- বইয়ের নামঃ অরণ্যের প্রতিশোধ
- লেখকের নামঃ শামসুদ্দীন নওয়াব
- সিরিজঃ তিন গোয়েন্দা সিরিজ
- প্রকাশনাঃ সেবা প্রকাশনী
- বিভাগসমূহঃ গোয়েন্দা কাহিনী, রোমাঞ্চকর গল্প
অরণ্যের প্রতিশোধ
১
বাঁ হাত চেপে ধরে এক ছুটে রান্নাঘরে ঢুকলাম। হাতের তালু থেকে বেরিয়ে আছে একটা রেযর ব্লেড। ব্লেডের চারপাশ ঘিরে রক্ত, আমার কব্জি থেকে চুঁইয়ে পড়ছে সরু ধারায়।
চাচী! মুখ বিকৃত করে হাতটা তুলে ধরলাম।
আমার হাতের দিকে এক ঝলক চাইল মেরি চাচী, তারপর আবারও চুলোয় চাপানো গরুর মাংসের প্যানে চোখ ফিরল।
বেশ ভাল দেখাচ্ছে। তবে এবার নিশ্চয়ই সব কেচাপ শেষ। করিসনি?
হতাশায় গুঙিয়ে উঠলাম। চাচীর হয়েছেটা কী? কিচেন লাইটের আলোয় ঝিকোচ্ছে রেযর ব্লেডটা।
ওটা গেঁথে রয়েছে আমার হাতে। ব্যথায় জান যাচ্ছে আমার।
চাচী, এবারেরটা কেচাপ নয়, সত্যিকারের রক্ত! কব্জি চেপে ধরলাম যাতে ফ্যাকাসে হয়ে যায় হাত, যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলাম।
চকিত চাউনি বুলাল চাচী।
হাত ধুয়ে খেতে বস।
চাচী, রক্ত পড়ে মারা যাচ্ছি আমি! টলে উঠে বললাম।
এ সময় হাসি মুখে কিচেনে প্রবেশ করল রাশেদ চাচা।
কীরে, তোর হাতে কী?
হাতটা বাড়িয়ে দিলাম। সাদা মেঝেতে টপ টপ করে রক্ত পড়ছে।
চাচা, হাত কেটে ফেলেছি!
আমার কাছে এসে হাতটা নিজের হাতে নিল চাচা।
হুঁ, খুব খারাপ অবস্থা দেখতে পাচ্ছি। আয় অপারেশন করে দিই! আমাকে টেনে নিয়ে এল কিচেন কাউন্টারের কাছে। তারপর এক টানে ড্রয়ার খুলে একটা ঝকঝকে ছুরি বের করল।
চাচী! চেঁচিয়ে উঠলাম। শরীর মুচড়ে সরে যাওয়ার। করলাম, কিন্তু চাচা ছাড়ল না। ছুরিটা দোলাচ্ছে। ঝলসে উঠল ফলাটা। চাচী! চেঁচালাম আবারও।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে চাচী ঘুরে দাঁড়াল আমাদের দিকে।
চাচী এবার তোকে বাঁচাতে পারবে না! চোখ বিস্ফারিত চাচার। আমি সত্যি ছুটতে চেষ্টা করছি, কিন্তু কিচেন কাউন্টারে আমার বাহু। চেপে ধরল সে। কব্জির কাছ থেকে কেটে ফেলতে হবে। মাথার উপরে ছুরিটা সাঁই করে তুলে ধরল।
ছুরিটার দিকে চাইলাম। চাচা হঠাৎই হেসে উঠল।
পড়ে গেল ছুরিটা।
কাঠের কাউন্টারে এতটাই জোরে গেঁথে গেল, চমকে উঠলাম আমি। হেসে ফেলল চাচা।
ডিনার তৈরি। খুনোখুনি বাদ দিয়ে খেতে এসো, এসময় ডাকল। চাচী।
চাচীর দিকে চাইলাম আমরা। দুবাহু ভাঁজ করে রেখেছে বুকের কাছে। এক হাতে বার্গার-টার্নার ধরা।
চাচা আমার উদ্দেশে চোখ টিপে, ছুরিটা সরিয়ে রাখতে গেল।
ওটা আর আমার নাইফ ড্রয়ারে রেখো না, চাচী বলল। গাজর কাটতে গিয়ে রক্ত চলকে বেরোক চাই না আমি। হেসে ফেললাম। আমি। এবার আমার দিকে দৃষ্টি পড়ল চাচীর। ডিনারের পর সব কাজ সারবি। তারপর আটটার আগে হোমওয়ক করে ফেলা চাই, বুঝলি?
