—আরে কুশলদা, কেমন আছ? তোমাকে খুব অন্যরকম দেখাচ্ছে।
না-না। দাড়ি কামিয়েছি তো, তাই।
—তার চেয়ে কিছু বেশি। বলে টুপু হাসে—তোমার উন্নতি হচ্ছে বোধহয়। চেহারায় ছাপ পড়েছে।
কুশল বলে—তোমার চেহারা একটু খারাপ দেখছি টুপু। কী হয়েছে?
–কী হবে? বড্ড ডায়েটিং করতে হয়। খাটুনিও তো খুব!
—আজকাল তোমার ছবি বড় একটা দেখি না তো।
–হচ্ছে। অনেক হচ্ছে। এই বলে টুপু খুব অস্থিরতা আর চঞ্চলতার সঙ্গে একটা সিগারেট ধরায়।
ভীষণ অবাক হয় কুশল। চেয়ে থাকে।
—কিছু মনে কোরো না কুশলদা। নার্ভের জন্য খাই। আমার নার্ভ বচ্চ সেনসিটিভ, ধোঁয়ায় একটু শান্ত থাকে।
—বেশি খেও না। দমের ক্ষতি হয়। খুব ভালো আর শান্ত গলায় কুশল বলে।
—বেশি না। মাঝে-মাঝে খাই, নেশা-টেশা নেই।
আসলে নেশাই। কুশল সেটা টের পায়।
টুপুর মা দেখা হতে অনেকক্ষণ অন্য কথা বলে তারপর বলেন—বাবা, পেটের মেয়ে, পণ্ডিত বংশের সন্তান, বলতে নেই টুপু আজকাল মদও খায়। ভীষণ মাতলামি করে। কাউকে বোলো না।
অনেকক্ষণ ভেবেচিন্তে কুশল বলে—পিসি, খায় তো খাক। তুমি বেশি ঝগড়া-টগড়া কোরো এ নিয়ে। ওর কাজের স্ট্রেন তো হয়, তাই খায়। ওকে রেস্টোরেটিভ বলে, মদ-খাওয়ায়।
—তুমি বাবা, সব কিছুর ভালো দ্যাখো। আমি দেখি না। ছেলেটাও সিনেমার লাইনে ঢুকবে ঢুকবে করছে। বারণ করি, শোনে না।
কুশল আবার ভেবে বলে—টুপুর বুঝি আর তেমন চাহিদা হচ্ছে না পিসি? আজকাল ওকে নিয়ে ছবি হয় না তো।
—হয় না তো কী করবে! জীবনে ওঠা-পড়া আছেই। আমি বলি, এবার ভালো আর সৎ দেখে পাত্র খুঁজে বিয়ে করে ফেলুক। সিনেমার নটী সাজা ঢের হল। ওদের বামুন-পণ্ডিতের বংশের রক্তে কি ওসব সয়!
ভাবতে-ভাবতে কুশল চলে আসে।
স্কুলে থাকতে কবিতা পড়েছিল, সন্ন্যাসী উপগুপ্তর সঙ্গে বাসবদত্তার প্রেম হয়েছিল বুঝি! তো টুপুর সঙ্গে একদিন কি তার সেরকমই হবে?
হতেও পারে।
তিন বছরের মাথায় কুশল দেখল, তার অনেক টাকা। শুধু হয়েছে নয় আসছেও।
ঢালাইয়ের কারখানার জায়গা বদল হয়েছে। ছোট্ট কিন্তু বেশ ভালো একটা ফাউন্ড্রি খুলে। ফেলেছে দুই ভাই। দেশের বাড়ি মস্তবড় করে করেছে। পুকুর কাটা হয়েছে। চাষের জমিও কিনেছে অনেক। দাদা সেসব দেখাশোনা করছে। কাজের সুবিধের জন্য একটা গাড়ি কিনে ফেলেছে কুশল।
সেই গাড়িতে একদিন গেল টুপুর বাড়ি।
টুপু সব দেখে বলল—কুশলদা, তুমি সত্যিই উন্নতি করেছ।
—আরে না, না। কোম্পানির গাড়ি।
—ওই হল। কোম্পানি তো তোমারই।
কুশল লজ্জা পায়। বড়লোকি দেখাতে সে তো আসে না। সে আসে টুপুকে একটা কথা বলবে। বলে।
আজও বলা হয়নি।
.
