প্রাণীদের প্রত্যেক শাখাতেই বিচিত্র আকৃতি-প্রকৃতির অনেক ভিন্ন প্রাণী আছে। কিন্তু যষ্ঠ শাখায় রকম রকম প্রাণীর সংখ্যা যত বেশি অন্য শাখার প্রাণীতে সে-রকম নয়। সমস্ত পৃথিবীতে ছোট-বড়তে মিলিয়া মোটামুটি পাঁচ লক্ষ কুড়ি হাজার রকমের প্রাণী আছে, তাহার মধ্যে এক ষষ্ঠ শাখাতেই চারি লক্ষ রকমের কীট-পতঙ্গ দেখা যায়। ইহাদের প্রত্যেকেরই আকৃতি-প্রকৃতি পৃথক্। কেহ উড়িয়া বেড়ায়, কেহ পা দিয়া মাটির উপরে হাঁটিয়া চলে; কাহারো উড়িবার ডানা আছে, কাহারো ডানা নাই, কেহ ছয়খানা পায়ে চলাফেরা করে, কেহ হয় ত শত শত পায়ে চলাফেরা করে। সুতরাং আমরা চারি লক্ষ রকমের কীট পতঙ্গের কথা তোমাদিগকে বলিতে পারিব না,—বলিতে গেলে হয় ত কুড়ি পঁচিশখানা বড় বড় কেতাব লিখিতে হইবে। তোমরা সর্ব্বদা যে-সকল পোকা-মাকড় দেখিতে পাও, আমরা এখানে কেবল তাহাদেরি জীবনের কথা দেহের কথা একটু বলিব। এগুলি ছাড়া তোমরা যদি কোনো নূতন পোকা-মাকড় দেখিতে পাও, তবে তোমরা নিজেই তাহাদের চলাফেরা ও খাওয়া-দাওয়ার খোঁজ লইতে পারিবে।
আমাদের ভারতবর্ষ গরম দেশ; য়ুরোপ-আমেরিকার অনেক জায়গা ভয়ানক ঠাণ্ডা। এজন্য আমাদের গরম দেশে যে-সকল পোকা-মাকড় জন্মে, বিদেশের ঠাণ্ডায় তাহা জন্মে না। অনেক পণ্ডিত লোকে মিলিয়া য়ুরোপ ও আমেরিকার সমস্ত পোকা-মাকড়ের বিবরণ বড় বড় বইতে লিখিয়া রাখিয়াছেন। কিন্তু আমাদের দেশের পোকা-মাকড়ের বিবরণ কোনো বইয়ে আজও ভালো পাওয়া যায় না। তোমরা সকলে মিলিয়া যদি আমাদের দেশের পোকা-মাকড়ের বিবরণ সংগ্রহ করিতে লাগিয়া যাও, তবে সকলের চেষ্টায় একখানি ভালো বই প্রস্তুত হইতে পারিবে।
তোমরা আগেই শুনিয়াছ, ষষ্ঠ শাখায় যে-সকল ভিন্ন ভিন্ন পোকা-মাকড় আছে, তাহাদের সংখ্যা প্রায় চারি লক্ষ। কাজেই এলোমেলো করিয়া এতগুলো প্রাণীর বিবরণ দিতে গেলে কাজ চলে না। তাই যষ্ঠ শাখার প্রাণীদিকে পণ্ডিতগণ কয়েকটি ছোট ভাগে ভাগ করিয়াছেন এবং তার পড়ে এক একটি ভাগের প্রাণীদের পরিচয় দিয়াছেন।
ভাগ অনেক রকমে করা যায়। খাবারের দোকানে দোকানদার রসগোল্লা জিলাপি নিম্কি শিঙাড়া ভাগ ভাগ করিয়া সাজাইয়া রাখে। ফলের দোকানেও ফলওয়ালা নারিকেল আম আপেল নাসপাতি সকলি ভাগ ভাগ করিয়া রাখে। কেবল ফলের চেহারা দেখিয়া কোন্টি নাসপাতি এবং কোন্টি আম তাহা ফল-ওয়ালা বুঝিয়া লয়। তোমাদের স্কুলের এতগুলি ছেলেকে মাষ্টার মহাশয়েরা ভাগ ভাগ করিয়া লেখা-পড়া শেখান। যাহারা বেশি লেখা-পড়া শিথিয়াছে, তাহারা ফার্ষ্ট ক্লাশে যায়; যাহারা ইহার চেয়ে কম শিখিয়াছে, তাহারা সেকেণ্ড ক্লাশে যায়। এই