ঘাড় কাত করে সায় জানালাম। কিচেন থেকে বেরিয়ে বাথরূমে গেলাম হাত ধুতে।
চাচীর কাছে কোনও পাত্তাই পেলাম না। পুরো একটা ঘণ্টার চেষ্টা পানিতে গেল।
ব্লেডটা আসল না, রবারের। তবে দেখতে একদম আসলের মতন। ফলায় রূপালী-ধূসর রঙ মাখিয়ে কোনাগুলোকে দেখতে চকচকে আর ধারাল করে তুলেছিলাম। অপর প্রান্তটা এমনভাবে কেটে ফেলেছিলাম, দেখে যাতে মনে হয় আমার হাতে গেঁথে গেছে। স্পিরিট গ্লু দিয়ে আটকে রেখেছিলাম। কর্ন সিরাপ আর রেড ডাই। ছিল বিকল্প রক্ত হিসেবে।
এসবই রাশেদ চাচার জিনিস। চাচা ইদানীং ছায়াছবির স্পেশাল এফেক্টসের কাজ করছে।
একটু পরে, ডিনারে বসলাম আমরা।
এবারের হ্যালোউইনে কী কস্টিউম চাস তুই? জিজ্ঞেস করল চাচা।
খাওয়ার সময় বিরক্তিকর আলোচনা না করলে হয় না? বলল চাচী।
হেসে ফেলল চাচা।
এবার নতুন কিছু চাই আমি, সোৎসাহে বলে উঠলাম। নিজেই কিছু একটা করব। এমন কিছু যাতে স্কুলের ছেলে-মেয়েরা দেখে ভিরমি খায়। আমি আসলে বিচিত্র কিছু একটা করে এমনকী চাচাকেও চমকে দিতে চাই।
তোমার কী মনে হয়, ও পারবে নিজের আইডিয়া দিয়ে তোমাকে ভয় দেখাতে? চাচী জিজ্ঞেস করল।
চাচা চাইল চাচীর দিকে।
পারা তো উচিত, ডিনার খেয়ে নে, আমি তোকে কিছু স্কুইব দেখাব। তারপর দুজনে মিলে আলোচনা করে কিছু একটা আইডিয়া বের করে ফেলব।
দুটো সবুজ বিন জোর করে গিলোম। তারপর প্লেটটা নিয়ে গেলাম সিঙ্কের কাছে। গার্বেজ ডিসপোসালে এঁটো-কাঁটা ফেলে চাচার স্টাডির দিকে পা বাড়ালাম।
কই যাস? চাচীর কণ্ঠ থামিয়ে দিল আমাকে। কাজগুলোর কী হবে?
ঘুরে দাঁড়ালাম।
ওহ, চাচী, চাচা আমার জন্যে বসে আছে।
আর আমি সারা বিকেল বসে আছি তুই কাঠ নিয়ে আসবি বলে। আগুন নেই, টোস্টেড মার্শম্যালোও নেই, সাফ জানিয়ে দিল চাচী।
আমি মার্শম্যালো পছন্দ না করলেও চাচা করে। কাজেই রাজি হতে হলো।
ঠিক আছে, যাব।
পিছনের উঠনে চলে এলাম। বিস্তর আগাছা জন্মেছে। চাচা মো করার সময় পায় না, কাজ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত, আমার দুএক সপ্তাহ লেগে যাবে আগাছা সাফ করতে।
উঠনে ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে গাছের পাতা। স্ট্রীটলাইটের হলদে আলো এখান অবধি পৌঁছয়নি। পিছনের বারান্দায় বাতিটাকে ঘিরে ঘুমাক খাচ্ছে কুয়াশা। ধূসর আঙুল দিয়ে যেন সব কিছু আঁধার আর স্যাঁতসেঁতে করে তুলেছে।
ঠাণ্ডায় শিউরে উঠলাম। বাতাসের দোলায় কুণ্ডলী পাকিয়ে গেল কুয়াশা। শুকনো পাতা খটখটিয়ে উঠল শুকনো হাড়ের মতন। বুকের কাছে দুবাহু ভাজ করে কাঠের গাদার উদ্দেশে এগোলাম।