বাথরুমের বড় আয়নায় কোমর পর্যন্ত নিজের আকৃতির দিকে চেয়ে মৃদু হাসল জীবন। দুর্ধর্ষ কাঁধের ওপর শক্ত ঘাড়, বুকে দু-ধারে চৌকো পেশি, দাঁতে ব্রাশ ঘষতে হাতের শক্ত রগ, শিরা আর মাংসপেশিতে ঢেউ ওঠে। ছোট করে ছাঁটা চুল, টানা, মেয়েলি এবং দুঃখী এক ধরনের অদ্ভুত চোখ তার। তার গায়ের রং শ্যামবর্ণ, যেমনটা মিঠুর। মধু তার মায়ের মতোই ফরসা। জীবনের নাক চাপা, ঠোঁট একটু পুরু কিন্তু সুন্দর। তার সঙ্গে মিঠুরই মিল বেশি, মধুর সঙ্গে অপর্ণার। জীবনের চেহারায় পরিশ্রমের ছাপ আছে, বোঝা যায় আলস্য বা আরামে সে খুব অল্প সময়ই ব্যয় করেছে। তৃপ্তিতে আয়নার দিকে চেয়ে হাসে জীবন। বাস্তবিক প্রায় ফুটপাথের, রাস্তার জীবন থেকে এতদূর উঠে আসতে পারার পরিশ্রম ও সার্থকতার কথা ভাবলে তার মাঝে-মাঝে নিজেকে বড় ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। সে তার বউ মেয়ে এবং পরিবারের জন্য কি সমস্ত কর্তব্যই করেনি! এই ভেবেই সে তৃপ্তি পায় যে এরা কেউ দুঃখে নেই, জীবনের ওপর পরম নির্ভরতায় এরা নিশ্চিন্তে বেঁচে থেকে বেঁচে থাকাকে ভালোবাসছে। সে নিজেও কি বেঁচে থাকাকেই ভালোবাসেনি বরাবর। যখন সেই অনিশ্চিত ছেলেবেলায় সে কখনও চায়ের দোকানের বাচ্চা বয়, কখনও বা মোটরসারাই কারখানার ছোঁকরা কারিগর, তখনও সে রাস্তা পার হতে গিয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুল দেখে আনন্দে গান গেয়েছে, খাদ্য অনিশ্চিত ছিল তবু প্রতিটি খাদ্যকণার কত স্বাদ ছিল তখন! তখন দেশভাগের পর কলকাতায় এসে রহস্যময় এই শহরকে কত সহজে চিনে নিয়েছিল জীবন! আজ সে যখন তার ফ্ল্যাটের ব্যালকনি থেকে, গাড়ির জানালা থেকে, বা বার-এর দরজার কাঁচের পাল্লার ভিতর দিয়ে দেখে তখন এখানকার রাস্তাঘাট, ভিড়, আলো কত দূরের বলে মনে হয়! কিংবা রাতে ঘোর মাতাল অবস্থায় ফিরে এসে যখন খাওয়ার ঘরে ঢাকা খাবার খুলে সে সুন্দর। সমস্ত খাবারের রঙের দিকে চেয়ে দেখে তখনও তার মনে হয় এসব খাবারে কি সেই সব স্বাদ আর পাওয়া যাবে!
জীবন ঘরে ঢুকে দেখল ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে অপর্ণা মধুকে সাজাচ্ছে। জীবন বলল ‘ও যাবে নাকি!’
অপর্ণা মধুর মাথায় রিবন জড়াতে–জড়াতে বলল ‘যাবে না! থাকবে কার কাছে! যা বায়না মেয়ের।’
জীবন বিরক্তভাবে মুখ ফিরিয়ে দেখল মিঠু মেঝের লিনোলিয়মে খোলা হাসিখুশি’র সামনে বসে হাঁ করে মা আর মধুর দিকে চেয়ে আছে। জীবন বলল ‘দোকানে-দোকানে ঘুরতে হবে, ওকে নিলে অসুবিধে। কখন জলতেষ্টা পায়, কখন হিসি পায় তার ঠিক কী!’
