অনিয়ম করব তারও উপায় নেই। সুরবালা আমার ওপর রীতিমতো গোয়েন্দাগিরি করে যাচ্ছে। সেদিন ভাত খাওয়ার সময় বাঁ-হাতে জল খেয়েছি, সঙ্গে সঙ্গে নালিশ। বাইরে থেকে হয়তো ওমলেট খেয়ে এসেছি। ঘরে ঢুকতেই সুরবালা ঘোষণা করল, উনি পেঁয়াজ খেয়ে এসেছেন। বুঝুন কান্ড।
হ্যাঁ, তা বটে, একটু-আধটু অসুবিধে তো হতেই পারে। পুরোনো অভ্যেস তো। তা ওঁরা থাকবেন ক-দিন?
আসলে ওঁরা এসেছেন সুরবালার জন্য একটি সচ্চরিত্র পাত্রের খোঁজ পেয়ে। পাত্রটি নাকি সংস্কৃতে এম এ, কোন কলেজের অধ্যাপক, ধুতি-পাঞ্জাবি পরে, ত্রিসন্ধ্যা আহ্নিক করে, শাস্ত্রজ্ঞ এবং সদবংশজাত। বিয়ে প্রায় ঠিক হয়ে গেছে। দু-পক্ষের কথাবার্তাও মোটামুটি পাকা।
বাঃ, তাহলে তো ল্যাঠা চুকেই যাচ্ছে।
না, যাচ্ছে না।
কেন মশাই? সুরবালার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলেই তো ওঁরা ফিরে যাবেন?
হ্যাঁ।
তাহলে?
সুরবালাকে আপনি দেখেননি।
তা তো বটেই।
দেখলেই বুঝতেন সমস্যাটা কোথায়?
দেখতে কদাকার নাকি?
না, বরং উলটো, সুরবালা ভীষণ সুন্দরী, আর…
আর?
তাকে দেখলেই আমার বুকটা ধক করে ওঠে।
এ তো ভালো লক্ষণ নয় মশাই!
না। আর বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও সুরবালার দুটো চোখ সবসময়ে লাল আর ভেজা ভেজা। সেদিন আড়াল থেকে শুনলাম, খুড়িমা ওকে বকছেন, কাঁদছিস কেন মুখপুড়ি? এত ভালো পাত্র আর জুটবে? জবাবে সুরবালা বলছিল, তোমরা কী বুঝবে কেন কাঁদছি? ও বিয়ে ভেঙে দাও। মায়ে-মেয়েতে বেশ লেগে গেল।
তারপর?
ওইখানেই ঝুলে আছে। শুধু গতকাল যখন অফিসে বেরোচ্ছি, তখন সুরবালা দরজা দিতে এসে চাপা গলায় বলল, অনেক পাষাণ দেখেছি, আপনার মতো দেখিনি।
বলেন কী মশাই? এ তো সাংঘাতিক কথা!
হ্যাঁ। সেই থেকে বড়ো উচাটন হয়ে আছি। মনে শান্তি নেই।
আহা, এতে উচাটন হওয়ার কী আছে? আরে আপনি ভূতকে ভয় পান না, দানশীল লোক, মহৎ প্রাণ, আপনার ভয়টা কীসের?
ভয়ের ব্যাপার তো নয়। এ হল ব্যাখ্যার অতীত একটা সিচুয়েশন। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না ব্যাপারটা।
কেন, আমি তো বেশ বুঝতে পারছি।
পারছেন?
বিলক্ষণ।
কী বুঝলেন?
সেটা হাঁটতে হাঁটতেই বলবখন। এখন উঠুন তো, উঠে পড়ন। খুড়োমশাই বাড়িতে আছেন তো?
আছেন, কিন্তু…
আর কিন্তু নয়, দেরি করলে কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে যাবে। খুড়োমশাইয়ের সঙ্গে আমার এক্ষুনি কথা বলা দরকার।
ইয়ে, তা নয় যাচ্ছি। কিন্তু….
