চিঠি শুনে মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আস্তে-আস্তে বলল , ‘সারাদিন তুই করিস কি? সার্টিফিকেটটার জন্য একটু ঘোরাঘুরি করলে যদি হয়, করিস না কেন! অনিলের কাছে যাও অত বড় চাকরি করে, ঠিক বের করে দেবে।’
‘যাব।’
‘যাস! বুড়ো বয়সে এখন জেদ কমেছে লোকটার, এইবেলা নিয়ে আয়।’
মা মশারির ভিতরে বসে চুলের জট ছাড়াচ্ছে। বলল , চোখে কেন কুয়াশার মতো দেখি আজকাল। কর্তা আসবে, তার আগেই একবার হাসপাতালে নিয়ে যাস তো!’
আমি মা’র মশারি তুলে দিয়ে ভিতরে পায়ের কাছে গুটিসুটি মেরে শুলুম। ‘মশা ঢুকছে না!’ বলে ছোট্ট একটু ধমক দিয়ে মা আমার পিঠে হাত রেখে বলল , ‘কী এত খরচ করিস! এতদিন একটু আধটু জমালে দুটো দোচালা সত্যিই উঠে যেত। একটু গাছ-গাছালি লাগাতে পারতুম। নিজেদের বাগানের ফল–পাকুড় খাই না কত দিন!
‘একটু আদর করো না সোনা মা!’
৩.
আমার সামনের রাস্তায় হঠাৎ পড়ে লাফিয়ে উঠল একটা লাল বল। এমন চমকে উঠেছিলুম! তারপরই শোনা গেল সামনের হলুদ বাড়িটার দেওয়ালের আড়াল থেকে বাচ্চা ছেলেদের চিৎকার, ‘ওভারবাউন্ডারি…ওভারবাউন্ডারি!…মিলনের একুশ।’ শুনে আমি আপন মনে হেসে উঠলুম।
পিছনের পার্কটায় দেখে এলুম এক পাল কাকের সভা বসেছে। আর খোলা মাঠে ছেঁড়া কাগজ উড়িয়ে খেলছে বাতাস। মোড় ফিরতেই মুখোমুখি দেখা হল সেই মোটা, লাল ডাকবাক্সটার সঙ্গে। দূরে দেখা যায় তোমাদের বাড়ির চূড়ায় পরিটাকে–আকাশের দিকে বাড়ানো এক হাত–অন্যহাতে সে তার বাঁ-দিকের স্তন ছুঁয়ে আছে।
এখন দুপুর। রাধাচূড়া গাছের তলায় জলের ড্রাম, পেতলের থালা, আর ছাতুর ঝুড়ি সাজিয়ে বসেছে এক অল্পবয়সি ছাতুওয়ালা। তাকে ঘিরে রিকশাওয়ালাদের ভিড়। এক হাত খাবারের থালায় রেখে অন্যহাতে লোভী পাখিপক্ষীদের তাড়াতে-তাড়াতে যখন মাঝে-মাঝে আকাশের দিকে চেয়ে দেখে তখন মনে হয় খাবারের সঙ্গে আকাশ, মাটি ও উদ্ভিদদের বড় মায়া মিশে আছে। ইচ্ছে করে ওদের সঙ্গে বসে যাই।
চমৎকার দিন আজ। আকাশে এতটুকু মেঘ নেই। শীতের খর বাতাস বইছে।
তুমি আজ কোথাও ছিলে না। যখন তোমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে গেলুম তখন দেখি
একটা ঘাস–ছাঁটা কল বাগানময় ঠেলে নিয়ে বেড়াচ্ছে তোমাদের মালি। ব্যালকনিতে দুটো ডেকচেয়ার। তোমাদের অর্ধবৃত্তাকার গাড়িবারান্দার তলায় দাঁড়িয়ে আছে একটা একটু স্কুটার, যার রং ছানার জলের মতো সবুজ।
সারা দুপুর আমি আজ আর ভুলতে পারলুম না-ওই ঘাস–ছাঁটা কল, দুটো ডেকচেয়ার, আর ওই সবুজ একা একটা স্কুটার।
৪.
