–হ্যাঁ, এই পতন অভ্যুদয়ের কথা যদি বলেন।
লুলু উদাস গলায় বলে–জরুরি অবস্থা জারি করাটা খুই খারাপ হয়েছিল, আর তার ফলেই কংগ্রেসের পতন।
–কিন্তু মহান লুলু আপনিই বলেছিলেন আরও সাতাশ বছর আগেই জারি করা উচিত ছিল, কিন্তু তার মানে এ নয় যে, আরও সাতাশ বছর আগে জরুরি অবস্থা জারি করলে আজ আর তার জারি করার প্রয়োজনই থাকত না।
–শ্রদ্ধেয় লুলু, জরুরি অবস্থায় যেসব বাড়াবাড়ি ঘটেছে সে সম্পর্কে আপনার মত কী?
খুবই বাড়াবাড়ি ঘটেছিল। রেল অফিস থেকে নমস্কার জানানোটা তার মধ্যে অন্যতম বাড়াবাড়ি।
–লুলু, আপনার কি মনে হয় না এখন রাষ্ট্রের ক্ষমতা বদলের ফলে নাগরিকদের জীবনে নিরাপত্তা ও অধিকার ফিরে এল? মনে হয় না কি জনগণের ইচ্ছাই এর ফলে জয়ী হয়েছে। এ কী জনগণের এবং গণতন্ত্রের জয় নয়?
–নিশ্চয়ই। তবে একথাও ঠিক যে, এই দেশে বরাবরই, এমনকী জরুরি অবস্থার সময়েও জনগণেরই শাসন বলবৎ ছিল। এই শাসক জনগণ হচ্ছে তারাই যাদের রাজ্য বা কেন্দ্রের কোনও মন্ত্রী, কোনও রাজ্যপাল বা স্বয়ং রাষ্ট্রপতি ভালোবাসেন, কিন্তু চেনেন না। তাঁরা জনগণের অস্তিত্বর কথা জানেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এরা কারা সে সম্পর্কে ভালো ধারণা তাঁদের নেই। এই জনগণেরই একজন এক রিকশাওয়ালা বষ্টির দিনে সাউথ এন্ড পার্কের এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে আমাকে পৌঁছে দেওয়ার সময় পাঁচ টাকা নিয়েছিল। আমি তাকে জরুরি অবস্থার কথা বলতে সে খুব কর্তৃত্বের গলায় বলেছিল–তাতে কী? একইরকমভাবে হাওড়া স্টেশনের এক কুলিও আমার কাছ থেকে পাঁচ টাকা আদায় করে। প্রিয় সাংবাদিক, আপনি মহান পুলিশের কথা ভাবুন, আপনি পবিত্র আদালতের কর্তব্যপরায়ণ কর্মচারীদের কথা ভাবুন, আপনি ছোট এবং বড় ব্যবসায়ীদের কথা ভাবুন, দোকানদারদের মুখশ্রী কি আপনার মনে পড়ে না? আপনি যেকোনও বৃত্তিতে নিযুক্ত মানুষদের কথা ভেবে দেখুন। বেকার ছেলেছোঁকরাদের কথা ভাবুন। এরা সবাই সেই মহান জনগণ। রাষ্ট্রের নামে এঁরাই বরাবর দেশ শাসন করে আসছেন। এদেশে পুলিশ যখন কোনও চোর, ঘুষখোর বা খুনিকে ধরে, তখন আপনার হাসি পায় জানি। কারণ, পুলিশ যাকে ধরে তার সঙ্গে পুলিশের নিজের কোনও পার্থক্য নেই। তবু মনে রাখবেন ওটুকু পুলিশ বেশি জনগণের ন্যায্য শাসন। আদালতে যখন আপনাকে হয়রানি থেকে বাঁচার জন্য গুনোগার দিতে হয় তখন সেটাও জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা জনগণের শাসন বলেই মনে করবেন। দোকানদাররা ভেজাল মাল দিলে, দামে বা ওজনে ঠকালে সেটাও তা জনগণেরই লাভ। পাড়ার ছোঁকরারা পুজো বা পলিটিকসের নাম করে চাঁদা তুলে যখন মাল খায়, তখন সেটা বেকার জনগণের জন্য জনগণের দেয় বেকার ভাতা বলেই ধরা উচিত নয় কি?
