চাচা কদিন আগে ট্রাক ভর্তি কাঠ এনেছে। আমাদের সাধারণত কাঠের দরকার হয় না। কিন্তু আজকে বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। ফলে, চাচী চাইছে চাচার স্টাডিতে আগুন জ্বেলে, কিছু একটা পড়বে-টড়বে। আর আমি দেখব চাচা কী করে।
পাতার স্তূপে পা চালালাম। পাতা ভেদ করে চলে গেল পা। আগাছা ঘষা খেল আমার জিন্সে, মনে হলো আঁকড়ে ধরতে চাইছে বুঝি। চারদিক নিঃশব্দ। হৃৎস্পন্দনের শব্দও শুনতে পাচ্ছি। বাড়ির দিকে চকিত চাউনি বুলালাম। আলো জ্বলছে দেখে স্বস্তি পেলাম। এবার কেঁপে উঠে আলোর কাছ থেকে দূরে হেঁটে গেলাম।
পিছনের ফেন্সের কাছে জমাট বেঁধেছে অন্ধকার। স্ট্রীটলাইট কিংবা বারান্দার আলো এখান অবধি পৌঁছয়নি। কাঠের গাদার চারপাশে ঘাসহীন। ফেন্সের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা কাঠের পটাকে ভীতিকর দেখাল আমার চোখে। গাদা করা গুঁড়িগুলোকে দেখে কাঠ নয়, সাপ বলে ভুল হতে পারে।
ছোট ডালগুলোর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম। আবছা আলোয় দেখে মনে হচ্ছে কিলবিল করছে, গা মোচড়াচ্ছে।
চোখ পিটপিট করে, আবছায়া আর গুঁড়িগুলোর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাইলাম।
এসময় নড়ে উঠল কী যেন।
একটা গুঁড়ি দুলে উঠেছে। শাণিত নখের খটাখট শব্দ কানে এল। কিছু একটা কর্কশস্বরে ককিয়ে উঠল। তারপর সব চুপচাপ।
গুঁড়িতে পায়ের ডগা দিয়ে ঠেলা দিলাম। ইঁদুর-টিদুর ঢুকল নাকি? মনে মনে আশা করছি মাকড়সার দল এখানে জাল বোনার সময় পায়নি। কাঠ তুলতে গিয়ে হাতে ঝুল লেগে গেলেই মেজাজ বিগড়ে যায় আমার।
একটা কাঠ তুলে নিতে ঝুঁকলাম। সই করে বা বাহুতে তুলে নিলাম ওটা। রুক্ষ বাকলে ছড়ে গেল চামড়া। দ্বিতীয়টা তুলতে যেতেই নড়ে উঠল হাতের কাঠটা। মনের ভুল আরকী।
পরমুহূর্তে, কীসে যেন কামড়ে দিল আমাকে।
২
চেঁচিয়ে উঠলাম। হাত থেকে কাঠটা ফেলে দিয়ে লাফিয়ে পিছু হটলাম। বাহু যেন পুড়ে যাচ্ছে। চামড়া জ্বালা করছে। যেখানটায় কামড় খেয়েছি চেপে ধরলাম। বাহুতে আর আঙুলে লেপ্টে গেছে চটচটে কী যেন। হাতটা টেনে সরিয়ে আনলাম। আঙুলগুলো জুড়ে গেছে। নাকে আসছে পচা গন্ধ।
মাটিতে পড়ে থাকা গুঁড়িটার দিকে চাইলাম। কী লেগে ছিল ওতে?
