ভেরি ইন্টারেস্টিং!
হ্যাঁ। তাতে অবশ্য আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বিব্রত হয়ে পড়ে এবং তার মুখ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টাও হয়। শুনেছি তার মেজোমামা তাকে মারধরও করেছিল। কিন্তু আমার মেয়েটা খুব স্টাববার্ন। সে ওই কথা থেকে নড়েনি। আর তার চেঁচামেচিতেই পাড়াপ্রতিবেশীরা এসে জড়ো হয় এবং একটা জনমতও তৈরি হতে থাকে। শেষ অবধি জনমতের চাপইে কেস রি-ওপেন হয়। নতুন করে সাক্ষী নেওয়া হয়, আমার মেয়ে পুলিশের কাছে। এবং আদালতে খুনটার নিখুঁত বিবরণ দিয়েছিল।
আর তার সাক্ষ্যতেই আপনি ছাড়া পেলেন তো?
হ্যাঁ। বেকসুর খালাস।
কিন্তু খুনটা! সেটা কী করে হয়েছিল?
আমি আপনাকে আমার স্ত্রীর হত্যাকান্ড বা তজ্জনিত কল-আউট শোনাব বলে ডাকিনি। কিন্তু কথাটা কেন যে সেদিকেই গড়িয়ে গেল কে জানে! আপনি কি এতে কোনো ইন্টারেস্ট পাচ্ছেন? চারদিকে নানাভাবে মানুষ খুন হচ্ছে, কোনো-না-কোনো কারণে। ব্যাপারটা বড্ড জলভাত হয়ে গেছে, তাই-না?
কোনো কোনো ঘটনা আছে যা ম্যাগনেটের মতো কথাকে টেনে নেয়। আপনি অন্য প্রসঙ্গে গেলেও, কথার গতি খুব অদ্ভুতভাবে সেইদিকেই মুখ ফেরায়।
তার মানে কি ব্যাপারটা খানিকটা ভৌতিক?
আমি ভূতে বিশ্বাসী নই।
আমিও নই। তবে কথাটা আপনি ঠিকই বলেছেন। কথার একটা নিজস্ব ইনার্সিয়া আছে। হ্যাঁ, আপনাকে যেন। কী বলছিলাম?
আপনার স্ত্রীর খুনের ঘটনাটা। আমরা এক জায়গায় থেমে আছি। আপনি একটা চৌকাঠে ঠেকে গেছেন। আর এগোতে চাইছেন না। অবশ্য গোপন করার মতো কিছু থাকলে আমিও আর জানতে চাইব না।
যে-ঘটনা সবাই জানে, যা নিয়ে খবরের কাগজ এবং টিভিতে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা হয়েছে তার আবার। গোপনীয়তা কীসের? এখন অবশ্য সবাই ভুলেও গেছে। ঘটনাটা পাঁচ বছর আগেকার। মাস মেমরি পুরোনো কথা মনে রাখতে পারে না।
তা তো ঠিকই। গোপন করার মতো কিছু না থাকলে আমি এর শেষটা জানতে চাই।
খুনি কে, তা তো?
হ্যাঁ।
আমার মেয়ে আদালতে দাঁড়িয়ে শপথ নিয়ে যা বলেছিল তা হল এই যে, সেদিন সে স্কুলে যায়নি। প্রাক্তন হেডমিস্ট্রেস মারা যাওয়ায় স্কুল বন্ধ ছিল। দুপুর একটা নাগাদ কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে সে গিয়ে দরজা। খোলে। যে-লোকটা ঘরে ঢোকে সে বেশ লম্বা-চওড়া, সবুজ শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা, চাপ-দাড়ি আছে, ডান হাতে বালা। লোকটা তার এবং আমাদেরও চেনা। নাম সংগ্রাম সিংহ। মাঝে মাঝে লোকটা তাদের বাড়িতে আসত। তার বাড়ি কোথায় তা সে জানে না। তবে সে তাকে কাকু বলে ডাকত। মায়ের সঙ্গেই তার বন্ধুত্ব ছিল বেশি। সেদিন বাড়িতে এসে সংগ্রাম সিংহ নাকি তার মাকে সিনেমায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। মা যেতে চায়নি। এ-নিয়ে দুজনের মধ্যে একটু মান-অভিমান-মতো হয়। অবশ্য তখন সে নিজের ঘরে ফিরে গিয়েছিল। দূর থেকে শুনতে পাচ্ছিল, সংগ্রামের সঙ্গে তার মায়ের কথাবার্তা ক্রমে ঝগড়ার পর্যায়ে যাচ্ছে। আর তারপরেই তার মায়ের আর্তনাদ। সে ছুটে এসে দেখে সংগ্রাম সিংহ সদর দরজা খুলে দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে, আর তার মা পড়ে আছে মেঝের ওপর।
এই সংগ্রাম সিংহ লোকটা কে?
