চিংড়ির শ্বাস-প্রশ্বাস
তোমাদিগকে আরো অনেকবার বলিয়াছি, জীবন্ত থাকিয়া শরীর পুষ্ট করিতে হইলে, প্রাণীদের শরীরে অক্সিজেনের দরকার হয়। বাতাসে অক্সিজেন আছে। বড় বড় প্রাণীরা নাক-মুখ দিয়া বাতাসের অক্সিজেন টানিয়া শরীরের ভিতরকার ফুস্ফুসে প্রবেশ করায় এবং ফুস্ফুসের রক্ত সেই অক্সিজেন শুষিয়া লয়। জলের প্রাণী জলে-মিশানো বাতাসের অক্সিজেন শুষিয়া লয়। এই সকল কথা তোমরা আগে শুনিয়াছ। কিন্তু চিংড়ি মাছেরা শরীরে অক্সিজেন লইবার জন্য এই দুই উপায়ের কোনোটাই অবলম্বন করে না। অক্সিজেন টানিবার জন্য ইহাদের দেহে একটি বিশেষ যন্ত্র আছে। চিংড়িদের মাথা যে চওড়া খোলা দিয়া ঢাকা থাকে, সেইটা খুলিয়া ফেলিলেই উহার নিশ্বাসের যন্ত্র দেখিতে পাইবে। চিংড়ি মাছের মাথার খোলা ছাড়াইবার সময়ে হয় ত তোমরা ঐ যন্ত্র দেখিয়াছ। ইংরাজিতে ইহাকে গিল্ (Gill) বলে, আমরা তাহাকেই কান্কো বলিব।
চিংড়ির মাথার দুই পাশে ঐ কান্কো দু’টা থাকে। ইহা দেখিতে সাদা এবং পাখীর কোঁকড়ানো পালকের মত অনেক ছোট অংশ দিয়া প্রস্তুত। মাথার দুই পাশে মালার মত গোলাকারে সেগুলি উপরে উপরে সাজানো থাকে। এখানে চিংড়ি কান্কোর একটা ছবি দিলাম।
গোরু পাখী মাছ প্রভৃতি মেরুদণ্ডযুক্ত প্রাণীদের রক্ত লাল। ইহা ছাড়া অপর প্রাণীদের রক্তের বিশেষ রঙ্ নাই। চিংড়ি মাছের শরীরে রক্ত আছে, কিন্তু সে রক্ত রাঙা নয়—প্রায় জলের মত বর্ণহীন। এই রক্ত চিংড়ির কান্কোর সেই পালকের মত অংশের ভিতর দিয়া চলা-ফেরা করে এবং তাহাই জলে-মিশানো বাতাসের অক্সিজেন শুষিয়া লয়।
কান্কো কঠিন খোলা দিয়া ঢাকা থাকে, তবে কি করিয়া তাহার উপরে জল আসে,—বোধ হয় তোমরা ইহাই ভাবিতেছ।
খোলার ভিতরকার কান্কোর উপরে জল আসা-যাওয়ার বড় সুন্দর ব্যবস্থা আছে। চিংড়ির মাথায় খোলা খুব শক্ত করিয়া আঁটা থাকিলেও পায়ের গোড়ার কাছে খোলার ধারগুলিতে বেশ ফাঁক থাকে। বাহিরের জল ঐ সকল ফাঁক দিয়া খোলার ভিতরে প্রবেশ করিয়া কান্কোকে সর্ব্বদাই ঘেরিয়া রাখে। দরজা-জানালা বন্ধ করিয়া যদি অনেক লোক একটি ছোট ঘরে অনেক ক্ষণ বাস করে, তবে সকলেই নিশ্বাসের সঙ্গে অক্সিজেন টানিয়া লয় বলিয়া ঘরের বাতাসের অক্সিজেন কমিয়া আসে এবং নানা রকম খারাপ বাষ্প শরীর ও নাক দিয়া বাহির হইয়া বাতাসকে খারাপ করিয়া দেয়। তাই ঘরে পরিষ্কার বাতাস প্রবেশ করাইবার জন্য দরজা-জানালা খুলিয়া রাখিতে হয়। চিংড়ি মাছের খোলার ভিতরে যে জল প্রবেশ করে, ঐ রকমে তাহারও অক্সিজেন কমিয়া আসে। এই জন্য জল যাহাতে ভিতরে আবদ্ধ না থাকিয়া স্রোতের জলের মত চলাফেরা করে, তাহার