এই-বাড়ি? বলে মাথা নাড়ে বুড়োটা–কিছু ঠাহর পাই না। এই মনে পড়ে। ভুলে যাই। ঝুম্বুস হয়ে বসে গেছি বাপ, কে আর দেখে আমাকে! জারটাও বাড়ল খুব এবার।
হরেন হাসে-জার কোথা খুড়োমশাই? দিব্যি বসন্তের হাওয়া দিচ্ছে।
–তোমার তো দিবেই। যার মাথায় হাত তার জার। শরীরে সেই কোন সকালে শীত ঢুকে বসে আছে। তাড়াই কত। যায় না।
–তো নেত্য সামন্তর খোঁজ পাই কী করে? বাড়িতে কে আছে?
–আছে অনেক। জ্ঞাতিগুষ্টি কি কম? তিষ্ঠোতে পারি না বাপ, বড্ড জ্বালায় ছেলেগুলো। নিত্যগোপালের ছেলে, আমার নাতি
হরেন ঝুঁকে সাগ্রহে বললেন–কী নাম বললেন? আপনার ছেলে নিত্যগোপাল?
বুড়ো হতচকিত চোখে চায়–তবে কার ছেলে? ভুল বললুম না কি?
–তাহলে তো এইটেই নিত্যগোপালের বাড়ি।
–এইটাই।
–চেনেন না বললেন যে?
–চিনি। আমার ছেলে। ভুল হয়ে যায় বাপ। আমি হচ্ছি গয়েশ সামন্ত। বলে বুড়ো মাড়ি আর মুখের ফোকর দেখিয়ে হাসে-এইবার মনে পড়েছে। সব হিসেব ঠিকঠাক। সামন্ত বাড়ি, নেত্য।
–নেত্যকে আমার দরকার।
–যাও না ভেতরে। এটা কি সকাল বাপ? ক’টা বাজল?
–বিকেল চারটে। এ সময়ে থাকার কথা।
–আছে বোধহয়। এখানেই থাকে। গয়েশ সামন্তর ছেলে হল নেত্যগোপাল, নেত্যগোপাল।
–ছেলেপুলে তো কাউকে দেখছি না। কাকে দিয়ে ডাকাই! অচেনা লোক হুট করে ঢুকে পড়াটা কি ঠিক হবে?
–ছেলেপুলে? নেত্যর? তারা সব গর্ভস্রাব।
গালাগালটা হরেনের শোনা। বাবা দেয়।
বলল –ছেলেগুলো জ্বালায় নাকি?
–কিছু রাখে না। এক পুরিয়া চিনি লুকিয়েছি তোষকের তলায়। লোপাট। কিছু রাখে না। বড় এলাচ খেলে বুক ভালো থাকে, চিত্ত এনে দিয়েছিল এক মুঠো। কড়মড় করে চিবিয়ে খেল। বউমারা সব যে পেটে এগুলো কী ধরেছিল, ছিঃছিঃ!
হরেন চৌধুরী দরজায় উঠে ‘নেত্যবাবু’ বলে ডাকতে লাগে।
–ভেতরে শোনা যায় না। বুড়োটা বলে।
–কেন?
–সব অনেক ভেতরে থাকে। ছেলেগুলো সর্বক্ষণ খাচ্ছে, চেঁচাচ্ছে, কিচ্ছু শোনা যায় না, ঢুকে যাও।
–মেয়েছেলে রয়েছেন, যদি কেউ কিছু মনে করেন! উটকো লোক।
–পরদানশিন তো নয়। যখন গাল পাড়ে তখন তো ইয়ের কাপড় মাথায় উঠে যায়। মেয়েছেলে? যাও। সর্বক্ষণ লোক আসছে, এ-বাড়ি হচ্ছে হাট।
তা হরেন চৌধুরী কিছুক্ষণ দোনোমোনো করে ঢুকেই পড়ে। রক পেরিয়ে দরজা। ভিতরে একটা বাঁধানো জায়গা, বারান্দামতো। তারপর মস্ত উঠোন। বাড়িটার কোনও প্ল্যান ছিল না। নাকি? যেখান–সেখান দিয়ে ঘর বারান্দা সব গজিয়েছে। দেওয়ালে প্লাস্টারের বালাই নেই, ইট বেরিয়ে আছে। এক পাশে ভারা বাঁধা, রাজমিস্ত্রির কাজ চলছে বোধহয়। কাণ্ডটা প্রকাণ্ডই। উঠোনের চার ধারেই ঘর, ঘরের ওপর ঘর উঠেছে কোথাও। একটাই বাড়ির খানিকটা একতলা, খানিকটা দোতলা, তেতলাও আছে। উঠোনের মাঝখানে কুয়ো, কুয়োর পাশেই আবার টিউওয়েল। বিস্তর বাচ্চাকাচ্চা, আর কয়েকটা মেয়েছেলে দেখা যায়। কুয়োপাড়ে বাসনের ডাঁই মাজতে বসেছে কুঁজো চেহারার কালো এক মেয়েছেলে। মাজতে–মাজতে বকবক করছে। তার কাঁকালের ফাঁক দিয়ে বাঁদরের বাচ্চার মতো একটা বছর দেড়েকের মেয়ে ঝুলে আছে, তার মাথাটা বুকের মধ্যে সেঁদানো। মেয়েমানুষেরা পারেও! ভেবে একটু শিউরে ওঠে হরেন।
হেঁকেই জিগ্যেস করে–নেত্যগোপালবাবুর বাড়ি তো এটা?
