আমরা এ-পর্য্যন্ত যে-সকল প্রাণীর কথা বলিয়াছি, তাহার মধ্যে চিংড়িদের মস্তিষ্কই বেশি উন্নত। দেহের কোন্ জায়গায় মস্তিষ্ক আছে, তাহা ছবি দেখিলেই তোমরা বুঝিতে পারিবে।
স্ত্রী-পুরুষ ভেদ
চিংড়িদের মধ্যে স্ত্রী-পুরুষ ভেদ আছে। ইহাদের কতক স্ত্রী এবং কতক পুরুষ হইয়া জন্মে। স্ত্রী-চিংড়িরা দেহের তলার একটি সরু ছিদ্র দিয়া অনেক ডিম প্রসব করে। কিন্তু প্রসবের পর সেগুলিকে জলে ফেলিয়া দেয় না। শরীর হইতে আাঠার মত এক রকম পদার্থ বাহির করিয়া ডিমগুলিকে শরীরের তলায় সেই সাঁত্রাইবার ডানার গায়ে লাগাইয়া রাখে।
তোমরা নিশ্চয়ই চিংড়িদের এই রকম ডিম দেখিয়াছ। ডিম ফুটিয়া বাচ্চা হইলে সাধারণ চিংড়িরা আর বাচ্চাদিগকে আট্কাইয়া রাখে না; তাহারা যে-যেখানে পারে সেইদিকে চলিয়া যায়। কয়েক জাতীয় বড় চিংড়ি বাচ্চাদিগকে অনেক দিন কাছে-পিঠে রাখে। বেশ বড় না হওয়া পর্য্যন্ত সেগুলি মায়ের কাছ-ছাড়া হয় না।
চিংড়ির খোলস ছাড়া
কঠিন আবরণে শরীর ঢাকা থাকিলে, মাঝে মাঝে তাহা বদ্লানো দরকার হয়। আবরণ পাকাপাকি রকমে দেহ ঢাকিয়া রাখিলে, শরীর বাড়িতে পায় না। তোমরা বোধ হয় শুনিয়াছ, আগে চীনদেশের মেয়েরা ছেলে-বেলায় লোহার জুতা পায়ে পরিত এবং তাহা জন্মে পা হইতে খুলিত না। কাজেই বয়সের সঙ্গে তাহাদের শরীর বাড়িত, কিন্তু পা দুখানি বুড়ো বয়সেও ছেলে-মানুষের পায়ের মত ছোটই থাকিয়া যাইত। গায়ের খোলা মাঝে মাঝে না বদ্লাইলে চিংড়িদেরও ঐ দশা হইত,—তাহারা আর বাড়িতে পারিত না; ডিম হইতে বাহির হওয়ার পর ইহাদের যে-রকম আকৃতি ছিল, চিরজীবন তাহাই থাকিয়া যাইত। সাপ যেমন খোলস ছাড়ে, তেম্নি চিংড়িরা মাঝে মাঝে গায়ের খোলা ছাড়িয়া বড় হয় এবং সেই বড় দেহের উপরে আবার নূতন করিয়া খোলা জন্মে।
চিংড়ি-সম্বন্ধে অনেক কথাই বলা হইল। কিন্তু এই সকল কথা শুনিয়া তোমরা চিংড়িকে যত নিরীহ প্রাণী বলিয়া মনে করিতেছ, তাহারা সে-রকম নয়। সর্ব্বাঙ্গ খোলায় ঢাকিয়া, লম্বা পায়ের সাঁড়াশির মত নখ ও মাথার খাঁড়া বাহির করিয়া বড় বড় চিংড়িরা যখন জলের ভিতর দিয়া চলে, তখন চিংড়িদিগকে লড়ায়ের সেপাই বলিয়া মনে হয়। এই চেহারা দেখিয়া অন্য জলচর প্রাণীরা উহাদিগকে বাঘ ভালুকের মত ভয় করিয়া ছুটিয়া পলায়। ইহাদের মত ঝগড়াটে প্রাণী বোধ হয় সমস্ত সমুদ্র খুঁজিয়াও পাওয়া যায় না। জলের ছোট প্রাণীদিগকে কাছে পাইলেই ইহারা তাহাদের সহিত অকারণে ঝগড়া বাধায় এবং অনেক সময়ে সেগুলিকে মারিয়া খাইয়া ফেলে। নিজেদের