বোল্তারা কি জিনিস দিয়া চাক বাঁধে, তোমরা বোধ হয় এখন তাহাই জানিতে চাহিতেছ। কাগজ কি জিনিস দিয়া তৈয়ার হয়, তোমরা তাহা জান না কি? কয়েক রকম কাঠ ও ঘাস কলে পিষিয়া প্রথমে মাড়ের মত করা হয়। পরে তাহাই জমাট করিলে কাগজ হইয়া পড়ে। বোল্তারা কাগজের মতই এক রকম জিনিস দিয়া চাক প্রস্তুত করে। তাহাদের দাঁত বড় ধারালো,—ঠিক যেন করাত। গাছের শুক্নো ডাল-পালা তাহারা সেই করাতের মত দাঁত দিয়া গুঁড়া করে; তার পরে মুখের লালা মিশাইয়া তাহা কাদার মত করে এবং শেষে তাহা দিয়া চাক বাঁধে। তোমরা যদি চাকের খানিকটা ছিঁড়িয়া দেখ, তাহা হইলে জিনিসটাকে ঠিক্ আমাদের বাজারের বাদামি রঙের মোটা কাগজ বলিয়া মনে করিবে। কাগজ জলে ভিজিলে গলিয়া যায়। কিন্তু বোল্তার মুখের লালার এমনি গুণ যে, তাহা দিয়া যে কাগজের মত জিনিস প্রস্তুত হয় তাহা জলে ভিজিলে গলিয়া যায় না। শুনা যায়, চীন-দেশের লোকেরা নাকি হাজার হাজার বৎসর আগে কাগজ তৈয়ারির কৌশল বাহির করিয়াছিল। কিন্তু চীনেদের আগেও বোল্তারা কাগজ তৈয়ারি করিয়া চাক বাঁধিয়া আসিতেছে। কথাটা আশ্চর্য্য নয় কি?
যাহা হউক, বোল্তারা চাকের মধ্যে যে ছোট ডিম পাড়ে, তাহা হইতে বাচ্চা বাহির হইতে আট দশ দিন কাটিয়া যায়। এই সময়ের মধ্যে তাহারা চাকে অনেক নূতন ঘর জুড়িয়া এবং ঘরের ছিদ্রগুলিকে গভীর করিয়া চাকখানিকে বেশ বড় করে। কিন্তু তখনো চাকে দুই তিনটি বোল্তাই দেখা যায়। এই সময়ে বোল্তাদের হাতে অনেক কাজ থাকে। চাক তৈয়ারি ও বাচ্চাদের আদর-যত্ন ইত্যাদি সকলি তাহাদিগকে করিতে হয়। অন্য পতঙ্গের ডিম হইতে শুঁয়ো-পোকার মত বাচ্চা বাহির হইলে, বাচ্চারা কচি পাতায় ও ডালে বেড়াইয়া নিজেদের খাবার নিজেরাই জোগাড় করিয়া লয়। কিন্তু বোল্তার বাচ্চারা তাহা পারে না। সাধারণ শুঁয়ো-পোকাদের মত ইহাদের পা থাকে না; কাজেই চাকের ছিদ্র হইতে তাহারা বাহির হইতে পারে না। পাখীরা যেমন মুখে করিয়া খাবার আনিয়া বাচ্চাদের পেট ভরায়, বোল্তারা ঠিক সেই রকমে বাচ্চাদিগকে খাবার দেয়। অন্য পতঙ্গের বাচ্চা, ফড়িং, ছোট গোবরে-পোকা বোল্তাদের প্রধান খাদ্য। তা ছাড়া মিষ্ট জিনিসও ইহারা বেশ ভালবাসে। দোকানের যেখানে চিনি-বোঝাই বস্তা থাকে, সেখানে, সমস্ত দিনই বোল্তারা ভন্-ভন্ করিয়া ঘুরে এবং চিনি চাটিয়া খায়। তা ছাড়া পাকা ও মিষ্ট ফলের রসও ইহারা খাইতে ভালবাসে। বোল্তার জিভ্ আছে, কিন্তু তাহা আমাদের জিভের মত নয়। মুখের উপর ও নীচের ওষ্ঠের কতকগুলি শুঁয়ো একত্র হইয়া জিহ্বার কাজ চালায়। ইহা দিয়াই তাহারা তরল জিনিস চাটিয়া খায়।
ছোট ছেলেমেয়েগুলিকে মা যাহা ইচ্ছা খাইতে দেন না। যাহা খাইতে ভালো এবং সহজে হজম হয়, সেই সকল খাদ্য দিয়া মা শিশুদের পালন করেন। বোল্তার মা, বাচ্চাদের পালন করিবার সময়ে ঠিক্ তাহাই করে। খুব ভালো ভালো নরম পোকা-মাকড় নিজের দাঁত দিয়া চিবাইয়া সে বাচ্চাদের মুখের কাছে ধরে এবং তাহা খাইয়া বাচ্চারা বড় হয়।