আমি উত্তেজিত হলে বলি–মিস্টার লুলু, আপনি প্রসঙ্গান্তরে চলে যাচ্ছেন।
লুলু মাথা নেড়ে বলেনা প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক। আমি বলতে চাইছি, এদেশে জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্র কখনও ক্ষুণ্ণ হয়নি। বরাবরই ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। জনগণ এক বৃহৎ ও মহান শক্তি। এই শক্তি জনগণের মধ্যেই পারস্পরিক ক্রিয়া করে। রামকে। শ্যাম মারে, শ্যাম যদুকে ঠকায়, যদু মধুর কাছ থেকে চাঁদা তোলে এবং মধু রামকে ঘুষ দিয়ে কাজ আদায় করে নেয়। আর এইভাবেই জনগণের বিপুল শক্তি তার ভারসাম্য রক্ষা করছে। আর এভাবেই চলবে। আমার মনে হয়, আমাদের দেশে আর গভর্নমেন্টের কোনও প্রয়োজনই নেই। আমরা স্টেটলেস সোসাইটির কল্পনাকে সার্থক করে তুলেছি।
আমি চোখ কপালে তুলে বলি–বলেন কি মহান লুলু! সরকার না থাকলে যে ভয়ঙ্কর কাণ্ড হবে।
লুলু মাথা নেড়ে বলে–শোনো মুখ, সরকার তুলে দেওয়ার কথা বলি না। নট্ট কোম্পানি বা বহুরূপীর নাটকে দলের মতো বা ইস্টবেঙ্গল–মোহনবাগানের মতো জনজীবনে উত্তেজনাময়। এন্টারটেনমেন্টের জন্য সরকারও থাকবে। একটা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অন্য একটা রাজনৈতিক দলের তরজা বা কবির লড়াই চলবে, ভোটযুদ্ধ হবে, সংসদে আজকের মতোই যাত্রার আসর বসবে। সেখানে জনগণের মঙ্গলের জন্য আইন পাস হবে, অর্থ বরাদ্দ হবে, ধাঁধা প্রশ্নোত্তরের আসর বসবে। কিন্তু সেগুলির সঙ্গে জনগণের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থার কোনও হেরফের হবে না।
আমি ভীষণ উত্তেজিতভাবে বলি–মিস্টার লুলু, আপনি এসব কী বলছেন এ যে সরকারের অসম্মান।
লুলু উঠে দাঁড়ায় এবং জানলার কাছে গিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলে–সাংবাদিক, এসো দ্যাখো এসে বাইরে কী সুন্দর দৃশ্য।
আমি মহান লুলুর আদেশে জানলার কাছে যাই।
মুহূর্তে দুর্দান্ত লুলু আমাকে পাঁজাকোলে তুলে গরাদহীন জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দেয়। আমি বিকট একটা চিৎকার করে চোখ বুজে ফেলি।
কিন্তু পড়লাম না। লুলু আমার একটা হাত ধরে রেখেছে। একমাত্র লুলুর হাতটিই আমার অবলম্বন, পায়ের তলায় পাঁচতলার শূন্যতা। আমি ঊর্ধ্বমুখ হয়ে কাতর স্বরে বলি–হে মহান লুলু, হে দয়ালু লুলু, আমাকে তুলুন।
লুলু আমাকে ধরেই থাকে। ঠিক যেমন দেখেছিলাম ‘টু ক্যাচ এ থিফ’ ছবিতে। ক্যারি গ্র্যান্ট বাড়ির ছাদ থেকে একটা চোর মেয়েকে ঝুলিয়ে রেখে যেভাবে স্বীকারোক্তি আদায় করেছিল, ঠিক সেইভাবেই লুলু বলল –বলো প্রিয় সাংবাদিক, দিল্লির বা রাজ্যের সরকার এখন তোমার জন্য কী করছে! তুমি যদি এখন মরে যাও তাহলে সরকার কতটা ধাক্কা খাবে? কিংবা তুমি মরে গেলে কি না সেই সংবাদ কি প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির কাছে কোনওদিন পৌঁছোবে? তুমি যে আছ তাই তাঁরা জানবেন না।
