আমাদের দেশের অতি-অল্প লোকেই গোরু বা শূয়ারের মাংস খায়। তাই পাটা-ক্রিমির উৎপাত আমাদের মধ্যে অনেক কম। শীতের দেশের লোকে ঐ সব মাংস বেশি খায়। গরিব লোকেরা আবার অনেক সময়ে আধ-সিদ্ধ মাংসই খাইয়া ফেলে। এই জন্য ঐ-সকল লোক ক্রিমির উৎপাতে খুব কষ্ট পায় এবং অনেক লোক মারাও যায়। পাটা-ক্রিমি যে কেবল মানুষের শরীরেই হয়, তাহা নয়। কুকুর, বিড়াল, ছাগল, ভেড়া প্রভৃতি জন্তুদের দেহেও ইহা জন্মে।
গোল ক্রিমি
মানুষের শরীর হইতে যে কেঁচোর মত গোল সাদা ক্রিমি বাহির হয়, তাহারা পাটা-ক্রিমিদের চেয়ে অনেক রকমে উন্নত, কিন্তু তাহাদের দেহে কেঁচোর মত দাগ কাটা দেখা যায় না। ইহা দেখিলেই বুঝা যায়, ইহাদের দেহ কেঁচোর ন্যায় অনেকগুলি আংটি দিয়া প্রস্তুত নয়। কেঁচোদের স্ত্রী-পুরুষ ভেদ নাই, কিন্তু এই ক্রিমির দল কতক পুরুষ এবং কতক স্ত্রী হইয়া জন্মে। কেঁচোর মত ইহাদের মুখ, পেট ইত্যাদি সকলি আছে। মানুষের পাকাশয়ে ইহাদের বাস এবং আমাদের উদরের খাদ্য দ্রব্য খাইয়াই ইহারা বাঁচিয়া থাকে। তাই শরীর হইতে বাহিরে আসিলে এই ক্রিমিরা বাঁচে না।
প্রত্যেক স্ত্রী-ক্রিমি প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক লক্ষ ষাট হাজার ডিম প্রসব করে। বলা বাহুল্য, সকল ডিম হইতে বাচ্চা হয় না। এগুলির অনেকই মানুষের শরীর হইতে বিষ্ঠার সহিত বাহির হইয়া পড়ে। শেষে যে দুই-চারিটা পেটের ভিতরে ফুটিয়া ক্রিমি হয়, তাহাদের জ্বালাতেই মানুষ অস্থির হইয়া পড়ে।
৬.০ কীট-পতঙ্গ, প্রাণীদের বিভাগ
ষষ্ঠ শাখার প্রাণী
কীট-পতঙ্গ
তোমরা পঞ্চম শাখার নানা রকম প্রাণীর কথা শুনিলে। ধাপে ধাপে প্রাণীরা কেমন উন্নতির দিকে চলিয়াছে, বোধ হয় তাহা বুঝিতে পারিয়াছ।
প্রথম শাখার প্রাণীদের শরীরে কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাই; ইচ্ছামত শরীর নাড়িবার জন্য স্নায়ু নাই; এমন কি উদরটা পর্য্যন্ত নাই। ইহাদের সঙ্গে পঞ্চম শ্রেণীর প্রাণী জোঁকের তুলনা করিয়া দেখ। জোঁকের দেহে উদর আছে, মুখ-চোখ আছে, শিকারের গা চিরিয়া রক্ত বাহির করিবার জন্য চোয়ালে অস্ত্র লাগানো আছে, তা’ছাড়া ডিম প্রসব করিয়া সন্তান উৎপন্ন করা এবং ইচ্ছামত শরীর নাড়াচাড়া করার ব্যবস্থাও ইহাদের দেহে রহিয়াছে। প্রথম শাখার প্রাণী আমিবার সঙ্গে জোঁকদের যেন আকাশ-পাতাল তফাৎ।
আমরা যষ্ঠ শাখার যে-সকল প্রাণীর কথা এখন বলিব, তাহা শুনিলে তোমরা বুঝিবে, ইহারা আরো উন্নত। জীবনের কাজে এবং দেহের উন্নতিতে ইহারা অনেক বড় প্রাণীদেরও হারাইয়া দেয়।
চিংড়ি মাছ, কাঁকড়া, গোবরে পোকা, ফড়িং, শুঁয়ো পোকা, প্রজাপতি, মাকড়সা, বিছে, কেন্নো, মশা, মাছি, ছারপোকা প্রভৃতি সকলেই যষ্ঠ শাখার প্রাণী। তোমরা হয় ত ভাবিতেছ, চিংড়ি মাছ ও কাঁকড়াদের সঙ্গে মশা, মাছি ও প্রজাপতিরা কি রকমে এক শাখার প্রাণী হইল? কিন্তু সত্যই ইহারা এক শাখার প্রাণী। ইহাদের দেহের মোটামুটি গড়নের কথা মনে করিলে তোমরা ইহা বুঝিতে পারিবে।
