লোকটা আমার মুখের দিকে চেয়ে কী একটু মনোযোগ দিয়ে দেখল, তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল –ওই ট্রেন আসছে!
দেখলাম, বাজারের লেভেল ক্রসিং পার হয়ে ট্রেনটা হনহন করে আসছে। দুটো কুলি সেই শব্দে ঘুম ভেঙে উঠে মাথায় গামছা জড়াতে লাগল। আমরা ওভারব্রিজের রেলিঙের ফাঁক দিয়ে নীচে চেয়ে রইলাম।
দেখার কিছুই নেই এখন। এক সময়ে ছিল। ব্রিটিশ আমলে সাহেবসুবোরা এই স্টেশনে নেমেই উত্তরের পাহাড় লাইনে যেত। তখন মেল ট্রেন থামত এখানে, সারাটা স্টেশনে গমগমে ভাব ছিল, ওয়েটিংরুমে বার্মা সেগুনের ফার্নিচার, সূক্ষ্ম জালের দরজাওয়ালা রেস্টুরেন্ট–সবই ছিল। এখন উত্তরের জংশন হওয়ায় মেল ট্রেন আর এ পর্যন্ত আসে না। এটা হয়ে গেছে ব্রাঞ্চ লাইন, সারাদিনে দুটো প্যাসেঞ্জার আপ ডাউনে চলে। বিশাল স্টেশনবাড়িটা ফাঁকাপড়ে থাকে। বিনা-টিকিটের যাত্রী এত বেশি যে রেল কর্তৃপক্ষ এ লাইনটা তুলে দেওয়ার কথা ভাবছে। ওভারব্রিজের তক্তা খুলে পড়ে যাচ্ছে, প্ল্যাটফর্মে হঁট বেরিয়ে আছে, ভিখিরির বাচ্চারা প্ল্যাটফর্মের যেখানে সেখানে তাদের শরীরের ক্কাথ ফেলে রাখে।
আমরা ট্রেন দেখবার জন্য ঝুঁকে পড়লাম। সবসুদ্ধ জনা ত্রিশ-চল্লিশ লোক নামল। বয়সের মেয়েছেলে নেই, সাহেব আমলের বুড়ো চেকার নিকলসন ঘাড় কাত করে গেট-এর কাছে দাঁড়িয়ে ভিখিরির মতো হাত বাড়িয়ে আছে। যে যার ইচ্ছেমতো সেই হাতখানা ঠেলে–ঠেলে চলে যাচ্ছে, টিকিট কেউ দেয় না। নতুন লোক এলে নিকলসনকে দেখে একটু থমকাবেই। নীল চোখ, লাল চুল, সাদা রঙের আস্ত একটা সাহেব। কিন্তু সে নিজে তার সাহেবত্ব ভুলে গেছে কবে। আমাদের বিজয়কে দেখলে ‘ভিজয় ভিজয়’ বলে ডাকাডাকি করে বিজয়ের কৌটো থেকে দু-তিন টিপ নস্যি নেয়। সাহেবি আমলে তার মেমবউ ছিল, সে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর নিকলসন তাদের নেপালি আয়াকে প্রোমোশন দিয়ে বউ করে রেখেছে। নেপালি আর ইংরিজিতে তাদের মাঝে-মাঝে ধুন্দুমার ঝগড়া হয়। নিকলসন সাহেব ঝিঙে, টেকির শাক সবই খায় আজকাল।
মেয়েছেলে দেখা গেল না। তিন-চারজন বেশ ভালো চেহারা আর পোশাকের লোক ওয়েটিং রুমের দিকে গেল। ব্রিজের তলায় ভিখিরিদের উনুনে নতুন কাঠ গুঁজে দিয়েছে। সেই ধোঁয়ায় চোখে জল এসে যাচ্ছিল।
হারু বলল –নিকলসন সাহেব আর বেশিদিন বাঁচবে না, বুঝলি! ওর বোধবুদ্ধি ভোঁতা হয়ে কেমন হয়ে গেছে।
–কেন? আমি জিগ্যেস করি।
হারু বলে–সেদিন ডাউন প্যাসেঞ্জারটা চলে যাওয়ার পর নিকলসন বেঞ্চটায় বসে বিড়ি ধরাবার সময় যেই মাথার হ্যাট খুলেছে, অমনি হ্যাটের ভিতর থেকে একটা বোলতা বেরিয়ে উড়ে গেল।
–যাঃ!