মাসি
দু-হাতের দুটো বুড়ো আঙুল নেই বলে ফটকের আটকায় কীসে? কিছুতেই না। কেবল মাঝে মাঝে মাসি দুঃখ করে বলে–আহা, আমার ফটকের যদি দুটো বুড়ো আঙুল থাকত।
মাসি হচ্ছে কড়ে রাঁড়ি। ফটকেই তার ধ্যান জ্ঞান। বর্ধমানে ফটকের অপদার্থ বাপ এক ভুসিওলার আড়তে দাঁড়িপাল্লা সামলায়, বাদবাকি সময়টা হয় দিশি মাল গেলে, নয়তো বোকা মুখে সুখসুখ ভাব ফুটিয়ে পায়ের একজিমা চুলকোয়। ছেলেপুলেগুলো রাস্তার ধুলোকাদা মেখে ভূত সেজে বাউণ্ডুলেপনা করে বেড়ায়। ওই ভূতের দল থেকে মাসি বেছেছে ফটিককেই তুলে এনেছিল একদিন। দুটো বুড়ো আঙুল না থাকায় সে ছিল মা-বাপের কমতি ছেলে। পুরো ছেলে নয় বলে বাপ তাকে পুষ্যিপুত্ত্বর দিতে আপত্তি করেনি, মা কিছু কান্নাকাটি করেছিল, তা সে হচ্ছে মায়েদের ধাত, মনোমাসির বিষয়সম্পত্তি একদিন যে ফটিকই পাবে তা বুঝতে না পেরে। এক ভাগীদার ভাগনে মাঝে-মাঝে এসে হামলা করে। নইলে মাসির খোলার চালের বাড়ির আর তিন বিঘে ধানী জমি, কিছু সোনাদানা-এসব ফটকেই পাবে। মাসি ধর্মভীরু লোক, স্বামীর ব্যাঙ্কের টাকা-পয়সার সুদ থেকে সংসার চালায়। ইচ্ছে করলে মাসি টাকাটা বাইরে চড়া সুদে খাটাতে পারত। খাটায় না। সন্ধেবেলা ভাগবত পড়ে বারান্দায় বসে। সেই ভাগবত শুনতে মাঝে-মাঝে দু-চারজন বুড়ি বিধবা এসে বসে। তাদের কাছেই দুঃখ করে মাসি-আহা আমার ফটকের যদি দুটো বুড়ো আঙুল থাকত।
বুড়িরা সায় দিয়ে বলে–আঙুল থাকলে ও ছেলের আর দেখতে হত না। বুড়ো আঙুল ছাড়াই বা ওর আটকায় কীসে?
ঠিক কথা। ফটিকের আটকায় না। মাসি তাকে বসে থাকতে দেয় না। সাইকেল চালানো। শিখতে পাঠায়। তবলা বাজানো শিখতে পাঠায়। গাড়ি চালানো শিখতে পাঠায়। তার ধারণা, ফটিককে দিয়ে সব হবে। দিব্যি সাইকেল চালায় ফটিক, চাটুজ্জেদের ড্রাইভার মদনার সঙ্গে ভাব জমিয়ে গাড়ি চালাতেও শিখে গেল প্রায়। ভরসা আছে, মাসি একটা লরি কিনে দেবে ওকে। লম্বা লম্বা ট্রিপ মেরে দেদার কামাবে ফটিক। বুড়ো আঙুল ছাড়াই ও সবাইকে বুড়ো আঙুল দেখাবে একদিন।
পাড়ার ফাংশানে সেদিন রেডিয়ো আর্টিস্ট অনিলবরণ গাইতে এসে ফটিককে দেখে চোখ কোঁচকাল, বলল –তুই পারবি?
ফটকে তবলায় পাউডার মাখাতে–মাখাতে বলল –তুমি গান ধরো না।
অনিলবরণের চাকরি ভালো নয়। হাওড়া মিউনিসিপ্যালিটির জমাদারদের কাজ দেখে বেড়ায়। কিন্তু তার চুল ফাঁপানো, পোশাক হালফিলের প্যান্ট–শার্ট, পায়ে চোখা জুতো, কণ্ঠে সর্বদা গুনগুনানি। একবার রেডিয়োতে চান্স পেয়েছে। গায়ক অনিলবরণের ডাঁটই আলাদা। এ অঞ্চলের সব ফাংশানে সে বাঁধা আর্টিস্ট। ফটকেকে তাই নীচু নজরে দেখে। অবহেলায় ফাংশানমারা একখানা সাপটা মেরে মৃদু স্বরে ফুলপ্রজাপতি–তুমি–আমি–মার্কা আধুনিক ধরে ফেলল। টপাটপ টুম টপাটপ টুম আওয়াজে তবলায় বোল তুলে ফেলে ফটিক। শ্রোতারা অনিলবরণকে ছেড়ে ফটিকের আট আঙুলের কাজ দেখে, আর বাহবা দেয়। সামনে বাচ্চারা চেঁচাচ্ছে–ফটিকদা, চালিয়ে যাও।
