–সে তো বটেই। একা থাকার যুগ পড়ে গেল। ছোট সংসার সুপ সাপ ঘরদোর, ছোট হাঁড়ি, ছোট পাতিল। এসবই চল হয়েছে। ইচ্ছেও করে খুব।
বুড়োটা হড়হড়ে পদার্থটা তরল করে গোটাদুই রুটি গুড় আর জল দিয়ে মাখছে। দাঁত নেই, তবু জলে গুলে খাবে। খাওয়াটা এই বয়েসেই বাড়ে হরেনের বাবারও বেড়েছে। দিনরাত খাওয়ার গল্প। হরেনের বউ করে খুব বুড়োর জন্য। আলাদা হয়ে উঠে গেলে কষ্ট হবে উভয়তই। বাবাকে কি নিজের কাছে নিয়ে যাবে হরেন? ভেবে আপন মনেই মাথা নাড়ে। নেওয়াটা ঠিক হবে না। কেন ঠিক হবে না তা অবশ্য ভেবে পায় না সে। নিজের ঘরবাড়ি, তার মায়া বড়-বড় সাংঘাতিক। বুড়ো মানুষ ঘরে হাগবে মুতবে। তা ছাড়া, হরেনের বউ–ই একটা জীবন করে গেল হরেনের বাপের জন্য। এবার অন্য ভাইয়ের বউরাও করুক। এসব ভেবেই হরেন আপনমনে। মাথা নাড়ে।
নেত্য বা নিত্যগোপাল রসিদখানা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে কথা তখনই পাকা হয় যখন জায়গাটা হয়ে গেল। ভাববেন না চৌধুরীমশাই, টাকা যখন আগাম বায়না নিয়েছি ভাবনা এবার আমার।
হরেন ওঠে। উঠতে-উঠতে বলে–পরের ভাবনা তো ভাবলেনই। আমি ভাবছি আপনার কথা। কত জমি আপনার তাঁবে। লাখোপতি থেকে আমার মতো অভাজন ধর্না দেয়। সকলেরই জোতজমি করে দেন আপনি! অথচ নিজের বেলায়–
নেত্য বা নিত্যগোপাল ভ্রূ কোঁচকায়। অমায়িক মুখে বলে–আমিও ভাবি। ভেবে–ভেবে কেটে যাক জীবনটা। আলাদা বাড়ি, আলাদা সংসার তার স্বাদই আলাদা। বউও বলে, খুব বলে। জলে জলে হাত-পা হেজে মজে যায়, জায়েদের ছেলেপুলে টেনে কাঁখে ব্যথা, প্রলয় উনুনের ওপর বিশাল কুম্ভীপাকে রান্না করে-করে মাথাধরার ব্যামো, অম্বল। সবই বুঝি মশাই। কিন্তু মাথার মধ্যে এমন এক দাঁও মারার মতলব বাসা বেঁধেছে যে কী বলব।
আরও দু-চারটে কথা বলে হরেন চৌধুরী বেরোয়।
.
রকে এসে আবার মুড়িসুড়ি দিয়ে বসেছে। বুড়ো। হাতে বিড়ি। তাকে দেখে মুখ তুলে জিগ্যেস করে ক’টা বাজে বাপ?
হরেন হাসে। ঘড়ি ঘড়ি টাইম জানা চাই, যেন কত অফিস বা সিনেমার বেলা বয়ে যাচ্ছে। ঠাট্টা করে বলে–টাইম জেনে কী হবে খুড়োমশাই? ইষ্টচিন্তা করুন।
–সময় কি ফুরিয়েছে বাপ?
হরেন হাসিটা গিলে বলে–বেলা তো ফুরিয়েই এল খুড়োমশাই।
–বেলা ফুরিয়েছে? বলে খুড়ো একটু থমকে চেয়ে থাকে। মুখখানা তুবড়ে অদ্ভুত দেখতে হয়। ঠোঁট দুটো ফোকলা হাঁয়ের মধ্যে কচ্ছপের মুখের মতো ঢুকে বেরিয়ে আসে। বুড়ো বলে–এটা কি বিকেল?
–তাই বটে।
–তবে যে মেজবউমা বড় চিড়ের জাউ খাওয়ালে? অ্যাঁ! জাউ তো আমি সকালে খাই। বৈকেলে আজ হালুয়া খাব বলেছিলাম যে? অ্যাঁ!
হরেনের একটু কষ্ট হয় বুকের মাঝখানটায়। বলে–খাবেন, তাই কি? খাওয়া কি একদিনের?
