সে-রাতে আমার ঘুম ভেঙেছিল ফজরের নামাজের সময়। জেগে দেখি বাদশা মামা চুপচাপ বসে আছেন চেয়ারে। আমাকে বললেন, আর ঘুমিয়ে কী করবি, আয় বেড়াতে যাই। আমরা সোনাখালি খাল পর্যন্ত চলে গেলাম। সেখানে পাকা পুলের ওপর দুজনে বসে বসে সূর্যোদয় দেখলাম। প্রচণ্ড শীত পড়েছিল সেবার। কুয়াশার চাঁদরে গাছপালা ঢাকা। সূর্যের আলো পড়ে শিশিরভেজা পাতা চকচক করছে। কেমন অচেনা লাগছে সবকিছু। মামা অন্যমনস্কভাবে বললেন, রঞ্জু, আজ তোর খুব দুঃখের দিন। দুঃখের দিনে কী করতে হয়, জানিস?
না।
হা হা করে হাসতে হয়। হাসলেই আল্লা বলেন, একে দুঃখ দিয়ে কোনো লাভ নেই। একে সুখ দিতে হবে। বুঝেছিস?
বুঝেছি।
বেশ, তাহলে হাসি দে আমার সঙ্গে।
এই বলে তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন। বাদশা মামার খুব মোটা গলা ছিল। তার হাসিতে চারদিক গমগম করতে লাগল। আমিও তার সঙ্গে গলা মেলালাম। বাদশা মামা বললেন, আজ আর বাসায় ফিরে কাজ নেই, চল শ্রীপুর। যাই। সেখানে আজ যাত্রা হবে। আমি মহাখুশি হয়ে তার সঙ্গে চলোম।
কত দিনকার কথা, কিন্তু সব যেন চোখের সামনে ভাসছে।
১০.
দীর্ঘদিনের জন্য যারা দেশের বাইরে যায়, তারা সঙ্গে কী নেয়? আমার অনুমান একটা জায়নামাজ (বাবা-মাকে খুশি রাখার জন্য, গানের সিডি, রান্নার বই। যারা নিজেদের ইনটেলেকচুয়েল মনে করেন তারা রবীন্দ্রনাথের এক কপি সঞ্চয়িতা নেন (কখনো সেখান থেকে কিছু পাঠ করা হয় না)।
আমি দীর্ঘদিনের জন্যে আমেরিকা যাচ্ছি। Ph.D নামক ডিগ্রি করে ফিলসফার টাইটেল পাব। আমি সঙ্গে নিচ্ছি একটা বিশাল বই। মরিসন অ্যান্ড বয়েডের লেখা Organic Chemistry. বাজারে আমার নিজের তখন চারটি বই নন্দিত নরকে, শঙনীল কারাগার, তোমাদের জন্য ভালোবাসা, অচিনপুর।
বইগুলোর একটি করে কপি হলেও সঙ্গে নেওয়া উচিত ছিল। কেন নেই নি তা এখন আর মনে নেই। হয়তো নিজের লেখা বইগুলো সঙ্গে নিতে লজ্জা পাচ্ছিলাম।
Organic Chemistry-র বিশাল বই সঙ্গে নেওয়ার একটাই কারণ। এই বিষয়ে আমি অত্যন্ত দুর্বল। শুনেছি ইউনিভার্সিটিতে প্রথম দিনেই তারা একটা পরীক্ষা নেয়। আমি নিশ্চিত পরীক্ষা নিলেই আমি এই বিষয়ে ফেল করব। দীর্ঘদিন ভ্রমণে যতটা পারা যায় ঝালিয়ে নেওয়া।
আমি যাচ্ছি North Dakota State University-তে। তিনটা ইউনির্ভাসিটি আমাকে টিচিং অ্যাসিসটেন্টশিপ অফার করেছে। এর অর্থ আন্ডার গ্রাজুয়েট ছাত্রদের ক্লাস নেব, তার বিনিময়ে Ph.D করার সুযোগ।
North Dakota State University বেছে নেবার পেছনের কারণ কিন্তু সাহিত্য। রসায়ন না। Little house in the Praire-র লেখিকা যে-জীবনের কথা বলেছেন তা North Dakota-র। উনার বই ছোটবেলায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়েছি। তার অনেকগুলো বই অনুবাদ করেছিলেন জাহানারা ইমাম। প্রথম বইটির নাম তিনি দিয়েছিলেন ঘাসের বনে ছোট্ট কুটির। লরা ইঙ্গেলসের প্রতিটি বই পড়ে গহীন অরণ্য, বরফের কাল, শিকার, প্রেইরি ল্যান্ডে যাত্রার গল্প পড়ে কতবার ভেবেছি–আহা, তারা কী সুখেই না ছিল?