সাপ, ব্যাঙ্, মাছ, গোরু, ভেড়া প্রভৃতি জন্তুদের শরীর কি রকমে প্রস্তুত, তাহা তোমরা অবশ্যই দেখিয়াছ। ইহাদের দেহের ভিতরে নানা জায়গায় সরু বা মোটা হাড় আছে এবং সেই হাড়ের উপরে আবার মাংস লাগানো আছে। দেহে হাড় থাকে বলিয়া বড় প্রাণীরা এত দৃঢ় হয় এবং লাফালাফি করিতে পারে। শরীরে হাড় না থাকিলে ইহারা কেঁচো বা জোঁকের মত নির্জীবভাবে নড়াচড়া করিত। ফড়িং, প্রজাপতি প্রভৃতি ষষ্ঠ শ্রেণীর প্রাণীর শরীরে মাংসের মত নরম জিনিস আছে বটে, কিন্তু ভিতরে হাড় নাই। তাহাদের সমস্ত দেহটাই হাড়ের মত কঠিন আবরণে ঢাকা। মানুষ, গোরু প্রভৃতি বড় প্রাণীদের শরীরের ভিতরে যে হাড় থাকে, তাহা শরীরকে দৃঢ় করে, কিন্তু আড়ষ্ট করে না। যেখানে যেমনটি হইলে সুবিধা হয়, হাড়গুলি খণ্ডখণ্ড-ভাবে সেই রকমে জোড়া থাকে। যষ্ঠ শাখার কীট-পতঙ্গদের দেহ হাড়ে ঢাকা থাকিলেও তাহাতে শরীর আড়ষ্ট হয় না। একটা প্রজাপতি, গোবরে পোকা বা মাছি ধরিয়া পরীক্ষা করিয়ো, দেখিবে, তাহাদের গা হাড়ের মত শক্ত। সমস্ত শরীর চামড়া দিয়া ঢাকা নাই,—হাড়ের মত একটা জিনিস দিয়া আচ্ছন্ন। কিন্তু এই হাড়ের আবরণে পাছে শরীরটা আড়ষ্ট হইয়া যায়, এইজন্য হাড়ের আবরণ আংটির মত অনেকগুলি অংশে ভাগ করা থাকে এবং সেগুলি পাতলা চামড়া দিয়া পরস্পরের সহিত জোড়া থাকে। কাজেই এই অবস্থায় ইহারা শরীরটাকে ইচ্ছামত হেলাইতে দোলাইতে পারে। বোল্তা, কেন্নো বা বিছের শরীরের কঠিন আবরণে ঐ আংটির মত ভাগ স্পষ্ট দেখিতে পাইবে। দেহের আবরণ এই রকম ভাঙা ভাঙা থাকে বলিয়াই বোল্তা, কেন্নো ও বিছেরা ইচ্ছামত শরীরগুলিকে বাঁকাইতে পারে। কেবল বোল্তা, কেন্নো, মাছি বা প্রজাপতির দেহই যে ঐ রকম, তাহা নয়। ষষ্ঠ শ্রেণীর প্রত্যেক প্রাণীই ঐরকম দেহ লইয়া জন্মে। পরস্পরের শরীরে এই মিল আছে বলিয়া জল স্থল আকাশের নানা রকম প্রাণীকে বৈজ্ঞানিকেরা একই শাখায় ফেলিয়াছেন। চিংড়ি মাছ এবং কাঁকড়া জলের প্রাণী। ইহাদের দেহ কেন্নো, বিছে ও মৌমাছিদের মত কঠিন আবরণে ঢাকা আছে, এইজন্য ইহারা যষ্ঠ শাখায় পড়িয়াছে।
আমরা যাহা খাই, তাহার সার ভাগ দিয়া শরীরের আয়তন বাড়ে। পাঁচ ছয় বৎসর আগের চেয়ে তোমাদের শরীর কত বড় হইয়াছে, একবার ভাবিয়া দেখ। সে-সময়ের জামাগুলো হয় ত এখন তোমার গায়েই লাগিবে না। এই পাঁচ ছয় বৎসর ধরিয়া যাহা আহার করিয়াছ, তাহাই তোমাদের গায়ে নূতন মাংস যোগ করিয়াছে এবং সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভিতরকার হাড়গুলিকে মোটা করিয়াছে। ষষ্ঠ শাখার সকল প্রাণীই আহার করিয়া এই রকমেই বড় হয়। কিন্তু তাহাদের দেহে যে কৌটার মত কঠিন আবরণ থাকে, তাহা বাড়ে না। তোমার বাক্সে কতগুলি বই আঁটে জানি না। মনে কর, তাহাতে আটখানা বই রাখা যায়। এখন যদি সেই বাক্সে বারো খানা বই রাখিয়া তুমি ডালা বন্ধ করিতে চেষ্টা কর, তবে বাক্স ফাটিয়া যায়। যষ্ঠ শাখার কতক প্রাণী যখন আহার করিয়া দেহ বড় করে, তখন তাহাদেরও ঐ বাক্সের মত দুর্গতি হয়। ছোট কঠিন আবরণের মধ্যে উহাদের বড় দেহ থাকিতে পারে না। কাজেই আবরণটি ফাটিয়া শরীর হইতে খসিয়া পড়ে এবং তাহার জায়গায় নূতন বড় আবরণ জন্মিতে থাকে। এই ব্যাপারটা ঠিক সাপের খোলস-ছাড়ার মত। দেহ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাপের গায়ের আবরণ অর্থাৎ খোলস বড় হয় না। কাছেই ছোট খোলসের মধ্যে দেহ বড় হইতে থাকিলে, তাহা শরীর হইতে ছিঁড়িয়া খসিয়া পড়ে। আরসুলা, মাকড়সা, ছারপোকা প্রভৃতির গায়ের কঠিন আবরণের দশাও তাহাই হয়। ইহারা যেমন বড় হইতে থাকে, গায়ের আবরণ তেমনি খসিয়া পড়ে। ষষ্ঠ শাখার অনেক প্রাণী জীবনের মধ্যে অনেকবার এই রকমে খোলস্ ছাড়ে। চিংড়ি মাছ ও কাঁকড়া এই জাতীয় প্রাণী,—ইহারাও শরীরের উপরকার খোলা বার বার খসাইয়া বড় হয়।