আমি জানি না।
তাহলে আপনার চেনা লোক হল কী করে?
আমি আমার মেয়ের জবানিটা বলছি, কথাগুলো আমার নয়, আমার মেয়ের।
বুঝতে পারলাম না। সংগ্রাম সিংহ কি তাহলে–?
আমার স্ত্রীর গোপন প্রেমিক কি না? বোধহয় না। আমার স্ত্রীর কোনো প্রেমিক ছিল বলে আমার জানা নেই।
সংগ্রাম সিংহকে জেরা করে কিছু জানা যায়নি?
পুলিশ তাকে খুঁজে পায়নি।
অ্যাবসকণ্ডি?
হবে হয়তো, আমি জানি না।
কী করত লোকটা?
আমার মেয়ের ভার্সন অনুযায়ী সংগ্রাম সিংহ একজন ব্যবসায়ী। বড়োবাজারের দিকে কোথাও তার বাবার আড়ত আছে।
তাহলে তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না কেন?
কয়েকজনকে সন্দেহবশত ধরা হয়েছিল। তবে আমার মেয়ে তাদের আইডেন্টিফাই করতে পারেনি। ডাক্তার বলেছিল, ওর মেমরি এখনও অর্ডারে নেই।
আপনাকেও নিশ্চয়ই সংগ্রাম সিংহ সম্পর্কে জেরা করা হয়?
হ্যাঁ। আমি আমার মেয়ের কথারই পুনরাবৃত্তি করে যাই। একথাও বলি যে, আমি তাকে আমার স্ত্রীর বন্ধু। হিসেবেই একটু-আধটু চিনতাম। তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা নেই।
ফোন নম্বর-টম্বর?
হ্যাঁ। আমার স্ত্রীর ফোনবুকে সংগ্রাম সিংহের মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়। কিন্তু সেই নম্বরের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
ধরা গেল না তাহলে?
পুলিশ ধরতে না পারলেও আমি ধরেছি।
আপনি! কীরকম?
ছাড়া পাওয়ার পর আমি একদিন আমার মেয়ে স্কুলে যাওয়ার পর তার ঘরে একটা বই খুঁজে পাই। ইংরিজি গোয়েন্দা গল্প। বইটায় একটা বিশেষ পেজমার্ক দেখে সন্দেহ হয়েছিল। সেই জায়গাটা খুলে দেখি, সেখানেও একটি চোদ্দো বছরের মেয়েকে তার মায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে জেরা করা হচ্ছে আর মেয়েটা একটা কাল্পনিক আততায়ীর বিবরণ দিয়ে যাচ্ছে। এবং সেখানেও সে তার বাবাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিল।
তার মানে সংগ্রাম একটা ফিকটিশাস ব্যাপার?
হতে পারে।
তাহলে খুনটা কে করল?
আবার বলছি, আমার স্ত্রীর মৃত্যুরহস্য উদঘাটন করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি বলতে চাই, আমার মেয়ের কথা। আমার মেয়ে অত্যন্ত ইনোভেটিভ, স্টাবোর্ন এবং যাকে ভালোবাসে তাকে রক্ষা করার জন্য সব কিছু করতে পারে। তার বয়স এখন উনিশ, সে বুদ্ধিমতী, সুলক্ষণা।