এই রকমে পনেরো কুড়ি দিন আহার করিয়া বোল্তার বাচ্চারা পুত্তলির অবস্থায় আসিয়া দাঁড়ায়। তখন ইহারা চাকের ছিদ্রের তলায় নামিয়া যায় এবং মুখ হইতে এক রকম লালা বাহির করিয়া ছিদ্রের মুখ ঢাকিয়া ফেলে। বোল্তার চাক পরীক্ষা করিলে তোমরা তাহার কতকগুলি ছিদ্রকে এই রকমে ঢাকা দেখিতে পাইবে; ইহাদের সবগুলিই পুত্তলি-বোঝাই থাকে। পুত্তলি-অবস্থায় বাচ্চাদের খাওয়ার দরকার হয় না, তখন তাহারা একটু নিরিবিলি থাকিয়া শরীরটাকে বদ্লাইয়া সম্পূর্ণ পতঙ্গের আকারে আনিতে চায়। কাজেই ছিদ্রের মুখ বন্ধ রাখিয়া ইহারা বেশ ভালোই থাকে।
যাহা হউক, ঐরকমে প্রায় আট দশ দিন বদ্ধ থাকিলে সেই শুঁয়ো-পোকার আকারের বাচ্চাদের ডানা গজায়, চোখ ফোটে, পা বাহির হয় এবং গায়ের রঙ্ বদ্লায়। যাহা আগে মুড়ির মত পোকা ছিল, তাহা এই সময়ে বোল্তার আকার পাইয়া যায়। এই রকমে চেহারা বদ্লাইলে বাচ্চারা আর বদ্ধ ঘরে থাকিতে চায় না, তখন ঢাকনি কাটিয়া তাহারা বাহিরে আসে এবং দুই চারিবার ডানা ঝাড়া দিয়া একটু-আধটু উড়িতে আরম্ভ করে। ইহার পরে তাহারা আর কাহারো উপরে নির্ভর করে না, চাকের অপর বোল্তাদের মত কাজে লাগিয়া যায়। বোল্তার চাকের ছিদ্র কখনই শূন্য থাকে না। বাচ্চারা বড় হইয়া বাহির হইলেই, বোল্তারা শূন্য ছিদ্রে নূতন ডিম পাড়ে। অনেক প্রাণীর আাকার জন্মকালে ছোট থাকে, এবং বয়সের সঙ্গে একটু একটু বাড়িয়া শেষে তাহা বড় হইয়া পড়ে। বোল্তাদের পাখা উঠিবার সময়ে যে আকার থাকে, বয়সের সঙ্গে তাহা কখনই বাড়ে না। এই সময়কার আকারই উহাদের সম্পূর্ণ আকার।
আমরা সচরাচর যে-সব প্রাণী দেখিতে পাই, তাহাদের মধ্যে কতক স্ত্রী এবং কতক পুরুষ হইয়া জন্মে। কিন্তু কতকগুলি পতঙ্গের মধ্যে স্ত্রী ও পুরুষ ছাড়া আর এক জাতি দেখা যায়। ইহারা কর্ম্মী অর্থাৎ কুলি-মজুর বা দাসীর দল। দিবারাত্রি খাটিয়া ঘর তৈয়ারি করা, ঘরে পাহারা দেওয়া ও বাচ্চাদের আদর-যত্ন করাই ইহাদের কাজ। ইহাদের বাচ্চা হয় না, অথচ তাহাদিগকে পুরুষও বলা যায় না। বোল্তাদের মধ্যে স্ত্রী, পুরুষ ও কর্ম্মী এই তিন জাতিই আছে। যে হুলের ভয়ে আমরা চাকের কাছে যাই না, তাহা কেবল স্ত্রী ও কর্ম্মী বোল্তাদেরই লেজে লাগানো থাকে। পুরুষ বোল্তারা বড় নিরীহ প্রাণী। তাহাদের পিছনে হুল নাই; গায়ে ছাড়িয়া দিলে বা হাত দিয়া নাড়াচাড়া করিলে একটুও হুল ফুটায় না। কিন্তু ইহাদের মত অকর্ম্মা প্রাণী বোধ হয় পৃথিবীতে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। তাহারা চাক তৈয়ারি বা বাচ্চাদের যত্ন করার কাজে একটুও সাহায্য করে না। কেবল দরোয়ানের মত বসিয়া বসিয়া চাকে পাহারা দেওয়া ও যে-সব বাচ্চা চাকে মারা যায়, তাহাদিগকে ফেলিয়া দেওয়াই ইহাদের কাজ।
