শ্যামাচরণের স্ত্রী গৌরীকে খুব ভালো চোখে দ্যাখে না। দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে গৌরী বাপের ঘাড়ে ভর করেছে। দেখে শ্যামাচরণের স্ত্রী ক্ষমা বড় মনমরা হয়ে গেল। সেই থেকে সংসারে শান্তি নেই। সৎমাকে ভয় খাওয়ার মেয়ে তো আর গৌরী নয়। সে পাঁচ কথা শোনাতে জানে। ক্ষমারও গলায় তেজ আছে।
তাই শ্যামাচরণ শোক ভুলে এখন বাড়ির বাইরেই থাকে বেশি। বাড়িতে যেটুকু সময় থাকে। নাতি-নাতনি নিয়ে কেটে যায়। আর জীবনের বড় সময়টা কাটে কী যেন একটা খুঁজে।
আজকাল অশান্তির ভার তার পরিপূর্ণ হয়েছে। গৌরীর বয়স বেশি নয়। পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বড়জোর। চেহারাটা এখনও ঢলঢলে। এক নজরে তেইশ-চব্বিশের বেশি মনে হয় না। একে বয়সটা খুব নিরাপদ নয়, তার ওপরে সৎমায়ের সঙ্গে ঝগড়া। দুইয়ে মিলিয়ে মেয়েটা মধ্যে একটা খারাপ রোগ চেপেছে। রাজ্যের ছেলে-ছোকরাকে টলায়। তাদের মধ্যে একজন আছে কাদাপাড়ার ভূষির পাইকার বিনয় হালদারের মেজছেলে। ডান হাতে ঘড়ি বেঁধে মোটরবাইক হাঁকিয়ে যখন-তখন আসে, গৌরীর সঙ্গে হিহি হোহো আড্ডা মারে, ক্যারিয়ারে চাপিয়ে নিয়ে যায় এধার-ওধার। গঞ্জে ঢিঢ়ি।
শ্যামাচরণ আজকাল নিজের সঙ্গেই কথা বলে বেশি, যখন কথা বলার আর লোক পায় না। বুড়ো মানুষের কথা শোনবার জন্য কে-ই বা কাজ-কারবার ফেলে বসে থাকবে?
গঞ্জের ঘাটটা সেদিক দিয়ে বড় ভালো। নদীতে স্রোত আছে, জীবনটাও এখানে বেশ বয়ে যায়। কিছু গড়ায় না, থেমে থাকে না।
গোবিন্দনগর থেকে বেগুনের চাষি মফিজুল মাল গস্ত করতে এসেছে। চা খেতে-খেতে বলল —এবার একদম জল হল না। পোকায়-পোকায় সাড়ে সর্বনাশ।
সাড়ে সর্বনাশ কথাটা মফিজুলের নিজের। সর্বনাশের ওপর আরও কিছু বোঝায়।
সে জলের জন্য নয়। তুমিও যেমন, বাসন্তীর মাস্টারমশাই হরিপদ বলে—এ হল কেমিক্যাল সারের গুণ। যত সার তত পোকার উৎপাত। আবার পোকা মারতে ওষুধ কেননা। এসব হচ্ছে বড় ব্যাবসাদারের কৌশল বুঝলে! সার দিয়ে পোকা জন্মাচ্ছে, আর সেই পোকা মারতে বিষও কেনা করাচ্ছে। দুমুখো লাভ!
মফিজুল শ্যামাচরণের দিকে চেয়ে আছে—হাকিম সাহেব, কী বলেন?
শ্যামাচরণ কী আর বলবে? জগৎ-সংসারের খবর এখন আর সে তেমন রাখে না। যে যা বলে তাই হক কথা বলে মনে হয়। এমনকী আজকাল ভূতের গল্প শুনে ‘হু’ দেয়, মনটা ওই একরকম ধারা হয়ে গেছে। সেই লাশটার মুখে আঁচিল ছিল না—একথাটা আজকাল বড় মনে পড়ে।
শ্যামাচরণ বসে চাষি সঙ্গীদের কথা শোনে, দু-চারটে কথা নিজেও বলে। বাদবাকি সময় খবরের কাগজ দেখে। তার বড় মনে হয়, কাগজে কি একটা খবর যেন বেরোবার কথা। মনে মনে সে কতকাল ধরে সেই খবরটার জন্য অপেক্ষা করছে। খবরটা বেরোচ্ছে না।
গন্ধবণিকের দোকান থেকে ভরদুপুরে ফিরছিল শ্যামাচরণ। চৌপথীতে কদমতলায় একপাল কেষ্ট দাঁড়িয়ে ফষ্টিনষ্টি করছে। তারা শ্যামাচরণকে দেখে গলা খাঁকারি দেয়। একটা বদমাশ ছেলে আওয়াজ দিল—গঙ্গারামকে পাত্র পেলে?
