মলির সঙ্গে সেই থেকে সম্পর্কটা আর স্বাভাবিক রইল না। মাঝখানে এক অচেনা সুব্রত এসে পরদা ফেলে দিল।
পরের এক মাস কনিষ্ক নানা জ্বলুনিতে জ্বলে গেল মনে-মনে। মলি তখন প্রায় সময়েই সুব্রতর সঙ্গে প্রোগ্রাম করে। তবে সে একথা বলত—দ্যাখো, হিংসে কোরো না যেন। কোনও পুরুষই তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয় আমার কাছে।
কিন্তু কনিষ্ক সে কথা মানে কী করে? সে যে অনবরত হীনমন্যতায় ভুগছে।
তাই একদিন সে তার পরিষ্কার গোটা-গোটা হস্তাক্ষরে চিঠি লিখে মলিকে জানিয়ে দিল আমাদের আর বেশিদূর এগোনো ঠিক নয় মলি। এখানেই দাঁড়ি টেনে দেওয়া উচিত।
চিঠি লিখে সে দু-মাসের ছুটি নিয়ে বাইরে গেল বেড়াতে। এতদিনে বাড়ির লোকেরা তার বিয়ে ঠিক করল। মাত্র পনেরো দিন আগে সে সম্পূর্ণ অদেখা, অচেনা, অজানা শম্পাকে বিয়ে করেছে। বলতে কি, শম্পার সঙ্গে তার প্রথম দেখা শুভ দৃষ্টির সময়ে। ভালো করে তাকায়নি কনিষ্ক। তার মনে তখন এক বিদ্রোহ ভাব। সমস্ত পৃথিবীর প্রতি বিতৃষ্ণা, বিরাগ, ভয়।
গত পনেরো দিন সে যে শম্পার সঙ্গে খুব ভালো করে মিশেছে তা বলা যায় না। কথাবার্তা হয়েছে, পাশাপাশি এক বিছানায় শুয়েছে, প্রাণপণে ভালো ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে মেয়েটির প্রতি। কিন্তু তা বলে তার মনে হতাশা ও সন্দেহের ভাবটি যায়নি। কেবলই মনে হয়, পৃথিবীর সর্বত্র তার চেয়ে বহুগুণে যোগ্যতর লোকেরা ছড়িয়ে আছে। সে একটা হেরো লোক। নিজের সম্পর্কে এইসব জরুরি চিন্তা তাকে এত বেশি ব্যস্ত রেখেছিল যে তার কাম তিরোহিত হয়, আগ্রহ কমে যেতে থাকে, শম্পা দেখতে কেমন তাও সে বিচার করে দেখেনি।
কনিষ্কর মা আজ সকালে তাকে ডেকে বললেন—খোকা, বউমা, কেন লুকিয়ে-লুকিয়ে কাঁদে রে? তোর কি বউ পছন্দ হয়নি?
কনিষ্ক মুশকিলে পড়ে বলে, তা নয়। আমি তো ভালো ব্যবহারই করি।
—শুধু ভালো ব্যবহারেই কি সব মিটে যায় বাবা? পুরোনো কথা ভুলে এবার নতুন করে সব শুরু করে দাও। যাকে ঘরে এনেছ তার দিকটা এবার দ্যাখো। বউ তো ক্রীতদাসী নয়, তার মনের দিকে নজর দিতে হবে।
–কী করব মা? আমার হইচই ভালো লাগে না।
হইচই করতে হবে না, আজ বিকেলে বউমাকে নিয়ে বেড়াতে যা। দ্বিরাগমন সেরে আসবার পর দুজন মিলে তো কোথাও গেলি না দেখলাম।
অনেক ভেবেচিন্তে প্রস্তাবটা গ্রহণ করল কনিষ্ক। আসলে মলি বা সুব্রতর কথা ভাবার কোনও মানেই হয় না। কেন না এই নতুন অবস্থায় সে আর পুরোনো সম্পর্কের মধ্যে ফিরে যেতে পারে না।
সিনেমা দেখার কথা ছিল, কিন্তু টিকিটি পাওয়া যায়নি। তাই নিছক ঘুরে বেড়ানোর জন্যই দুজনে বেরিয়েছে। কথা আছে, আজ রাতে বড় কোনও রেস্টুরেন্টে দুজনে রাতের খাওয়া সেরে একেবারে বাড়ি ফিরবে।
কনিষ্ক ট্যাক্সি নিয়েছিল। টালিগঞ্জ ছাড়িয়ে খানিক দূর আসতেই শম্পা বলল, শোনো, ট্যাক্সিটা এবার ছেড়ে দাও।
-কেন?
