শোভারামের পায়ে নতুন জুতো। নদীয়া আড়চোখে দেখে। বেশ বাহারি জুতো। চামড়ার ওপরে মাছের আঁশের মতো নকশা তোলা, রংটাও ভালো। নদীয়ারই সময় খারাপ পড়ে গেছে। শ্বাস ফেলে বলে–নতুন কিনলি বুঝি জুতো জোড়া?
শোভারাম বিস্তর রংঢং দেখিয়ে বলে—ঠিক কেনা নয় বটে! শোভারাম ভেবে চিন্তেই বলে। কারণ, সে নিজের পয়সায় জুতো কিনেছে এটা নদীয়া বিশ্বাস নাও করতে পারে।
নদীয়া রসিকতা করে বলে–কিনিসনি! তবে কি শ্বশুরবাড়ি থেকে পেলি? না কি শেষ অবধি জুতো চুরি পর্যন্ত শুরু করেছিস।
অপমানটা হজম করে শোভারাম। কিন্তু লোক চরিয়েই সে খায়, খামোকা চটে লাভ কী! ভালোমানুষের মতো বলে–না গো নদীয়াদা, সে সব নয়। গেল হপ্তায় বৈরাগী মণ্ডলের হয়ে সদরে একটা সাক্ষী দিয়ে এলাম। টায়ারের চটিটা ফেঁসে গিয়েছিল হোঁচট খেয়ে। তো বৈরাগী মণ্ডল জুতো জোড়া কিনে দিল। কিন্তু তখন তাড়াহুড়োয় খেয়াল করিনি, মনে হচ্ছে এক সাইজ ছোট কিনে ফেলেছি! বেদম টাইট হচ্ছে। দ্যাখো তো, তোমার পায়ে লাগে কি না—
বলে শোভা জুতো খুলে এগিয়ে দেয়। নদীয়া উদাস হয়ে বলে–লাগলেই কী! ওসব বাবুগিরি কি আমাদের পোষায়!
শোভারাম অভিমানভরে বলে—তুমি চিরকালটা একরকম রয়ে গেলে নদীয়াদা! তাই তো তোমার বউ ওরকম ধারা ব্যাটাছেলে হয়ে গেল! নাও তো, পরে দ্যাখো! পায়ে লাগলে এমনিই দিয়ে দেব। ত্রিশ টাকায় কেনা, তো সে কত টাকা জলে যায়। পরে দ্যাখো।
নদীয়া এবার একটু নড়ে। বলে–কত টাকা বললি?
শোভারাম হাসে, বলে—ত্রিশ টাকা। মূৰ্ছা যেয়ো না শুনে। ওর কমে আজকাল জুতো হয় না।
নদীয়া উঠে এসে জুতো জোড়া পায়ে দিল। পাম্প-শুর মতোই কিন্তু ঠিক পাম্প-শু নয়। বেশ নরম চামড়া। দু-চার পা হেঁটে দেখল নদীয়া। আরে বা! দিব্যি ফিট করেছে তো! এই শীতে পায়ে বড় কষ্ট। চামড়া ফেটে হাঁ করে থাকে, ভিতরে ঘা, তাতে ধুলোময়লা ঢুকে কষ্ট হয়। তা ছাড়া পাথরকুচির রাস্তায় অসমান জমিতে পা পড়লে হাওয়াই চটিতে কিছু আটকায় না, ব্রহ্মরন্ধ পর্যন্ত ঝিলিক দিয়ে ওঠে যন্ত্রণায়। এই জুতোজোড়া পরেই নদীয়া টের পেল আরাম কাকে বলে। পায়ে গলিয়ে নিলেই পা দুখানা ঘরবন্দি হয়ে গেল। ধুলোময়লা, পাথরকুচি কিংবা শীত কিছুই করতে পারবে না।
শোভারাম খুশি হয়ে বলে—বাঃ গো নদীয়াদা, জুতোজাড়া যেন তোমার জন্যই জন্মেছিল। আমাদের ছোটলোকি পায়ে কি আর ওসব পোষায়! তুমিই রেখে দাও! আমি না হয় একজোড়া টায়ারের চটি কিনে নেব। বাজারের ওদিকে মহিন্দির টায়ারের চটির পাহাড় নিয়ে বসে আছে।