ব্যবস্থা থাকা দরকার হয়। এই ব্যবস্থা চিংড়ির দেহে ভালোই আছে। পিছনের পায়ের কাছে খোলার তলায় যে পথ থাকে, তাহা দিয়া জল ভিতরে মাথার উপরে থাকে। যাহা হউক চিংড়িরা যাহা খায়, তাহা মাথার উপরকার সেই থলিতে ঠেলিয়া উঠে। চিংড়ি মাছ খাইবার জন্য কুটিবার সময়ে ঐ থলির মত উদরটা স্পষ্ট দেখা যায়। উদরের সঙ্গে সরু লম্বা নল লাগানো থাকে। ইহাই চিংড়িদের অন্ত্র বা নাড়িভুঁড়ি। এই নল পিঠের উপর দিয়া আসিয়া লেজের তলায় শেষ হইয়াছে; পেটের মল এই পথ দিয়া লেজের কাছে আসে এবং শরীর হইতে বাহির হইয়া যায়। চিংড়ি মাছ কুটিবার সময়ে পিঠের উপরের এই নল তোমরা খোঁজ করিলে দেখিতে পাইবে।
ইহা ছাড়া চিংড়ির দেহে আর দুইটি সরু নল আছে। অন্ত্রের উপরে ইহাদের যকৃৎ অর্থাৎ লিভার থাকে। তাহা হইতে ঐ দুটি নল দিয়া পিত্তরস অন্ত্রে আসিয়া পড়ে; ইহাতে খাদ্য হজম হয়।
চিংড়ির শরীরে রক্তের চলাচল
আগেই বলিয়াছি, চিংড়িদের শরীরে রক্ত আছে, কিন্তু সে রক্ত লাল নয়। যাহা হউক, রক্ত থাকিলে তাহা যাহাতে সর্ব্বাঙ্গে চলা-ফেরা করে এবং বদ্ রক্ত যাহাতে পরিষ্কার হয়, শরীরে এই সকল ব্যবস্থা থাকা দরকার। চিংড়ির দেহে ইহার সুন্দর ব্যবস্থা আছে। বড় প্রাণীদের দেহের হৃৎপিণ্ড তালে তালে দপ্ দপ্ করিয়া পম্পের মত শিরার মধ্যে রক্তের স্রোত চালায়। চিংড়ির দেহেও এই রকম হৃৎপিণ্ড আছে। আগের ছবিখানি দেখিলেই জানিতে পারিবে, তাহা উদরের উপরে অর্থাৎ পিঠের খুব কাছে থাকে। কান্কোতে যে রক্ত অক্সিজেন টানিয়া নির্ম্মল হইয়াছে, তাহা হৃৎপিণ্ডের থলিতে আসিয়া জমা হয়। তার পরে হৃৎপিণ্ড সঙ্কুচিত হইয়া যখন সেই আবদ্ধ রক্তে চাপ দিতে থাকে, তখন তাহা পিচ্কারির জলের মত শিরা-উপশিরা দিয়া সর্ব্বাঙ্গে ছড়াইয়া পড়ে।
চিংড়ির স্নায়ুমণ্ডলী
চিংড়িরা কি রকম সজাগ প্রাণী তাহা বোধ হয়, তোমরা সকলে জান না। জল একটু নাড়াচাড়া করিলে বা জলের কাছে সামান্য শব্দ করিলে চিংড়িরা চক্ষুর নিমেষে যে, কোথায় পালাইয়া যায়, তাহার সন্ধানই হয় না। ইহা হইতে বুঝা যায়, চিংড়িদের স্নায়ুমণ্ডলীর কাজ বেশ ভালো চলে। জোঁক ও কেঁচোর শরীরে যেমন এক জোড়া স্নায়ুর সূতো দেহের তলা দিয়া চলিয়া শাখা-প্রশাখায় বাম ও ডাইন অঙ্গকে আচ্ছন্ন করে, ইহাদের দেহেরও স্নায়ুমণ্ডলী ঠিক সেই রকমেই সর্ব্ব শরীরে ছড়ানো থাকে। তা’ ছাড়া এই দুই শাখার স্নায়ু চিংড়ির মাথায় তাল পাকাইয়া একটা বড় রকমের টেলিগ্রাফ্-আফিসের সৃষ্টি করে। কাজেই বাহিরের অতি ছোটখাটো খবর পাইতে উহাদের দেরি হয় না। মাথার এই বড় টেলিগ্রাফ্-আফিস্টিই তাহাদের মস্তিষ্ক।