—ট্যাক্সি করে আমাদের মতো লোক বেড়াতে যায় না। মধ্যবিত্তরা প্রয়োজনে ট্যাক্সি নেয়। বেরানোর জন্য ট্যাক্সি ভালো নয়।
—তবে কীসে যাবে? ট্রামে বাসে যা ভিড়!
—হোক। তবু ভিড় ভালো। কত মানুষ দেখা যায়।
কনিষ্ক নড়েচড়ে বলে, তুমি কি ভিড় পছন্দ করো? আমি করি না।
—ভিড় নয়, তবে মানুষ পছন্দ করি। ট্যাক্সির ভিতরে নিঝুম হয়ে বসে থাকাটা ভারী একঘেয়ে। কিছু দেখা যায় না, শোনা যায় না।
কনিষ্ক রাসবিহারীর মোড়ে ট্যাক্সি ছেড়ে দিল।
হাঁটতে-হাঁটতে শম্পা বলল, তোমাকে কিছু জিগ্যেস করতে শাশুড়ি মা আমাকে বারণ করেছেন। কিন্তু আমার একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করে।
–কী?
—তুমি এত অহংকারী কেন?
—আমি অহংকারী?
–নয়?
কনিষ্ক অবাক হয়ে বলে—মোটেই নয় শম্পা। বরং আমি ঠিক উলটোটাই সব সময়ে ভাবি। আমার মনে হয়, আমি বড় অপদার্থ পুরুষ।
—সে কী! কেন?
—আমি তো তেমন স্মার্ট নই। লম্বা চওড়া নই। আমার ভিতরে হাজার রকমের ডেফিসিয়েন্সি।
শম্পা খুব খিলিখিলিয়ে হাসে। বলে—তাই নাকি! তাহলে তো তোমাকে বিয়ে করাটা মস্ত ভুল হল!
—হলই তো।
—শোনো। ভাবতে গেলে, আমারও হাজারটা ডেফিসিয়েন্সি। নিজের দোষ কোলে করে বসে থাকলে তো জীবনটাই তেতো হয়ে গেল।
শীতকালের বেলা। ক্রিসমাসের ছুটি চলছে। হাজারটা লোক বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়। অপরাহ্নের কোমল কবোষ্ণ রোদে আর ছায়ায় অপরূপ হয়ে আছে পথঘাট।
এই আলোয় আজ কনিষ্ক শম্পার মুখশ্রী খুব অকপট চোখে দেখল। তুলনা করে নম্বর দিলে। মলি আর শম্পা প্রায় সমান-সমান নম্বর পাবে। শম্পার তুলনায় মলি কিছু লম্বা ছিল, কিন্তু সেই রকম আবার মলির চেয়ে শম্পা ফরসা। মলির শরীরে কিছু বাড়তি মেদ ছিল বলে পেটে ভাঁজ পড়ত। শম্পার সেসব নেই। মলির মুখখানা ছিল গোল ধরনের। শম্পার মুখ লম্বাটে, লাবণ্য শম্পারই বেশি কারণ সে বয়সে মলির চেয়ে কম করে পাঁচ বছরের ছোট। বিএ পরীক্ষা দিয়েই। তার বিয়ে হয়েছে।
কনিষ্কর কথাটা ভালো লাগল। নিজের দোষ কোলে করে বসে থাকাটা কাজের কথা নয়।
সে বলে, আমাকে তোমার কেমন লাগে?
—আগে বলো, আমাকে তোমার কেমন?
–শোনো শম্পা, তোমাকে কেমন লাগে তা আমি এখনও ভেবেই দেখিনি।
আচমকা শম্পা বলে—মলিকে তোমার কেমন লাগত?
কনিষ্ক থমকে যায়। অনেকক্ষণ বাদে বলে, তুমি জানলে কী করে?
–তোমার মা বলেছেন।
