বলতে কী এই গা ঘিনঘিন করাটাই দুর্ঘটনার পর অংশুর প্রথম প্রতিক্রিয়া। এ ছাড়া তার মন সম্পূর্ণ ফাঁকা, সুখ-দুঃখশূন্য।
একটু খোঁড়াতে খোঁড়াতে অংশু তার গাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে সরে এল। নীচের দিকে ঢালু জমি গড়িয়ে গিয়ে একটা চওড়া নালায় শেষ হয়েছে। নালাটা জলে ভরতি। দুটো ছাগল নির্বিকারভাবে আগাছা চিবোতে চিবোতে উঠে আসছে। অংশু একটা গাছের তলায় ছায়ায় বসল। কিছু করা উচিত। কিন্তু কী তা সে স্থির করতে পারছিল না।
একটা সমস্যা অবশ্যই রাণু। বেশ বড়োরকমের সমস্যা। বেঁচে থাকলে রাণুর সমস্যা হত না। যেমন করেই হোক নানারকম অনভিপ্রেত প্রশ্ন তারা দুজন মিলে এড়িয়ে যেতে পারত। কিন্তু রাণু এখন মৃত। অর্থাৎ নিরেট একটি বোঝা বা ভারমাত্র। অংশুর গাড়িতে তার উপস্থিতি নিয়ে যাবতীয় প্রশ্নের জবাব অংশুকে একাই দিতে হবে। রাণুর বদলে যদি সে নিজে মারা যেত বা দুজনেই, তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না। সে মরে রাণু বেঁচে থাকলে রাণু শুধু ঘটনাস্থল থেকে সরে পড়লেই হত। দুজনে মরলে অবশ্য প্রশ্ন উঠত কিন্তু জবাবদিহি করার কিছু ছিল না।
অবশ্য এসব সমস্যা খুব গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে না অংশু। তার ফাঁকা অভ্যন্তরে কিছু গুঞ্জন উঠছে মাত্র। বেকুব এবং রাগি এক লরিওয়ালা যে কী ঘটিয়ে গেল তা সে নিজেও জানে না। তবে প্রতিশোধটা সে বড়ো বেশি নিয়েছে। দূরপাল্লার লরি ড্রাইভারদের এত আত্মসম্মানবোধ থাকার কথা নয়। শুয়ার কি বাচ্চা বা ওই ধরনের। গালাগাল তাদের কাছে জলভাতের শামিল। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে এত বড়ো প্রতিশোধের পেছনে কারণ একটাই। দূরপাল্লার নারীবর্জিত দৌড়ে লোকটার ভিতরে একটা পুঞ্জিভূত যৌনকাতরতা ছিল। সেটাকে উসকে দিয়েছিল রাণু। আর সেই বেসামাল কাম থেকে এসেছিল ক্রোধ। ক্রোধ থেকে হিংসা। ইন্ধন ছিল অংশুর নিতান্তই বহুব্যবহৃত এবং বিষহীন একটি গালাগাল।
একটু দূর থেকে অংশু ধ্বংসস্তূপটা দেখতে পাচ্ছে। রাণুর পা দুটো এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না। অংশুর মনে হচ্ছিল, তার এখান থেকে অবিলম্বে সরে পড়া উচিত। কিন্তু কাজটা খুব বাস্তববুদ্ধিসম্মত হবে না। ওই ধ্বংসস্তূপ হাজারটা আঙুল তুলে তাকে নির্দেশ করবে, চিহ্নিত করবে।
হাইওয়ের ওপর পাঁচ-সাতজন লোক দাঁড়িয়ে পড়েছে। দু-তিনটে গাড়ি এবং লরিও থামল। ঢালু বেয়ে উঠে আসছে কাছাকাছি গ্রামের কিছু লোক। তাদের ভয়, বিস্ময় ও কাতরতার স্বাভাবিক উক্তিগুলি শুনতে পায় অংশু।
একজন স্যুটপরা বয়স্ক ভদ্রলোক অংশুর সামনে এসে দাঁড়ায়। অংশু চোখ ভালো করে তোলে না। এক পলক তাকিয়ে মুখটা নামিয়ে রাখে।
লোকটা জিজ্ঞেস করে, গাড়ি কে চালাচ্ছিল? আপনি?
হ্যাঁ। বলেই অংশু টের পায় তার গলার স্বর ভাঙা এবং বিকৃত। কেমন কেটে যাচ্ছে।
কী করে হল বলুন তো!