রকমে স্কুলের সকল ছেলেই এক একটা ক্লাশে গিয়া লেখা-পড়া শিখে। ড্রিলের সময়ে তোমাদের স্কুলের আবার আর এক রকমে ছেলে ভাগ করা হয়। যাহারা সব চেয়ে মাথায় উঁচু, তাহারা প্রথম সারিতে দাঁড়ায়,—তখন কোন্ ছেলে কোন্ ক্লাশে পড়ে, সেই হিসাবে দাঁড় করানো হয় না। তাহা হইলে তোমরা বোধ হয় বুঝিতে পারিতেছ, অনেক জিনিস থাকিলে সেগুলিকে নানা রকমে ভাগ করা যাইতে পারে। তুমি ওজন দেখিয়া ভাগ করিতে পার, আর একজন অন্য গুণ বা স্বভাব দেখিয়া ভাগ করিতে পারে। পণ্ডিতেরা চারি লক্ষ পোকা-মাকড়কে স্বভাব ও আকৃতি দেখিয়া ভাগ করিয়াছেন। আমরা সেই ভাগ অনুসারে তোমাদিগকে পোকা-মাকড়দের কথা বলিব।
ষষ্ঠ শাখার প্রাণীদের বিভাগ
এই শাখার প্রাণীদিগকে আমরা যে-রকম ভাগ করিব তাহা আগেই তোমাদিগকে বলিয়া রাখিতেছি।
প্রথম ভাগ।—এই ভাগে চিংড়ি মাছ, কাঁকড়া প্রভৃতি কঠিনবর্ম্মী প্রাণীরা পড়িবে। ইহাদের মধ্যে অনেকেই জলের প্রাণী কিন্তু পোকা-মাকড়দেরই জ্ঞাতি এবং সকলেরই শরীর গাঁটে গাঁটে ভাগ করা; কিন্তু গায়ের আবরণ খুব শক্ত। যোদ্ধারা লড়াই করিবার সময়ে যেমন বর্ম্ম পরে, ইহারা সেই রকম শক্ত আবরণে গা ঢাকিয়া রাখে, তাই হঠাৎ শত্রুরা ইহাদের অনিষ্ট করিতে পারে না। এই জন্যই ইহাদিগকে কঠিনবর্ম্মী বলিতেছি।
দ্বিতীয় ভাগ।—বোল্তা মাছি প্রজাপতি গোবরে-পোকা ফড়িং ইত্যাদি অনেক ছোট প্রাণী এই ভাগে পড়িবে। এই ভাগে যত প্রাণী আছে, ষষ্ঠ শাখার কোনো ভাগেই তত প্রাণী নাই। ইহাদের মধ্যে কতকগুলি আবার উড়িতে পারে। ইহাদের অনেকেরই শরীরে মাথা বুক ও লেজ এই তিনটি অংশ স্পষ্ট করিয়া দেখা যায়। বুকের তলায় অনেকগুলি পা থাকে; কিন্তু ইহারও সংখ্যা স্থির থাকে। গুণিলে প্রায় সকলেরি ছয়খানা করিয়া পা দেখিতে পাইবে। এই ভাগের প্রাণীদিগকে পতঙ্গ বলা যাইতে পারে।
তৃতীয় ভাগ।—এই ভাগের পোকা-মাকড়কে আমরা লূতা বলিব। “লূতা” মাকড়সার ভাল নাম। নানা রকম মাকড়সাই এই ভাগে আছে। প্রজাপতি বা ফড়িংদের মত ইহাদের শরীরে তিনটা ভাগ দেখা যায় না। যে-সব আংটির মত গাঁট দিয়া পোক-মাকড়ের দেহ প্রস্তুত, সেগুলি ইহাদের শরীরে একবারে গায়ে গায়ে জোড়া থাকে। পেটের তলার আংটিগুলিকে প্রায় চেনাই যায় না। দ্বিতীয় ভাগের প্রাণীদের মত ইহাদের পা ছয়খানা নয়; ইহাদের পায়ের সংখ্যা চারি জোড়া অর্থাৎ আটখানা।
চতুর্থ ভাগ।—এই ভাগের প্রাণীরা ভারি বিশ্রী। কেন্নো এবং বিছে এই দলের প্রধান পোকা। ইহাদেরও দেহ কঠিন আংটি দিয়া গড়া; কিন্তু পায়ের সংখ্যা অনেক বেশি। এই জন্য চতুর্থ ভাগের পোকা-মাকড়কে শতপদী বলা যাইতে পারে।
