শঙ্করের হাতে টাকা দিয়ে জীবনে প্রথম মার খেয়েছিল মহাদেব সারাভাই মাস ছয়েক আগে। ভালো একটা ফাটকার টিপ আছে শুনে মাত্র চারশো টাকা দিয়েছিল। কিন্তু সেই টাকা ছেলে হারিয়ে বসল। টাকার খাম কি করে নাকি পকেট থেকে পড়ে গেল জানে না। চারশো টাকা কি করে হারায় মহাদেব সারাভাইয়ের ধারণা নেই। টাকার খাম পকেট থেকে পড়ে গেলে জানতে পারে না কি করে তাও ভাবতে পারে না। বিশ্বাস করবে কি করবে না সেটা পরের কথা। নির্লিপ্ত মুখ করে যেভাবে চারশো টাকা খোয়ানোর খবরটা দিল, চার লক্ষ টাকা থাকলেও সে-রকম পারা যায় কিনা জানে না। শুনে তার রাগ করতেও ভুল হয়ে গেছে, মাথায় হাত দিতেও। হাঁ করে খানিকক্ষণ পর্যন্ত ওই মুখখানাই দেখতে হয়েছিল।
-কি বললি, চারশো টাকা হারিয়ে গেছে?
–হ্যাঁ, সতের ধাঁধায় থাকি, কখন যে….
পকেট থেকে পড়ে গেছে?
-হ্যাঁ, কিছু ভেব না, চারশোর বদলে চৌদ্দশো পুরিয়ে দেব’খন শিগগীরই।
ব্যস, ওটুকুতেই সব আক্ষেপ সব খেদ শেষ ছোকরার।….চারশোর বদলে হাজার টাকা অর্থাৎ ছাঁকা ছ’শো টাকা ঘরে তোলার লোভে টাকাটা বার করেছিল ভদ্রলোক।
শঙ্কর তখনো শেয়ারবাজারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে শুনেই খুশি হয়ে হাতে যা ছিল চাওয়ামাত্র দিয়েছিল। যে হারে টাকা ফিরবে বলে তাকে নিশ্চিন্ত করা হয়েছিল, সে-তুলনায় চারশো টাকায় চারগুণ বেশি দেওয়ার লোভই হয়েছিল। স্ত্রী সদয় থাকলে হয়তো তার থেকেও বেশি দিত। কারণ তখন আর অবিশ্বাসের প্রশ্ন নেই। অনেকবারই দিয়েছে আর অনেকবারই তার অনেক বেশি ফিরেছে। কিন্তু স্ত্রীটি বাড়তি রোজগার হলে হাত বাড়িয়ে সেটা আদায় করে নিতে যেমন পটু, টাকা বার করে দেবার বেলায় তেমনি নির্মম। বিশেষ করে জুয়াখেলায় টাকা খাটানো হবে শুনলে। ফাটকা বাজারে টাকা খাটানো আর জুয়াখেলার মধ্যে একটুও তফাত দেখে না রমণীটি। তার ওপর বোনপো নিজের ব্যবসা নিয়ে সরে দাঁড়াতে এরই মধ্যে ভদ্রলোক নিজের বুদ্ধিতে ফাটকাবাজী করে কিছু টাকা খুইয়েছে। সেই থেকে স্বামীর ওপর খড়গহস্ত মহিলা। তারপর থেকে টাকার কন্ট্রোল গোটাগুটি তার হাতে। হাত-খরচের টাকাও সেই থেকে ভদ্রলোককে হাত পেতে স্ত্রীর হাত থেকে নিতে হয়।
এই দুরবস্থার সময় শঙ্কর এসে মেসোকে সরাসরি বলেছিল, দু’শো পাঁচশো যদি পারো চটপট বার করো, ভালো খবর আছে একটা অন্যের লাভ যুগিয়েই গেলাম।
অনেক দিন বাদে ভদ্রলোকের নির্জীব রক্ত চনমনিয়ে উঠেছিল। কিন্তু হাত শূন্য। অতএব গেল বারের চারশো টাকা মেসো শঙ্করের হাতে দিয়েছিল অ্যাকাউন্টস বিভাগ থেকে ধার করে। আর সেই টাকা খোয়া গেছে। পকেট থেকে চারশো টাকা গলে গেল আর লাটসাহেব তা টেরও পেল না। স্ত্রীর অগোচরে সে টাকা যে কি ভাবে শোধ হয়েছে, তা শুধু সে-ই জানে। শোধ করার পর মনে মনে স্থির করেছিল, এই ছোঁকর সঙ্গে আর কোন দিন কোন সম্পর্কই রাখা চলবে না, স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকে থাক।