বিনয় হালদারের ছেলের নাম গঙ্গাপ্রসাদ। শ্যামাচরণ মাথাটা নামিয়ে জায়গাটা পার হয়ে যায়।
বাজারের মুখে বুড়ো নীলমণি দাসের সঙ্গে দেখা। নীলমণি লোকটা খুব আদর্শবাদী, স্বদেশি করত, একবার এমএলএ-ও হয়েছিল, শ্যামাচরণ হাকিম থাকবার সময় থেকে ভাব।
নীলমণি দাঁড়িয়ে পড়ে বলল—শ্যামা যে! কোন দিকে?
–বাড়িই যাই।
—সে যাবে। বাড়ি পালাবে না, কথা আছে।
শ্যামাচরণ কথা শুনতে উৎসাহ পায় না আজকাল। ভালো কথা তো কেউ বলে না। তাই নিরাসক্ত গলায় বলে কীসের কথা?
নীলমণি গলা নামিয়ে বলে—আজও ওদের দেখলাম। ভটভটিয়ায় জোড়া বেঁধে কুঠিঘাটের দিকে যাচ্ছে। এই একটু আগে। ওদের যে কারও পরোয়া নেই দেখায়।
ওরা বলতে কারা তা শ্যামাচরণ জানে। তাই উদাসভাবে নীল আকাশের দিকে চেয়ে বলে— তা তো দেখছই। আমার আর কী করার আছে বললা? চাও তো বলো, গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ি একদিন।
—আরে রাম রাম। তুমি ঝুলবে কেন? কিন্তু বিহিতের কথা ভাবছ কিছু?
—আমার মাথায় আজকাল কিছু আসে না।
—আমি বিয়ের কথাও ভেবে দেখেছি বুঝলে? কিন্তু তোমার মেয়ে তো বয়সেও ছোঁড়াটার চেয়ে বড়। তা ছাড়া হালদারমশাই তো খেপে আগুন হয়ে আছেই।
শ্যামাচরণ শ্বাস ফেলে বলে—সবই অদৃষ্ট। অকালে জামাইটা যে কেন—
বলেই শ্যামাচরণ ফের চমকে ওঠে। মনে পড়ে, লাশের মুখে সেই আঁচিলটা ছিল না। কথাটা আজও বলা হয়নি গৌরীকে। না বলাটা ঠিক হচ্ছে না।
কবে মরেটরে যাবে শ্যামাচরণ, একটা সত্য কথা তার সঙ্গেই হাপিস হয়ে যাবে তাহলে। বাড়িমুখো হাঁটতে থাকে। বগলে ভাঁজ-করা খবরের কাগজটা, বেশ কি একটা বলি-বলি করে। কিন্তু কোনওদিনই বলে না, দুপুরে খাওয়ার পর আজ আবার খবরের কাগজটা তন্নতন্ন করে খুঁজবে শ্যামাচরণ। খবরটা থাকার কথা।
বাড়ি ফিরে স্নান খাওয়া সারতে বেলা চলে গেল। মেয়েটা এখন বাড়ি ফেরেনি। নাতি-নাতনি দুটো স্কুল থেকে আসবে এখন। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করে শ্যামাচরণ। বউ ক্ষমা এঁটোকাঁটা সেরে এসে বিছানার একপাশে বসে বলে—আর তো মুখ দেখানো যাচ্ছে না।
ক্ষমার বয়স হয়েছে, সাধ-আহ্লাদ বড় একটা করেনি জীবনে। সংসারে জান বেটে দিচ্ছে বিয়ের পর থেকে। আজকাল শ্যামাচরণের বড় মায়া হয়।
ঘড়ি দেখে শ্যামাচরণ উঠে বসে বলে—হরিদ্বারে যাবে?