লরি। ফের গলার স্বরে একটা কাঁপুনি টের পায় অংশু।
ভদ্রমহিলা…! বলে ভদ্রলোক কথাটাকে ভাসমান রাখেন।
অংশু গলা খাঁকারি দেয়। এতক্ষণে সে শরীরেও কাঁপুনিটা টের পাচ্ছে। বলে, কী অবস্থা?
ভালো নয়। হাসপাতালে রিমুভ করতে হবে।
অংশু নড়ে না। মাটির দিকে চেয়ে থাকে।
আপনার ইনজুরি কীরকম?
কিছু বলতে তো হবে! শেষ অবধি সমস্যাটা কাটিয়ে উঠতে পারল অংশু। দয়াপরবশ একজনের গাড়ি হাসপাতালে পৌঁছে দিল তাদের। তাকে ও মৃত রাণুকে।
ডিসিজড-এর নাম?
রাণু সরকার।
ঠিকানা?
ম্যাকওয়ে অ্যাণ্ড কোম্পানি। সিক্সটিন…
এটা তো অফিসের ঠিকানা?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
হোম অ্যাড্রেস?
দেখুন, উনি ছিলেন, আমার কলিগ। আমরা একটা প্ল্যান্ট ভিজিট করতে যাচ্ছিলাম অন অফিসিয়াল স্ট্যাটাস। ওঁর হোম অ্যাড্রেসটা আমার জানা নেই।
অফিসে নিশ্চয়ই আছে!
আছে। বলে হাঁফ ছাড়ল অংশু।
আপনিও তো বেশ ইনজিয়োরড, না?
একটু তো লাগবেই। অত বড়ো অ্যাক্সিডেন্ট।
আপনি কি ভরতি হবেন না?
না। তার দরকার নেই। ওয়ান টেটভ্যাক উইল বি এনাফ। আমি কি যেতে পারি এখন?
কোথায় যাবেন?
বাড়ি। আমার একটু রেস্ট দরকার।
পুলিশ এনকোয়ারি হবে, জানেন তো!
জানি।
অংশু আরও কিছু প্রশ্নের জবাব দিয়ে বেরিয়ে এল। রিকশা ধরল একটা।
.
সমীরণের বাগানবাড়িটা ভারি ছিমছাম, নির্জন, সুন্দর। বিশাল বাগানে অনেক পাখি ডাকছে। অংশু স্নান করেছে। প্যান্ট, আণ্ডারওয়্যার ধুয়ে রোদে শুকোতে দিয়েছে। একটা মস্ত তোয়ালে জড়িয়ে বসে আছে বারান্দায় বেতের চেয়ারে। দু-কাপ চা খেয়েছে সে। শরীর বা মনের অস্থিরতার কোনো উপশম ঘটেনি।
সমীরণের বাগানবাড়িটা মোটামুটিভাবে ফুর্তিরই জায়গা। সমীরণ নিজে তার মেয়েমানুষদের নিয়ে এখানে আসে মাঝে মাঝে। সুতরাং এখানে একটি বার আছে। অংশু মদ খায় না। সে আর রাণু এসে বড়োজোর চা বা কফি খেয়েছে, মুরগির ঝোল দিয়ে ভাত সেঁটেছে, তারপর একটা শোয়ার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেছে। সেই আসঙ্গই ছিল মদ।
আজ দু-কাপ চায়ের পরও তার অন্য কিছু প্রয়োজন বলে মনে হল।
অংশু ডাকল, বিশু।
বিশু এলে বলল, কী আছে তোমাদের বলো তো! হুইস্কি বা ব্র্যাণ্ডি!
সব আছে।
একটু ব্র্যাণ্ডি দাও তো। সোডা মিশিয়ে কিন্তু।
বিশু চলে গেল। অংশু পাখির ডাক শুনতে লাগল। পাখি, অনেক পাখি।
বারান্দার সামনেই একটা ঢ্যাঙা লোহার ফ্রেমে শেকল বাঁধা একটা দোলনা ঝুলে আছে। তারা দু-জনে–অর্থাৎ অংশু আর রাণু যে দোলনায় চড়ত তা নয়। তবে মাঝে মাঝে রাণু গিয়ে বসত ওখানে। সে বসত পা। মুড়ে। হাতে থাকত স্কেচের প্যাড আর পেনসিল। অনেক পাখির স্কেচ করেছিল।
