বুদ্ধ বললেন, ‘তাই হবে। আপনারা যজ্ঞ আরম্ভ করুন।’ দেবগণ বুদ্ধের বুকের উপর বিশাল অগ্নি প্রজ্বলিত করলেন এবং ভাবলেন যে, অগ্নির উত্তাপে বুদ্ধের মৃত্যু হবে। কিন্তু তা হল না। বুদ্ধ মরলেন না। তখন দেবতাগণ একান্ত হতাশ হলেন এবং তাঁদের হাতাশার ভাব সর্বত্র প্রকাশ করতে লাগলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে পুনঃপুনঃ বুদ্ধদেবকে কঠিন আঘাত করতে লাগলেন। কিন্তু তাতেও কোন ফল হল না। বুদ্ধকে হত্যা করা গেল না।
তখন সে অগ্নিকুণ্ডের নীচ থেকে এই প্রশ্ন শব্দিত হলঃ ‘আপনারা এ বৃথা শ্রম করছেন কেন? আপনাদের উদ্দেশ্য কী?’ উত্তর হল, ‘তোমার পবিত্র মুখমণ্ডলের দিকে যে-ই দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, সে-ই শুদ্ধ হয়ে যায়, আর কেউ আমাদের উপাসনা করে না, সেজন্য তোমার ধ্বংস আমরা কামনা করছি।’
তদুত্তরে বুদ্ধ বললেন, ‘তাহলে আপনাদের পরিশ্রম বৃথা। পবিত্রতা কখনও ধ্বংস হয় না।’
এই কাহিনী বুদ্ধের বিরুদ্ধবাদীদের রচনা। অথচ এর মধ্যেও বুদ্ধচরিতের প্রতিকূলে শুধু এই দোষটুকুই আরোপিত হয়েছে যে, তিনি এক অদ্ভুত ধরনের পবিত্রতা প্রচার করেছিলেন। আর কিছু নয়। বুদ্ধের মতবাদ সম্বন্ধে আপনাদের অনেকে কিছু কিছু অবগত আছেন।
বর্তমান কালের যে-সব চিন্তাশীল মনীষী অজ্ঞেয়বাদী বলে পরিচিত, তাঁদের কাছে বুদ্ধের মতবাদের বিশেষ একটি আবেদন আছে। বিশ্ব-ভ্রাতৃত্বের মহান্ প্রবক্তা ছিলেন বুদ্ধদেব। তাঁর কথা এই ছিলঃ ‘আর্য-অনার্য-নির্বিশেষে জাতি-সম্প্রদায়-নির্বিশেষে—প্রত্যেক মানুষের অধিকার রয়েছে ধর্মের উপর, অধিকার রয়েছে ঈশ্বরের উপর, স্বাধীনতার উপর।অতএব সে-অধিকারের ক্ষেত্রে সকলকেই আমি আহ্বান করি।’
কিন্তু এ-ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন কঠোর অজ্ঞেয়বাদী। বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন হতেই তিনি সর্বদা উপদেশ দিতেন। একদা পাঁচজন তরুণ—সকলেই ব্রাহ্মণ—একটি প্রশ্নের উপর তর্ক-বিতর্ক করতে তাঁর কাছে উপস্থিত হয়েছিল। ‘সত্য-লাভের পথ কি?’—এই ছিল তাদের প্রশ্ন। তাদের একজন বলল, ‘আমাদের মতে—এইটি সত্যের পথ। আমার পূর্ব- পুরুষগণ এ-কথাই প্রচার করেছেন।’
আর একজন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘আমি কিন্তু অন্যরূপ শিক্ষা লাভ করেছি, এবং আমার বিশ্বাস আমাদের নির্দিষ্ট পথটিই সত্যলাভের একমাত্র পথ।’
‘হে আচার্য—এখন এর মধ্যে কোন্টি ঠিক, তাই আমাদের জিজ্ঞাস্য।’
বুদ্ধদেব তখন তাদের প্রত্যেককে স্বতন্ত্রভাবে এই কথা বলেছিলেন, ‘তোমাদের আত্মগোষ্ঠী সবাই সত্যলাভের জন্য এক একটি পথ নির্দেশ করেছেন। উত্তম! কিন্তু তুমি নিজে কি ঈশ্বর দর্শন করেছ? অথবা তোমাদের পিতা কিম্বা পিতামহ কি ঈশ্বর দর্শন করেছেন?’
‘না, তাঁরা কেউ ঈশ্বর দর্শন করেননি. তাঁদের পিতা-পিতামহও ঈশ্বর দর্শন করেননি।’
‘আচ্ছা, তোমাদের আচার্যদের মধ্যে কেউ কি ঈশ্বর দর্শন করেছেন?’