–মাইরি–মাইরি! মাথার চুল ছাঁটে না বলে ঝোপড়া হয়ে আছে মাথা, তাই কামড়ায়নি, কিন্তু টুপির ভিতর বোলতা উড়লে লোকে টের পাবে না! ও কিন্তু পায়নি। তাই বলছিলাম–
ডালিম প্ল্যাটফর্মের লোক দেখতে-দেখতে হঠাৎ চেঁচিয়ে ডাকল–আরে! মদন, এই মদন–
আমরা সবাই ওভারব্রিজের রেলিঙ ধরে ঝুঁকে পড়লাম। নিকলসনের হাতটা ঠেলে মদন বেরিয়ে এল। বগলে একটা কাগজের প্যাকেট, মুখ তুলে আমাদের দেখে একটু ভ্রূ কুঁচকে বলল
–তোরা!
–খালাস পেলি? বলে আমি চেঁচিয়ে উঠেছিলাম, বাদু আমাকে খোঁচা দিয়ে বলে–এই শালা, খালাসের কথা চেঁচিয়ে বলতে আছে? তুই একটা–অশ্লীল কথা দিয়ে বাক্য শেষ করে বাদু। তারপর ঝুঁকে বলে–উঠে আয় না, মদন।
মদন একটু বিরক্ত চোখে আমাদের দেখল, একটু ইতস্তত করল, তারপর উঠে এল। তার মাথায় একটোকা চুল পিঙলে হয়ে জট বেঁধেছে, গায়ে বসা–ময়লা, হাত পায়ের গাঁট ফোলা ফোলা খুব রোগাও হয়ে গেছে।
–কবে খালাস পেলি? হারু জিগ্যেস করে।
মদন গম্ভীর গলায় বলে–কাল।
–খালাস না জামিন? আমি জিগ্যেস করি।
মদন গম্ভীরভাবে আমার দিকে চেয়ে বলল –তোর বয়স আর বাড়ল না রন্টে! দু বছর হাজতে থাকার পরও কেউ জামিন পায়?
আমি আমতা-আমতা করে বলি কাগজে কেবল জামিনের কথাই পড়ি তো। শোনা যায়, পুলিশ সবাইকে ধরে নিয়ে জামিনে আবার ছেড়ে দেয়, তারপর আর ধরে না।
মদন একটু গর্বের সঙ্গে বলল –আমারটা ছিল নন বেইলেবল কেস!
কথাটার মানে তেমন পরিষ্কার বুঝলাম না, ইংরেজিতে আমি বরাবর কাঁচা।
ডালিম জিগ্যেস করল–কেমন ছিলি?
মদনের চোখ চকচক করে ওঠে। একটু ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলে–কেমন আর! আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেমন হয়–বলতে-বলতে সে নতুন লোকটার দিকে চেয়ে বলে–ইনি কে?
ডালিম নীচু গলায় বলে–শ্রেণিহীন সমাজের লোক। বলে খুকখুক করে হাসে।
–তার মানে? মদন একটু রুখে উঠে বলে। ‘শ্রেণিহীন সমাজ’ কথাটা বোধহয় তার ভালো লাগে না।
নতুন লোকটা বলল –ঘাবড়াবেন না। ও একটা কথার কথা। মদন লোকটার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলে–কথার কথা মানে কী? ওসব কি ঠাট্টার কথা নাকি? ওই স্বপ্ন নিয়ে কত ছেলে লড়াই করে মরে যাচ্ছে।
লোকটা ঠান্ডা গলায় বলে–আসলে ইদানীং ভারতীয় অর্থনীতির রূপান্তরের সময়ে আমাদের মতো কিছু লোকের শ্রেণি লোপ পেয়েছে। ইংরিজি বলতে পারি, ক্রিকেট খেলা বুঝি, অচেনা জায়গায় ভিক্ষে করি, মচ্ছবের খবর পেলে যাই, বিয়ে–বাড়ি দেখলে সুট করে ঢুকে পড়ি। এসব অ্যাকটিভিটি থেকে একটা মানুষকে কোনও শ্রেণিতেই ফেলা যায় না। ভ ভদ্রলোক, ছোটোলোক, ভিখারি–কোনওটাই খাটে না….
