এমনি করেই হালকা ব্যাপারগুলোও ঘোরালো হয়ে উঠছে। যেমন সেদিন–সর পর এক বড় হোটেলে কাপুর সেদিন ওদের ডিনারে ডেকেছিল। ওদের বলতে রমেন্দ্র সরকার, সোমা সরকার আর রাখি। মনে মনে খুশি হল, কারণ ডিনারটা তাই প্রমোশনের খাতিরে। কিন্তু কাপুরের সেটা মাথায় না এলে রাখিই বা বলে কী করে?
ডিনারে হাসিখুশির ব্যাপারটা একটু বেশিই গড়ালো। এ-ধরনের নিরিবিলি সমাবেশে রমেন্দ্র সরকার আর কাপুরকে ড্রিঙ্ক করতে রাখি আগেও দেখেছে। সেদিন কাএ প্রস্তাব করল, তাদের সম্মানে মহিলাদেরও একটু ড্রিঙ্ক করতে হবে। সোমা সানন্দে রাজি। ও একেবারে অনভ্যস্ত নয়, সেটা খানিক বাদেই বোঝা গেল। কিন্তু তরল খুশির ব্যাপারটা জমে উঠল রাখিকে নিয়ে। সে কিছুতে খাবে না, কাপুর খাওয়াবে তাকে। গেলাসের রঙিন পদার্থ সে খুব হালকা করে মিশিয়ে তারপর সেই থেকে অনুরোধ করে চলেছে। শেষে সোমা বলেছে, অত করে বলছে, খা না বাপু, এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না–এই তো আমি দুবার মেরে দিলাম!
শেষ পর্যন্ত নাচার হয়েই গেলাসের জলীয় বস্তু চোখ-কান বুজে এক নিঃশ্বাসে জঠরে চালান করে দিল রাখি। বিচ্ছিরি লাগল। তেতো-তেতো স্বাদ। গায়ে একটা ঝঙ্কার দিয়ে উঠতে সকলে হেসে উঠল।
ডিনারের পর রমেন্দ্র সরকার কাপুরের গাড়িতে তার সঙ্গে কোথায় তাদের একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখতে চলে গেল। সোমা তার গাড়িতে রাখিকে পৌঁছে দিতে এলো। রাখির ভেতরটা তখন আনন্দে ভরাট, ভারী হালকা লাগছে। কোনো দুর্যোগের ছায়া তার কল্পনাতেও নেই। অন্যথায় বাড়ির দরজায় নেমে সোমাকে হয়ত গাড়ি থেকেই বিদায় দিতে চেষ্টা করত।
দোতলার বসার ঘরে ঢুকতেই সুবীরকান্তর সঙ্গে দেখা। সোমা হেসে বলে উঠল, আজ কিন্তু আপনার স্ত্রীর চরিত্র খারাপ করে দিয়েছি আমরা…কাপুর ওকে ড্রিঙ্ক করিয়ে ছেড়েছে!
শোনা-মাত্র মুখখানা যা হয়ে গেল, ভিতরে ভিতরে রাখি যেন কেঁপে উঠল। সোমাও বলে উঠল, ভয় পেয়ে গেলেন নাকি! কিছু ঘাবড়াবেন না মশাই, ইট ওয়জ জস্ট স্পোর্ট, আমি ওর ডবল খেয়েছি!
নিষ্প্রাণ ঠাণ্ডা গলায় সুবীরকান্ত জবাব দিল, আপনার যা সহ্য হবে ওর তা সহ্য। হবে কি?
সোমা চোখ পাকালো, কেন, আপনার স্ত্রীটিকে আপনি কারো থেকে কম ভাবেন। নাকি?
-না, তবে নিজের থেকেও খুব বেশি ভাবার মতো মুশকিলে না পড়ে যাই!
তরল বস্তুর প্রতিক্রিয়ায় সোমার ভেতরটাও খুব হালকা। অন্যথায় এই গম্ভীর আচরণ মর্যাদায় লাগার কথা। হেসেই রাখির দিকে ফিরল, তোর ভদ্রলোক দেখি বেজায় পিউরিটান, মেজাজপত্র খুব ভালো দেখছি না। আজ পালাই, আর একদিন এসে তর্ক করব।
লজ্জায় রাখির মাথা কাটা যাচ্ছিল। তাকে বিদায় দিয়ে ঘরে এসেই ফেটে পড়ল। বলে উঠলো, আমার বন্ধু হলেও ও আমার ডাইরেক্টরের স্ত্রী, এটা তোমার মনে রাখা উচিত ছিল–তুমি ওর সঙ্গে এ ব্যবহার করলে কী বলে!