তিন
টুপু একজন প্রডিউসারকে বিয়ে করল, কুশল খবর পায় এক পত্রিকায়।
গিয়ে দেখে মা খুব খুশি নয়।
বললেন—দোজবরে বাবা, আগের বউকে বিদেয় করেছে। তা টুপুকেই কি রাখবে। বড় ভয় করে। বড়লোকি বিয়ে আমার একদম পছন্দ নয়। বিয়ে ওরা করে না। আসল বিয়ে হয় মধ্যবিত্ত পরিবারে।
পিসি বলেছিল অদ্ভুত।
ওরা হানিমুন করতে জাপান না কোথায় গিয়েছিল। ঠিক তিন মাস বাদে ফিরে এসেই টুপু তার বরকে ডিভোর্স করে।
খবর পেয়ে ছুটে গেল কুশল।
–কী হল টুপু? বিয়ে ভেঙে দিলে?
—দিলাম। ওর হৃদয় নেই।
—আগে জানতে না?
–জানতাম। তবু ঢুকে দেখলাম আছে কি না।
—ঢুকতে গেলে কেন টুপু? শরীরটা খামোখা এঁটো করলে।
মুখ ফসকা কথা। কুশল জিভ কাটল।
কিন্তু টুপু রাগ করল না। খুব অন্যমনস্ক হয়ে বলল—ঠিক বলেছ। এঁটো হয়ে এলাম। তবে অনেক টাকা পেয়েছি।
কুশল বলল—ভালো। টাকাগুলো রেখো। অসময়ে টাকা মানুষকে খুব দেখে। টুপু এই প্রথম কাঁদল কুশলের সামনে।
বলল টাকা আর নাম আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে কুশলদা। তুমি তো উন্নতি করেছ, আমি যদি কখনও রাস্তার ভিখিরি হয়ে যাই তো কিছু ভিক্ষে দিও।
–ছিঃ টুপু, ওকথা বোলো না। টাকা রেখো। আর দরকার হলে নিও আমার কাছ থেকে। লজ্জা কোরো না।
–বড় লজ্জা কুশলদা। বড় লজ্জা।
আলোর পৃথিবী এগিয়ে আসছে।
কুশল বুঝতে পারে, সে নিজে সৌভাগ্যের আলোর চৌকাঠে পা রেখেছে, কিন্তু টুপুর সঙ্গে সেখানে দেখা হওয়ার নয়। কারণ টুপু আলোর জগৎ থেকে নির্বাসিত হয়ে চলে আসছে দুর্ভাগ্যের অন্ধকার জগতে, সে-ও সেই যাত্রাপথে অন্ধকারের চৌকাঠে পা রেখেছে, ঠিক এই সীমানায় তাদের প্রথম পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকা।
আজও বলতে পারল না কুশল। কিন্তু মন বলল—তোমার সঙ্গে আমার যে একটা খুব গোপন কথা আছে টুপু।
আজকাল কুশলের সময় বড় কম। কলকাতার ব্রাবোর্ন রোডে তার নতুন শোরুম আর সেলস অফিস চালু হল। তার ওপর আবার জাপানি একটা কোম্পানির সঙ্গে কোলাবরেশনে চাষের যন্ত্র লাঙল তৈরি করবে বলে সে গেল জাপান। ওই পথে দূর-প্রাচ্যের সব দেশ দেখে এল। কারখানা খোলার জায়গা পেল কলকাতার কাছেই। বড্ড পরিশ্রম গেল ক’দিন। বয়সও তো প্রায় সাঁইত্রিশ আটত্রিশ হয়ে গেল। এখন শরীর না হোক মনটা বড় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মা বিয়ের তাগাদা দেয়। কুশল রাজি হয় না। ছোট বোনের বিয়ে দিল বড়লোকের বাড়িতে। সেই বিয়েটা আসলে একটা
অলিখিত চুক্তি। আত্মীয়তার সূত্রে যাদের পেল তারা সমাজের ওপরতলার ভালো সব। যোগাযোগের মধ্যমণি। এইসব বুদ্ধি এখন মাথায় খুব খেলে কুশলের।
কিন্তু তবু ক্লান্তি তো ছাড়ে না। যোধপুরের প্রকাণ্ড বাড়িতে ফিরে যখন কখনও অবসর কাটায় তখন বড় একা আর ক্লান্ত লাগে। মেয়েলি স্পর্শ জীবনে বড় দরকার। মেয়েরা হল পুরুষের বিশ্রাম, একটু সৌন্দর্য, আশ্রয়।