–চিত্ত সুজি এনে রেখেছিল, আমি নিজের চোখে দেখেছি। সে তাহলে ওই গর্ভস্রাবগুলোকে খাইয়েছে। বাপ ঝুল্লুস হয়ে বসে আছি, এখন কে আর দেখে আমাকে! চিড়ের জাউ আমার বেহান বেলায় খাওয়ার কথা–নেত্যর বউ কিছু খেয়াল রাখে না বাপ। সাত-সাতটা বউ ইয়ের কাপড় মাথায় তুলে দিনরাত্তির ছেলেগুলোকে গেলাচ্ছে। বিড়িটা ধরিয়ে দাও তো বাপ, হাত বড় কাঁপে–
হরেন চৌধুরী গয়েশের বিড়িটা ধরিয়ে দেয় যত্ন করে। একটু হেসে বলে–হিসেব সব মেলে খুড়োমশাই?
–হিসেব! কোন হিসেবের কথা বলছ?
এই যে আপনি গয়েশ সামন্ত, আপনার সাতটা ছেলে, সাত বউ, কত নাতি–নাতনি, তারপর এটা বেহান বেলা না সাঁজবেলা–এসব হিসেব?
বুড়ো বিড়িটা টেনে কাশতে কাশতে গয়ের তোলে গলায়। হাঁপানির টান। বিড়ি খাওয়া বারণ নিশ্চয়ই, লুকিয়ে চুরিয়ে খায়। খাওয়াটা আসল।
–মেলে না বাপ ভুল পড়ে যায়। এই একটু আগে একজন কার খোঁজ করছিল।
–আমিই।
–হবে। বলে বিড়বিড় করে বলতে থাকে। হরেন কান পেতে শোনে। বুড়ো হিসেব মেলাচ্ছে –আমি হলুম গে গয়েশ সামন্ত…সামন্ত বাড়ি…বড় ছেলে চিত্ত, মেজো নিত্য, আরও কতকগুলো…
হরেন ঘড়িটা দেখে নিয়ে হাঁটা দেয়। রেললাইন বরাবর হেঁটে প্ল্যাটফর্মে ওঠে। পাঁচটা পাঁচে ট্রেন। সিগন্যাল দেয়নি এখনও। প্ল্যাটফর্মে কালো-কালো কিছু মেয়ে-পুরুষ আর বাচ্চা সংসার পেতে আছে। পোঁটলা, পুঁটলি, ইটের উনুন, কৌটোর মগ ছত্রাকার। উকুন বাছছে, ছেলে ঠেঙাচ্ছে, ঘুমোচ্ছে। বিশ-ত্রিশখানা রুটি রোদে শুকোতে দিয়ে একটা মেয়ে বসে কাক তাড়াচ্ছে। কেন যে রুটি শুকোয় এরা কে জানে! একটা বাচ্চা হামা দিয়ে এসে হরেনের জুতো ধরে ফেলেছে। হরেন ঠ্যাং টেনে নেয়। সংসারটার দিকে একটু চেয়ে থাকে। ভারী নিশ্চিন্ত হাবভাব, দুনিয়াজোড়া জমি ওদের। যেখানে সেখানে বসে যায়।
শীতের বেলা। রোদ মরে গিয়ে এ সময়টা বাতাসটা ভারী হয়ে ওঠে। মাটির ভাপ না ধোঁয়া মেঘের মতো মাটির ওপর। ওর ভারী বাতাস। দুঃখের শ্বাসের মতো জমে আছে পৃথিবীর ওপর।
সামন্তমশাই পাকা লোক। জমি একটা পেয়েই যাবে সুবিধে মতো। বর্ষার আগেই ভিত গেঁথে ফেলবে। ভারী একটা আনন্দ হয় হরেনের।
আবার কী জানি কেন রোদমরা বিকেলটার দিকে চেয়ে বুকটা হঠাৎ ঝাঁৎ করে ওঠে। কী একটা যেন মনে হয়, একটু ভয়-ভয় করে। বুকটায় বগড়ি পাখির মতো কী একটা গুরগুর করে ডাকে। পেটটা পাকিয়ে ওঠে।
ভিখিরিদের সংসার, প্ল্যাটফর্মের কৃষ্ণচূড়া গাছ, দূরের সিগন্যাল–এ সবের ওপর দিয়ে আকাশ আর জমির মাঝবরাবর একটা অদ্ভুত আলো-আঁধারি ঘনিয়ে আসছে। ট্রেন রেল-পুল পেরিয়ে আসছে। হরেন চৌধুরী গাড়ির শব্দটা ঠিক শুনতে পায় না। সেই আলো-আঁধারিটার দিকে অন্য মনে চেয়ে থাকে।
সংবাদ : ১৯৭৬
বিশ্ব সেবার কুলু মানালিতে বেড়াচ্ছে যাচ্ছে। দুর্গাপুরে ভালো চাকরি করে, যা মাইনে পায় তার সবটুকুই নিজের পিছনে খরচ করতে পারে। সবসময়ে ঝকঝকে তার জামা কাপড়। নিত্য নতুন।