মাস ছয় বাদে সেদিন দুপুরে সম্পর্কচ্যুত এই শঙ্কর আবার এসে হাজির তার কাছে। বাড়িতে নয়, একেবারে তার অফিস-ঘরে।
এসেই মেসোর পাশে চেয়ার টেনে বসল। হাব-ভাবে কোন রকম সঙ্কোচের লেশমাত্র নেই, দুনিয়ায় যেন বিব্রত বোধ করার মতে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি কখনো ঘটে নি। তাকে দেখে মহাদেব সারাভাই ছ’মাস আগের চারশো টাকা লোকসানের জ্বলাটা নতুন করে অনুভব করল। কাজের ফাইলে চোখ রেখে বক্রদৃষ্টিতে তাকে দেখে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কি খবর?
ভণিতা বাদ দিয়ে শঙ্কর জিজ্ঞাসা করল, মোটা কিছু টাকা রোজগার করার ইচ্ছে আছে?
সঙ্গে সঙ্গে রাগে মুখ লাল মেসোর। ফিরে জিজ্ঞাসা করল, গেলবারের মতো?
পকেট থেকে কিছু কাগজপত্র বার করে পরীক্ষা করতে করতে শঙ্কর জবাব দিল, পকেট থেকে সেবারে তোমার টাকার খামটা পড়েই গেল তার আর কি করা যাবে সেটা ভুলতে ক’বছর লাগবে তোমার? নিজের কাছে থাকলে কিছু না জানিয়ে ওটা দিয়েই দিতাম।
দেখা গেল তার এই কাগজপত্রের সঙ্গেও একশো টাকার তিনখানা নোট বেরিয়ে এসেছে। মেসো কাজ ভুলে আর বিগত টাকার শোক ভুলে রেগে গিয়ে বলে উঠল, এই টাকাও তো যাবে দেখছি, বাজে কাগজের সঙ্গে না মিশিয়ে টাকাটা আলাদা রাখা যায় না? টাকার ওপর কোন দরদ আছে তোর!
কাগজে লেখা কি হিজিবিজি হিসেব দেখতে দেখতে শঙ্কর জবাব দিল, যাবে না, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে এটা একজনের কাছে চালান হয়ে যাবে। এই তিনশো টাকায় কম করে ছশো টাকা ঘরে আসবে একেবারে ঘোড়ার মুখের খবর। রোদে ঘোরাঘুরি করে আর পা চলছিল না। তোমার এখানে একটু বিশ্রাম করে আবার বেরুব।
মেসো মুখ গোঁজ করে বলল, তা বেটে, কিন্তু তোমার হাতে আর এক পয়সাও দিচ্ছি না আমি।
–দিও না। মুখে আগ্রহের চিহ্ন মাত্র নেই, হিসেবের ওপর চোখ–কিন্তু পরে যেন আবার বলো না আগে বললি না কেন। চা আনতে বলো।
বেল বাজিয়ে মেসো বেয়ারাকে চায়ের হুকুম করল। কিন্তু ভিতরটা উসখুস করছে কেমন। মুখ দেখে মনে হল না আর সাধবে বা কি ব্যাপার খোলসা করে বলবে। চারশো টাকা খুইয়েছে বলে, কিন্তু এ-যাবৎ দিয়েছে যা সেটা মনে পড়লে চেষ্টা করে রাগ করে থাকা যায় না। মেসো লক্ষ্য করছে ছোকরা মনোযোগ দিয়ে কি একটা অঙ্ক কষছে এখন। একশো টাকার নোট তিনখানা টেবিলের কাগজপত্রের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে তখনো। কৌতূহল দমন করতে না পেরে জিজ্ঞাসা করল, ওই টাকা কার?