আজ প্রথম পিরিয়ডে আমি ক্লাসে ছাত্রদের ফুল্লরার বারো মাসের দুঃখের ভিতরে তখনকার গার্হস্থ্য চিত্র আর সমাজজীবন বিষয়ে একটা প্রশ্ন লিখতে দিয়ে জানালার কাছে এসে যখন দাঁড়ালুম তখন দেখা যাচ্ছে আকাশে নীচু একটু মেঘ। বৃষ্টি হবে কি! বৃষ্টির আগে ভেজা মাটির যে গন্ধ পাওয়া যায় আমি তার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলুম। বৃষ্টি এল না! শেষ ক্লাস ছিল। সেভেন–এ। ওরা গেল ক্লাস লিগে ক্রিকেট খেলতে। টিফিনে তাই ছুটি পেয়ে বেরিয়ে আসছি, গিরিজা হালদার একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলল , সই করুন।’ চটপট সই করে দিলুম! হালদার গজগজ করতে-করতে কমনরুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, ‘কীসে সই করলেন, একবার পড়েও দেখলেন না।’ চেঁচিয়ে বললুম, ‘যে কোনও আন্দোলনই করুন–আমি সঙ্গে আছি। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।’ বেরিয়ে এসে খুশি মনে দেখলুম ঝকঝক করছে দিন।
পাবলিক ইউরিন্যালের নোংরা দেয়ালে পেনসিলে লেখা অনেক অশ্লীল কথার মধ্যে কে লিখে –গোপাল আর নাই। ‘গোপাল’ থেকে পেন্সিলের হালকা রেখা ‘নাই’–তে এসে গম্ভীর। যেন বা হতাশা থেকে ক্রমে ক্রোধ! লেখা নেই, তবু মনে হয় হতাশার ‘হায় গোপাল’ থেকে শুরু, শেষে এসে রাগ–’নাই কেন?’ লেখা আছে–গোপাল আর নাই। আমি পড়লুম–’হায়! গোপাল!’ পড়লুম, ‘গোপাল আর নাই কেন?’
বেরিয়ে আসছি, দেখি দেশপ্রিয় পার্কের কাছে ট্রামের স্টপে ভিড়ের মধ্যে একটা চেনা মুখ! সুধাকর না! কলেজ টিমের দুর্দান্ত লেফট আউট ছিল! দেখি গায়ে চর্বি জমেছে, থলথল করছে ভূঁড়ি, কাঁধে ঝুলছে শান্তিনিকেতনের ঝোলা ব্যাগ। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। পায়ে চপ্পল।
ফার্স্ট ডিভিশনেও কিছুদিন খেলেছিল সুধাকর। তখন ওর দৌলতে ডে স্লিপে কত খেলা দেখেছি। মনে পড়ে লাইটহাউসে দুজনে দশ আনার লাইন দিতে গেছি, দুটো অচেনা ছেলে লাইন থেকে ডেকে বলল , ‘আপনি এস সেন না?’ সুধাকর মাথা নাড়ল–’হ্যাঁ’। ‘আসুন না, এখানে জায়গা করে দিচ্ছি।’ লাইনে দাঁড়িয়ে সুধাকর চাপা গলায় বলেছিল, ‘কিরে শালা দেখলি!’
চার বছর আগে শেষ দেখা চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতালের সামনে। তখন ওর মায়ের ক্যানসার। ইউটেরাসে। দুজনে চৌরঙ্গি পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছিলুম। বললে, ‘খেলা ছাড়ার পরই একটা মজার চাকরি পেয়ে গেছি ভাই। কনস্ট্রাকশনে। কাজকর্ম কিছু বুঝি না, কিন্তু এধার-ওধার থেকে কেমন করে যেন পয়সা এসে যায়!’ পরমুহূর্তে গম্ভীর হয়ে বলল , কিন্তু আমি ইমমরাল নই, খেলার মাঠেও মার না খেলে কখনও মারিনি।’ তখন শীত শেষ হয়ে কলকাতায় গরম পড়ে গেছে, তবু সুধাকরের গায়ে ছিল একটা পুরোনো ব্লেজার বুকের কাছে মনোগ্রাম করা, যেন চোখ পাকিয়ে বলছিল–আমি খেলোয়াড় সুধাকর।