কেউ তাকালও না। উঠোন জুড়ে চিল চেঁচানি। খাপড়া ছুঁড়ে গুটি সাতেক ছেলেমেয়ে গঙ্গাযমুনা খেলছে। তাদের মধ্যে একজন এক ঠ্যাঙে লাফিয়ে তিন ঘর পেরিয়ে গেল, সবাই চেঁচাচ্ছে তাই!
এই হচ্ছে জয়েন্ট ফ্যামিলির ছবি। হরেনের চোখ দুটো করকর করে উঠল। দুঃখে। এক সময়ে সে এরকম একটা পরিবারে মানুষ হয়েছিল। সে সব ইতিহাস। আজ সামন্তমশাইয়ের কাছে এসেছে ছোট্ট একটা প্লট বা বাড়ির সন্ধানে। লোকটার হাতে বিস্তর জমির খোঁজ। কলকাতায় আর জমি নেই। যাও বা ছিল ঢাকুরে, যাদবপুর, বেহালা বা গড়িয়ায়–তাও টপাটপ ফুরিয়ে এল বলে। এরপর কলকাতার জমি বিক্রি হবে ঝুড়িতে। মানুষ তাই কিনে ঘরে সাজিয়ে রাখবে। দেখবার মতো জিনিস হবে একটা। তা সেই দুর্লভ জমি ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই হরেন এক মুঠো চায়, ছোট্ট প্লট হলেই তার চলে যাবে। সংসার বড় নয়। বউ আর দুটো ছেলে, দুটো। মেয়ে। কাঠাখানিক কি দেড়েক হলেই তিনতলা তুলবে। সুবিধেমতো জায়গায় হলে একতলাটা হবে দোকানঘর, দোতলায় ভাড়াটে, তিনতলায় তাদের ছোট সংসার।
ছোট পরিবারই সুখী পরিবার বলে বটে, কিন্তু হরেনের মনে ধন্দটা যায়নি। সামন্তমশাইয়ের বাড়ির দৃশ্যটা দেখে কি জানি কেন হরেনের বুকটায় মেঘ জমে ওঠে। এইরকম একটা হাটখোলায় সে মানুষ হয়েছিল। সুখে নয়, আবার তেমন সুখ আর পাবেও না।
দীর্ঘশ্বাস চেপে সে দু-কদম এগোল। বারান্দার নীচে নর্দমা, তাতে একটা নীল বল পড়ে আছে। উঠোনে ফাটা বেলুনের রবার ন্যাতার মতো, একটা ছাগল ঘাস থেকে মুখ তুলে হরেনের চোখে চোখ রাখে। কোনও বিধবার রোদে–দেওয়া কাপড় অশুচি করেছে হতচ্ছাড়া কাক, বুড়ি দোতলার রেলিং ধরে ঝুঁকে চেঁচাচ্ছে বলি নেন্ডি, কাকে ছোঁয়া কাপড় মা, রাঁড়ি বলে তো আর মানুষের বাইরে যাইনি, তখন থেকে বলছি, বোনা হয় গঙ্গাজলের ছিটে দে…
হরেন নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে।
বোঝা যায় যে, এ-বাড়িতে লোকের যাতায়াত বিস্তর। সে যে ঢুকে এসে দাঁড়িয়ে আছে কেউ গ্রাহ্যই করে না। যেন বা বাড়ির লোক। জয়েন্ট ফ্যামিলিতে বাড়ির লোক আর বাইরের লোক চেনা ভারী মুশকিল। কেউ অচেনা এসে দাঁড়ালে ছোটবউ ভাবে বড় বউর কাছে এসেছে, বাপ ভাবে ছেলের কাছে এসেছ, ভাই ভাবে দাদার কাছে এসেছে। কেউ গা করে না।