শুনে মিঠু মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসে। অপর্ণা তার ধীর হাতে মধুর মাথার রিবন সরিয়ে নেয়। তখনই গম্ভীর মুখে একবার মিঠুর দিকে চেয়ে বলে ‘ঠিক আছে।’
জীবন সঙ্গে-সঙ্গে সহজ হওয়ার ভাব করে বলে ‘অবশ্য তোমার যদি ইচ্ছে হয়—’
‘না, থাক। আতর তো রইলই, ও দেখতে পারবে।’
‘কাঁদবে বোধ হয়।’
‘তা কাঁদবে।’
‘কাঁদুক।’ জীবন হাসে ‘কাঁদা খারাপ নয়। তাতে অভ্যেস ভালো হয়। জেদ–টেদ কমে স্বাভাবিকতা আসে।’
অপর্ণা উত্তর দিল না।
.
জীবনের খয়েরি রঙের ছোট সুন্দর গাড়িটা সামনে দাঁড় করানো। ড্রাইভার গাড়ির দরজায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। জীবনের এক পা পিছনে অপর্ণা–ছাইরঙা সিল্কের শাড়ি, ছাইরঙা ব্লাউজ, হাতে বটুয়া, মাথায় এলো খোঁপা, পায়ে শান্তিনিকেতনি চটি–বড় সুন্দর দেখায়। অপর্ণাকে। পাশাপাশি যেতে কেমন অস্বস্তি হয় জীবনের। সে নিজে পরেছে সাদা টেরিলিনের শার্ট আর জিন-এর প্যান্ট–নিঃসন্দেহে তাকে দেখাচ্ছে ক্রিকেট খেলোয়াড়ের মতো, তবু অপর্ণার পাশে কী কারণে যেন কিছুতেই তাকে মানায় না। ড্রাইভারকে ইঙ্গিতে সরে যেতে বলে জীবন একবার পিছু ফিরে চাইল। ব্যালকনিতে আতরের কোলে মধু–সে ভীষণ কাঁদছে, চোখের জলে মুখ ভাসছে তার। রেলিঙের ওপর ঝুঁকে চেয়ে আছে মিঠু–বিষণ্ণ মুখ–জীবনের চোখে চোখ পড়তেই হাসল, হাত তুলে বলল ‘টা–টা বাবা! দুর্গা দুর্গা বাবা!’ অপর্ণা খুব তাড়াতাড়ি ব্যালকনির দিকে চেয়েই চোখ সরিয়ে গাড়িয়ে ঢুকে গেল। জীবন হাসিমুখে হাত তুলে ব্যালকনিতে মিঠু আর মধুর উদ্দেশ্যে বলল ‘শিগগিরই আসছি ছোট মা! টা–টা, দুর্গা দুর্গা বড় মা।’
‘টা–টা, দুর্গা দুর্গা বাবা। টা–টা দুর্গা দুর্গা।’
‘টা–টা। দুর্গা–দুর্গা।’
.
জীবন গাড়ি এনে দাঁড় করাল মোড়ের পেট্রোল পাম্পে। অপর্ণা নামল না। জীবন নেমে ধরাল একটা সিগারেট। আকাশে শরৎকালের ছেঁড়া মেঘ, রোদ উড়ছে। পেট্রোল পাম্পের একদিকে বিরাট একটা সাইন বোর্ড ‘হ্যাপি মোটরিং!’ সেই দিকে চেয়ে রইল জীবন, হঠাৎ আলগা একটা খুশিতে তার মন গুনগুন করে উঠল ‘হ্যাপি মোটরিং! হ্যাপি হ্যাপি হ্যাপি মোটরিং!’ যে বাচ্চা ছেলেটা মোটরে পেট্রোল ভরল, হাত বাড়িয়ে তাকে একটা টফি দিল অপর্ণা। খুশি হল জীবন। অপর্ণার মুখ এখন পরিষ্কার ও সহজ। হায়! কতকাল অপর্ণার সঙ্গে জীবনের ঝগড়া বা খুনসুটি হয় না। জীবন যা বলে অপর্ণা একটু গম্ভীর মুখে তাই মেনে নেয়। সত্যিই মেনে নেয় কি না জীবন তা জানে না অন্তত বিয়ের আগে অপর্ণা যে বাড়ির মেয়ে ছিল সে বাড়ির লোকেরা সহজে অন্য কারও কথা মেনে নিতও না, বশও মানত না। অপর্ণাই মানছে কি! ঠিক জানে না জীবন। আসলে সারাদিনে তাকে অপর্ণার বা অপর্ণাকে তার কতটুকু দরকার পড়ে!