ইউনিভার্সিটিতে Orientation হচ্ছে। আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো, প্রচণ্ড শীতের এই Fargo শহর আমি কেন পছন্দ করলাম? গরম অঞ্চলের ইউনিভার্সিটি বাদ দিয়ে কেন শীতের দেশের ইউনিভার্সিটি?
আমি লরা ইঙ্গেলসের নাম করলাম।
শিক্ষক ভুরু কুঁচকে বললেন, Who is she?
আমি হতভম্ব! (এখন হতভম্ব হই না। এখন আমি জানি পৃথিবীর সব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিশেষ জ্ঞান জানলেও সাধারণ জ্ঞানে সামান্য ‘Sof’)
মাসে আমার বেতন ৪৫০ ডলার। প্রথম মাসের বেতন পেয়েই মাকে একশ ডলার পাঠালাম। তাকে কপর্দকশূন্য অবস্থায় রেখে এসেছি (পাঠক! কপর্দক মানে কী? সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষা হচ্ছে)। গুলতেকিনের পেটে তখন আমার বড় মেয়ে। তার পৃথিবীতে আসার সময় হয়ে এসেছে, অথচ তার মা’র হাতও শূন্য। কী যে অবস্থা! একশ’ ডলার পাঠিয়ে খুবই স্বস্তি পেলাম।
আমেরিকায় আমার নতুন জীবন শুরু হলো। সেখানে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুপস্থিত। রসায়নময় জীবন। আন্ডার গ্রাজুয়েট ছাত্রদের প্রবলেম ক্লাস নেই। নিজে ক্লাস করি। প্রতি সপ্তাহেই পরীক্ষা। আমি ডাঙার মাছের মতোই খাবি খাচ্ছি।
প্রবলেম ক্লাসেও নানা সমস্যা। ছাত্রদের ইংরেজি বুঝি না। ওরাও আমার ইংরেজি বুঝে না। উদাহরণ দেই। এনট্রফির একটা অংশ আমি বেশ সময় নিয়ে বুঝালাম। তখন এক ছাত্রী উঠে দাঁড়াল। বিনীত গলায় বলল, তুমি যে কথাগুলো বললে তাকি এবার ইংরেজিতে বলবে? সারা ক্লাসে হাসির শব্দ। আমি আবার মতো দাঁড়িয়ে কী করব বুঝতে পারছি না।
প্রবলেম ক্লাস মূলত রসায়নের অঙ্কের ক্লাস। সেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা উদ্ভট প্রবলেম নিয়েও উপস্থিত হয়। যেমন এক ছাত্র বলল, সে এক ইন্ডিয়ান মেয়ের সঙ্গে ডেটিং করছে কিন্তু সেই মেয়ে তাকে চুমু খেতে দিচ্ছে না। একজন ইন্ডিয়ান হিসাবে এই প্রবলেমের সমাধান কী বলে তুমি মনে কর?
আমার থাকার জায়গা নিয়েও সমস্যা। প্রথমে এক আমেরিকান বুড়ির বাড়িতে উঠলাম। সে তার বাড়ির দোতলায় কয়েকটা এলোমেলো রুম বানিয়ে রেখেছে। রুমগুলো ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টদের ভাড়া দেয় (আমি কালো গাত্রবর্ণের কারণে তার কাছে ইন্ডিয়ান। সে বাংলাদেশের নাম কখনো শোনে নি।) দোতলায় একটা বাথরুম, তার কোনো দরজা নেই। বুড়ির যুক্তি তোমরা ছেলেরা ছেলেরা বাস কর। তোমাদের প্রাইভেসির দরকার কী?