হাতের বই রেখে সুবীরকান্ত আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল।–কী রকম ব্যবহার করতে হবে, তোমরা স্পোর্ট করে মদ খেয়ে এসেছ সেই আনন্দে আটখানা হয়ে উঠব?
-কী বললে? স্পোর্ট কাকে বলে তুমি জানবে কী করে? নিজের কাছে এক মস্ত লেক হয়ে বসে আছ তুমি, বাইরের দুনিয়ায় কেউ তোমার আদর্শের কানাকড়িও দাম দেয় না, সেখানকার সভ্যতা ভব্যতা সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা নেই–বুঝলে?
–ধারণা কার আছে, ওই কাপুরের? তাহলে তার কাছেই যাও!
–কী? কী বললে? দুপা এগিয়ে এলো সে।
–সামনে এসো না, ওইখানে দাঁড়াও। অনুচ্চ কিন্তু কঠিন এই স্বর শুনে রাখি থমকে আঁড়াল। তেমনি স্পষ্ট পুনরুক্তি সুবীরকান্তর। বললাম আমার দুনিয়ার আদর্শ আলাদা, সেটা যদি তোমার না পোষায়, তুমি অন্য ব্যবস্থা দেখতে পারো।
ভিতরের ঘরে ঢুকে গেল। সেখান থেকে মেয়ের ঘরে। মেয়ে রাতে আয়ার কাছে। ঘুমোয়–বাবা-মায়ের সঙ্গে একঘরে থাকা উচিত নয় বলে মাসছয়েক ধরে রাখিই এই ব্যবস্তা করেছিল। একটু বাদে মেয়ের ঘর থেকে আয়াকে বেরিয়ে আসতে দেখল। তারপরেই ওই লোককে শোবার ঘর থেকে নিজের বালিস নিয়ে যেতেও দেখল।
রাখির মাথায় আগুনই জ্বলছে। প্রতিদিনের এই সঙ্কীর্ণতার অত্যাচার যেন মুহূর্তের মধ্যে সহ্যের সীমা ছাড়াল। দুঘরের মাঝের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল সে। দেখল। একট।..বাহুতে চোখ ঢেকে মেয়ের পাশে শুয়ে আছে। অপমানে রক্তবর্ণ হয়ে গেল রাখির মখ। ঠাস করে মাঝের দরজা টেনে বন্ধ করে দিল সে। এত জোরে যে ঘুমন্ত মেয়েটা চমকে উঠল।
থাকুক। দেখা যাক কদিন পরে থাকতে। আদর্শবান পুরুষের আর এক দিকও খুব ভালই জানা আছে তার। এ অপমানের জবাব সেও দিতে জানে।
দিন কাটতে লাগল। যে চিড়টা খেল সেটা আর জোড়া লাগল না। কিন্তু কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে উঠতে লাগল। বাক্যালাপটা প্রয়োজনের বাক্যালাপে এসে ঠেকল। রাখির। কাজের সুনাম যেমন বাড়ছে, ব্যস্ততাও বাড়ছে। দুদিন একদিনের জন্যে মাসে কয়েক দফা ট্যুরে বেরুতে হয়। বেশ আনন্দের মধ্যেই কাটে তখন। কখনো খোদ ডাইরেক্টর রমেন্দ্র সরকার সঙ্গে থাকে, কখনো বা জয়েন্ট ডাইরেক্টার যজ্ঞেশ্বর কাপুর।
কিন্তু ফিরে এলেই সেই নীরস গুরুগম্ভীর পরিবেশ। রাখির হাঁপ ধরে যায় এক এক সময়। কোনো সময় যদি মেয়ে বা মেয়ের বাপের শরীর খারাপ হয়, সে খবরও ঝি-চাকরের মুখে শুনতে হয়। কেউ বলে না তাকে। তাকে অপ্রস্তুত করার জন্যই যে বলে না, রাখি সেটা ভালই বুঝতে পারে। তবু যতটুকু সম্ভব নিজের কর্তব্য করে যেতে চেষ্টা করে। মেয়ের আব্দারে তার বাপের এখনো তার কাছেই শোয়া বহাল আছে।
