীতে থাকিয়া, কেহ আগুনে ঝাঁপাইয়া মারা যায়। এত যত্নের চাকখানা এই রকমে খালি হইয়া পড়ে। তোমরা খোঁজ করিলে এই রকম খালি বোল্তার চাক অনেক জায়গায় দেখিতে পাইবে।
শীত চলিয়া গেলে বোল্তারা প্রায়ই পুরানো চাকে বাস করে না। যে দু-দশটা স্ত্রী বোল্তা এদিকে ওদিকে লুকাইয়া শীত কাটায়, তাহারা গরম পড়িলেই গা ঝাড়া দিয়া বাহির হয় এবং মনের মত ভালো জায়গায় নূতন চাক তৈয়ার করিয়া সেখানে ডিম পাড়িতে সুরু করে।
৬.২.২ ঝিল্লীপক্ষ পতঙ্গ : ভীমরুল
ভীমরুল
তোমরা ভীমরুল নিশ্চয়ই দেখিয়াছ। ইহারা বড় বোল্তার মত পতঙ্গ। কেবল রঙটা গাঢ় বাদামী ধরণের এবং লেজের দিকে হল্দে রঙের মোট ডোরা দেওয়া থাকে। ইহাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রায় বোল্তাদেরি মত। কিন্তু বোল্তার চেয়ে ইহারা বেশি রাগী। অনেক সময়ে মিছামিছি রাগ করিয়া মানুষ ও পশুদের তাড়া করে ও গায়ে হুল ফুটাইয়া দেয়। ভীমরুলের হুলে ভয়ানক বিষ। দশ বারোটা ভীমরুলে কামড়াইলে মানুষ মরিয়া যায়।
বোল্তাদেরি মত ভীমরুলেরা চাক করে। কিন্তু বোল্তা যেমন খোলা জায়গায় চাক বাঁধে, ইহারা প্রায়ই তাহা করে না। ইহাদের চাক ফুটবলের মত গোল আবরণের মধ্যে থাকে। আবরণের গায়ে ছিদ্র থাকে। ভীমরুলেরা সেই পথ দিয়া ভিতরে যাওয়া-আসা করে। কাজেই বোল্তার চাক তোমরা যেমন সর্ব্বদাই দেখিতে পাও, ভীমরুলের চাক সে রকমে দেখিতে পাইবে না। হঠাৎ দেখিলে মনে হয়, চাকের আবরণটি বুঝি কাদা দিয়া গড়া,—কিন্তু তাহা নয়। ভীমরুলেরা দাঁত দিয়া কাঠ গুঁড়া করে এবং পরে তাহার সঙ্গে মুখের লালা মিশাইলে যে কাদার মত জিনিস হয়, তাহা দিয়া আবরণটা প্রস্তুত করে। এই জন্যই চাকের আবরণ পেষ্ট্-বোর্ডের মোটা কাগজের মত শক্ত হয়।
ভীমরুলেরা ঠিক বোল্তাদেরি মত বাচ্চাদের যত্ন লয়। কিন্তু ইহাদের চাক আবরণের মধ্যে থাকে-থাকে সাজানো দেখা যায়। ভীমরুল ছোট পোকা-মাকড়ের পরম শত্রু। এই সকল পোকাই উহাদের প্রধান খাদ্য। বোল্তারা ভীমরুলকে বড়ই ভয় করে। বোল্তার চাকের সন্ধান পাইলে ভীমরুলের দল সেখানে গিয়া ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড শুরু করিয়া দেয় এবং চাকে ডিম বাচ্চা যাহা-কিছু থাকে, সকলি খাইয়া ফেলে।
আগেই বলিয়াছি, ভীমরুলেরা ভয়ানক রাগী; এইজন্য ইহারা চাকে কি-রকমে চলা-ফেরা করে তাহা দেখিবার সুবিধা হয় না। চাকের কাছে গেলেই ইহারা ছুটিয়া তাড়া করে। ভীমরুলের জীবনের অনেক কথা এখনো জানিতে বাকি আছে।
৬.২.৩ ঝিল্লীপক্ষ পতঙ্গ : কুমরে-পোকা
কুমরে-পোকা
ইহারাও বোল্তা ও ভীমরুলের মত প্রাণী। আকারে ছোট হইলেও ইহাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিক বোল্তাদেরি মত। এখানে কুমরে-পোকার একটা ছবি দিলাম। দেখ, বোল্তার চেয়ে ইহার মাজা কত সরু এবং পা-কয়েকখানি কত লম্বা।
বোল্তার মত ইহারা দল বাঁধিয়া চাকে বাস করে না। এক একটা পোকা নিজেদের বাচ্চাদের জন্য পৃথক্ পৃথক্ ঘর তৈয়ারি করে।
কুমরে-পোকার ঘর তোমরা নিশ্চয়ই দেখিয়াছ। দেওয়ালের গায়ে, দরজা, জানালা ও কপাটের উপরে, ইহারা মাটি দিয়া ঘর তৈয়ার করে। আলমারিতে বই সাজাইয়া রাখিলে কখনো কখনো বইয়ের গায়ে বা কাগজের উপরেও ইহারা মাটির ঘর প্রস্তুত করে।
বোল্তাদের মত ইহাদের কতকগুলি স্ত্রী এবং কতকগুলি পুরুষ হইয়া জন্মে। কিন্তু স্ত্রী-পোকারাই ঘর তৈয়ার করে। তোমরা হয় ত ভাবিতেছ, বাস করিবার জন্য ইহারা ঘর বানায়। কিন্তু তাহা নয়; বাচ্চাদের জন্যই ইহারা ঘর তৈয়ার করে।
গ্রীষ্মের সময়ে কুমরে-পোকা বেশি দেখা যায়। এই সময়ে একটু নজর রাখিলেই তোমরা ঘরের কোণে, ছাদের কড়ি-কাঠের কাছে বা টেবিলের নীচে ইহাদিগকে ভন্-ভন্ করিয়া উড়িতে দেখিবে। ইহারা সময়ে সময়ে মুখের কাছে বার বার ঘুরিয়া বড়ই বিরক্ত করে। আমরা ঘর-বাড়ী প্রস্তুত করিবার সময়ে যেমন খুঁজিয়া পাতিয়া ভালো জায়গা বাছিয়া লই, ইহারাও এই রকমে উড়িয়া উড়িয়া বাসার উপযুক্ত জায়গা ঠিক্ করে।