মধ্যেও ইহারা কম ঝগড়া করে না। লড়াইয়ে আমাদের হাত পা কাটিয়া বা ভাঙিয়া গেলে আমরা চিরকালের জন্য খোঁড়া বা নুলো হইয়া থাকি। ঝগড়া-ঝাঁটি করিতে গিয়া যদি চিংড়িদের দুচার খানা পা খসিয়া যায়, বা লেজের পাখ্না খসিয়া পড়ে, তবে তাহারা একটুও ভাবনা করে না। পুরাতন পায়ের জায়গায় কয়েক দিনের মধ্যে নূতন পা গজাইয়া উঠে।
চিংড়িরা যেমন ঝগড়াটে, তেমনি মাংসাশী। নদীতে মরা জন্তুর শরীর পচিতে থাকিলে, চিংড়ির দলই তাহার অধিকাংশই খাইয়া ফেলে।
৬.১.২ কঠিনবর্ম্মী : কাঁকড়া
কাঁকড়া
ষষ্ঠ শাখার পোকা-মাকড়দের মধ্যে যাহারা কঠিন আবরণে শরীর ঢাকিয়া রাখে, তাহাদের মধ্যে চিংড়ি মাছের পরিচয় দিলাম। এখন ইহাদের জাত-ভাই আর একটি কঠিন-আবরণের প্রাণীর কথা বলিয়া এই শ্রেণীর প্রাণীদের কথা শেষ করিব।
কাঁকড়া তোমরা অবশ্যই দেখিয়াছ, হয় ত তোমাদের মধ্যে কেহ কেহ ইহা খাইয়াছ। কাঁকড়া কঠিনবর্ম্মী চিংড়ির জাত-ভাই এবং প্রজাপতি আরসুলার ন্যায় ষষ্ঠ শাখার প্রাণী।
তোমরা হয় ত এই কথাটা শুনিয়া আশ্চর্য্য হইতেছ। ষষ্ঠ শাখার প্রাণীর দেহে যে আংটির মত কঠিন অংশ জোড়া থাকে, তাহা কাঁকড়ার দেহে কোথায়?
তোমরা যদি একটা মরা কাঁকড়া চিৎ করাইয়া তাহার দেহের তলাকার অবস্থাটা পরীক্ষা করিয়া দেখ, তবে স্পষ্ট জানিতে পারিবে যে, চিংড়ির মত ইহারও শরীর অনেক ছোট অংশ দিয়া প্রস্তুত। কেবল ইহাই নয়; চিংড়ির শরীর যেমন মাথা ও লেজ এই দুই মোটামুটি ভাগে ভাগ করা থাকে, ইহাদের দেহও ঠিক সেই রকম দুই ভাগে ভাগ করা আছে।
আমরা যাহাকে কাঁকড়ার দেহ বলিয়া জানি, তাহা উহার মাথা। কাঁকড়ার লেজ খুব ছোট এবং পাত্লা। ইহা কাঁকড়ারা বেশ ভালো করিয়া গুটাইয়া শরীরের তলায় রাথিয়া দেয়। তোমরা মরা কাঁকড়া লইয়া পরীক্ষা করিয়ো, দেখিবে, একটা পাত্লা চওড়া পাতের মত জিনিস দেহের তলাকে ঢাকিয়া রাখিয়াছে। ইহাই কাঁকড়াদের লেজ। চিংড়ির লেজে অনেক মাংস থাকে, কাঁকড়ার লেজে তাহা থাকে না। এই জন্য খাবার জন্য কাঁকড়া কুটিবার সময়ে পেটের তলায় লুকানো লেজটা ফেলিয়া দেওয়া হয়।
কাঁকড়ার মাথা বাদামি রঙের বেশ মোটা খোলার ভিতরে লুকানো থাকে। ইহাদের দশখানি করিয়া পা থাকে, কিন্তু সেগুলির মধ্যে সম্মুখের পা দুখানিই খুব মোটা ও তাহার আগায় সাঁড়াশির মত ধারালো ও শক্ত আঙুলের মত অংশ থাকে।
এখানে কাঁকড়ার একখানি ছবি দিলাম। দেখ,—অন্য পায়ের তুলনায় সম্মুখের পা দুখানি কত মোটা। ইহাই কাঁকড়াদের আহার-সংগ্রহ ও আত্মরক্ষার প্রধান অস্ত্র।