‘না, তাঁরাও ঈশ্বর দর্শন করেননি।’
সকলের মুখেই এক উত্তর। সকলেরই এক কথা। কেউ তারা ঈশ্বর দর্শন করেননি।
তখন বুদ্ধদেব সেই পঞ্চ-তরুণকে একটি উপাখ্যান শুনিয়েছিলেন; বলেছিলেনঃ দেখ, একবার এক গ্রামে হঠাৎ কোথা থেকে একটি যুবক উপস্থিত হয়েছিল। সে কখনও কাঁদছে, কখনও বিলাপ করছে, কখনও চীৎকার করছে। বলছে, ‘আহা আমি তাকে অত্যন্ত ভালবাসি, নিবিড়ভাবে ভালবাসি।’ তার চীৎকারে গ্রামবাসীরা বেরিয়ে এল। তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কাকে তুমি ভালবাস? কে সে?’ ‘তা আমি জানি না।’ ‘কোথায় থাকে সে কন্যা? তার চেহারাই বা কেমন?’ ‘হায়, আমি সে-সব কিছুই জানি না। কোন সংবাদ রাখি না। শুধু এইটুকু জানি যে, আমি তাকে অত্যন্ত ভালবাসি।’
এখন এই যুবকটি সম্বন্ধে তোমাদের অভিমত কি—তা আমি জানতে চাই।
তরুণগণ তখন সবাই একযোগে বলে উঠল, ‘কেন মশাই, ও তো একটি আস্ত নির্বোধ! যাকে সে জানে না চেনে না, যাকে কখনও দেখেনি—এমন একটি অবাস্তব মেয়ের জন্য যে চীৎকার করে বেড়াচ্ছে, তাকে একান্ত বেকুব ভিন্ন আর কি বলা যাবে?’
তখন বুদ্ধ বললেন, ‘তাহলে তোমরাও কি অনেকাংশে তাই নও! তোমরা নিজেরাই স্বীকার করছ যে, তোমরা কিম্বা তোমাদের পিতা, পিতামহ কেউ কখনও ঈশ্বর দর্শন করেনি। ঈশ্বর-সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ জ্ঞান বংশ পরম্পরায় তোমাদের কারও নেই। অথচ সেই ঈশ্বর নিয়েই তোমরা তর্ক করছ, পরস্পরের টুঁটি ছিঁড়ে ফেলতে চাইছ। একি পাগলামি নয়?’
তখন তরুণগণ বিব্রত হয়ে বুদ্ধকে প্রশ্ন করল, ‘তাহলে এখন আমাদের কি করা উচিত—তাই বলুন।’ বুদ্ধদেব বললেন, ‘বেশ, তবে শ্রবণ কর। আচ্ছা, তোমাদের পূর্বপুরুষগণ কখনও কি এমন কথা বলছেন যে, ভগবান্ কোপনস্বভাব, ভগবান্ অসৎ?’ ‘আজ্ঞে না, তেমন কথা তাঁরা কখনও বলেননি। তিনি চির-সৎ, চির-পবিত্র—এই তাঁরা বলেছেন।’
‘তাহলে হে তরুণগণ—তোমরা যদি কায়মনোবাক্যে সৎ হও, সর্বভাবে পবিত্র হও, তবেই ভগবানের সান্নিধ্যে পৌঁছতে পারবে। তর্ক-বিতর্ক করে বা পরস্পরকে আক্রমণ করে ভগবান্ লাভ হয় না। অতএব আমার নির্দেশ এই যে—পবিত্র হও, সৎ হও। সর্বান্তঃকরণে অপরকে ভালবাস। ভগবানলাভের এই চিরন্তন পথ, অন্য পথ কিছু নাই।’
বুদ্ধের জন্মকালেই প্রাণিহত্যা না করবার এবং জীবে দয়া প্রদর্শন করবার নীতি আদর্শ রূপে গৃহীত ছিল—এ-কথা আমরা আলোচনা করেছি, সেক্ষেত্রে বুদ্ধদেব নূতন কিছু করেননি; কিন্তু তিনি নূতন যেটি করেছিলেন, সেটি হচ্ছে—জাতিভেদ প্রথা উচ্ছেদের জন্য একটি প্রবল আন্দোলনের সূত্রপাত। তাছাড়া আরও একটি অভিনব কাজ বুদ্ধদেব সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি তাঁর চল্লিশ জন শিষ্যকে পৃথিবীর নানা স্থানে প্রেরণ করেছিলেন এই নির্দেশ দিয়েঃ ‘বৎসগণ, তোমরা সকল দেশের সকল মানুষের সঙ্গেই উদার ভাব নিয়ে মিলিত হবে, জাতিধর্মনির্বিশেষে মিলিত হবে, এবং সকলের কল্যাণ-সাধনকল্পে মহাবাণী প্রচার করবে।’