নদীয়া একটু দ্বিধা করে বলল—টায়ারের চটি কি সস্তা নাকি রে? হলে বরং আমিও একজোড়া–
—আরে না-না! শোভারামের মাথা নেড়ে বলে—সে বড় শক্ত জিনিস। তোমরা পায়ে দিলে ফোস্কা পরে কেলেঙ্কারি হবে। কড়া আর জীবনে সারবে না। ওসব কুলিমুজুরের জিনিস। তুমি এটাই রেখে দাও। যা হোক, দশ-বিশ টাকা দিয়ে দিয়ে, তোমার ধর্মে যা সয়।
সঙ্গে-সঙ্গে নদীয়া জুতোজোড়া খুলে ফেলে বলে—ও বাবা, বলিস কি সব্বোনেশে কথা, ডাকাত, কোথাকার! দশ বিশ টাকা পায়ের পিছনে খরচ! আমি আট টাকার ধুতি পরি।
শোভারাম অপলকে খানিকক্ষণ চেয়ে থাকে নদীয়ার দিকে তারপর খুব ধীরে বলে—তোমার লাভের গুড় পিঁপড়ে খাবে নদীয়াদা। ফৌত হয়ে যাওয়ার আগে নিজের আত্মাটাকে একটু ঠান্ডা করো। খাও না, পরো না, ও কীরকম ধারা রুগি তুমি? দুনিয়ার কত কী আরামের জিনিস চমকাচ্ছে —তুমিই কেবল নিভে যাচ্ছ।
নদীয়া না-না করে। আবার জুতোটা তার বড় ভালো লেগে গেছে। ফের ছাড়া জুতো পায়ে পরে দেখে। বড় বাহার। আরামও কম কি! সেই কবে ছেলেবেলায় বাবা জুতো কিনে দিত, তখন পরেছে, নিজে রোজগার করতে নেমে আর বাবুগিরি হয়নি। বলল-দশ টাকা যে বড্ড বেজায় দাম চাইছিস রে!
—দশ কী বলছ? বিশ টাকা না হয় পনেরোই দিয়ো। সে-ও মাগনাই হল প্রায়। নেহাত জুতোজোড়া আমার ছোট হয়, আর তোমারও ফিট করে গেল। নইলে এখনও বাজার ঘুরলে বিশ পঁচিশটাকায় বেচতে পারি।
–বারো টাকা দেব। ওই শেষ কথা। যা, ও মাসে নিবি।
হ্যাঁ-হ্যাঁ করে হাসে শোভারাম। বলে—বারো? তার চেয়ে এমনিই নাও না। ভেলুরামের ব্যাটা অনেক টাকা দেখেছে, বুঝলে নদীয়াদা!
সবশেষে তেরো টাকায় রফা হল। তাতে অবশ্য শোভারামের এক তিলও ক্ষতি নেই। যত তাড়াতাড়ি মাল পাচার করা যায়। নইলে বাংলা সাবান কিনতে আসা দোকানদারটা বাজারময় হাল্লাচিল্লা ফেলে দেবে। নগদ তেরো টাকা নিয়ে শোভারাম অন্ধকারে সাঁত করে মিলিয়ে গেল।
নদীয়া জুতোজোড়া লুকিয়ে ফেলল চৌকির পাশের ছায়ায়। বলা যায় না, শোভারাম শালা চোরাই মাল যদি গছিয়ে দিয়ে থাকে তো ফ্যাসাদ হতে পারে। থাক একটু লুকনো, নদীয়ার পায়ে দেখলে কেউ আর পরে সন্দেহ করতে পারবে না। দোকানের কর্মচারীটা ওদিকে বসে আগুন পোহাচ্ছিল, সব শুনেছে কি না কে জানে। নদীয়ার কোনও কাজই তো সহজপথে হয় না। সবই যেন কেমন রাহুগ্রস্ত। তার মতো দুঃখী…নদীয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। আড়চোখে একবার জুতো জোড়া দেখে নেয়। মিটিমিটিয়ে হাসে। খুব দাঁও মারা গেছে। তবু তেরোটা টাকা…ভাবা যায় না। কর্মচারীটা আবার জুতো কেনার সাক্ষী থাকল না তো!