লাথি মারলাম ওটায়। নড়ে উঠল। আঁধারে চোখ সয়ে এসেছে। কোনও কিছু গুঁড়িটার কাছ থেকে সরে যায় কিনা লক্ষ করলাম। কিছুই নড়াচড়া করল না। খসে পড়েছে কামড়ে দেওয়া প্রাণীটা। পায়ের পাতা দিয়ে উল্টে দিলাম গুঁড়িটাকে। এবার পিছনে সরে এলাম। কলিজা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।
আঁধারে দেখলাম, গুঁড়ির বাকলটা দেখতে বাকলের মত নয়। মুখের চেহারার মত। পুরানো, মৃত এক মুখ। চোখজোড়া বোজা। সরু-সরু দাগগুলো নাক, জ্ব, দাড়ি এসব ইঙ্গিত করছে। মানুষের মুখের মত নয়। বিকৃত। মুখগহ্বরের কাছে একটা গর্ত, তরল জাতীয় কিছু একটা গলগল করে মাটিতে পড়ছে।
_ আমার ধারণা হলো আঁধারে চোখে ভুল দেখছি আমি। গুঁড়িটাকে আবারও জুতোর ডগা দিয়ে উল্টে দিলাম।
উল্টে গেল ওটা। দীর্ঘশ্বাসের মত এক শব্দ কানে এল। মুখ তুলে চাইলাম। বাতাসের শব্দ। চোখ নামিয়ে মুখটাকে আবারও দেখার চেষ্টা করলাম। মুখের বদলে বাকল আর করাত দিয়ে যেখানটায় ছোট-ছোট ডাল-পালা কাটা হয়েছে সে দাগগুলো চোখে পড়ল।
কষে লাথি মারলাম গুঁড়িটাকে। মাটিতে দাপালাম পা। এটা স্রেফ একটা কাঠের গুঁড়ি। মোটেই নড়েনি। নিশ্চয়ই কোনও পোকা-টোকা আমাকে কামড়েছে। কিন্তু চামড়ায় বসে যাওয়া তীক্ষ্ণ দাঁতগুলো এখনও অনুভব করছি আমি।
বাহু ঘষে খানিকটা আঠা খসালাম। দুর্গন্ধ। জিনিসটা মেখে রয়েছে আমার বাহু আর আঙুলে-যেতে চাইছে না।
জিন্সে হাত মুছে আরেকটা গুঁড়ি নিতে হাত বাড়ালাম। আমার আঙুল স্পর্শ করার আগেই পড়ে গেল ওটা। অন্যগুলোর উপর ধাক্কা খেয়ে আমার দিকে গড়িয়ে এল। সভয়ে পিছু হটলাম। অল্পের জন্য আমার পায়ে পড়েনি। পায়ের ডগা দিয়ে নাড়লাম গুঁড়িটাকে। সামান্য নড়ে উঠে নিথর পড়ে রইল।
আরও গোটা দুই গুঁড়ি টেনে বের করলাম। তিনটে হয়ে গেলে হনহনিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম। বারবার পিছু ফিরে কাঠের স্তূপটার দিকে চাইছি। পরশুদিন হ্যালোউইন। তাই কেমন জানি গা ছমছম করছে।
পিছনের দরজায় পৌঁছে সবচাইতে খারাপ ভুলটা করলাম। বারান্দার আলোয় পা রেখে হাতের গুঁড়িগুলোর দিকে চোখ নামিয়ে চাইলাম।
এক জোড়া মৃত, শূন্য চোখ পাল্টা চাইল আমার উদ্দেশে। টলে উঠলাম। হাত থেকে খসে পড়ে গেল কাঠ। কী দেখলাম! এটা গাছ। স্রেফ একটা মরা গাছ। মরা কাঠ। আর কিছু নয়। চোখ বুজে ফেলেছি।
চোখ যখন মেলোম, চোখ নয় কাঠের গুঁড়ি পড়ে থাকতে দেখলাম ঘাসের উপর। যে গাঁটগুলো থেকে ডাল কাটা হয়েছে সে। জায়গাগুলো দেখতে খানিকটা শূন্য কোটরের মত লাগছে। অতটা ভয় পাওয়া আমার উচিত হয়নি। আসলে বারান্দায় ম্লান আলো ভুতুড়ে করে তুলেছে পরিবেশ। ফলে, মরা কাঠ দেখেই ভড়কে গেছি আমি।
ঘেমে গেছে শরীর। হয়তো কোন জাতের মাকড়সা কামড়ে দিয়েছে আমাকে। হয়তো বিষের কারণে চোখে ভুল দেখছি। মোটকথা, শরীর খারাপ করছে আমার।
গুঁড়িগুলো ফেলে রেখেই, বাড়ির ভিতরে পা বাড়ালাম। গায়ের চামড়া ঠাণ্ডা, অথচ ভিতরে ভিতরে পুড়ে যাচ্ছে।
চাচী! চেঁচিয়ে উঠলাম। দড়াম করে লাগিয়েছি পিছনের দরজা। হঠাৎই আলো দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলাম। চাচা-চাচীকেও কাছে পেতে চাইছি।