কার না রাগ হয়? কিন্তু মুখোমুখি চোটপাট করে কিছু বলাও যায় না। কুটুম মানুষ।
দত্তবাবু প্যাসেজটার মধ্যে এগিয়ে গিয়ে বললেন–গামছাটা আপনি পেলেন কোথায়?
‘বাবা’ ডাকেন না বলে যে শ্বশুরমশাই দত্তবাবুকে কম খাতির করেন তা নয়। বরং বেশিই করেন। বাবা ডাকেন না বলেই খাতির করেন। খাতিরের চেয়েও বেশি। ভয় পান।
বুড়োমানুষ ভয়ে হাঁ করে আছেন। আড়ষ্ট হাতে জামাইয়ের গামছা সামলে নিয়ে বললেন–এইখানেই ছিল। সরিয়ে রাখছি। দেখো, তোমার গামছায় যেন কেউ হাত না দেয়। কাউকে হাত দিতে দেবে না। আমিও সবাইকে বারণ করি, অধীরের গামছায় তোমরা কেউ…
দত্তবাবু মুখটা কুঁচকে সরে এলেন। গামছাটা আজ আর-একবার কাচিয়ে নিতে হবে। সরে আসতে-আসতেই শুনতে পেলেন, ‘হ্যাক’ করে থুতু ফেলার শব্দ। পিছনে আর তাকালেন না। তাকালে আর সারাদিন জল খাওয়া হবে না। প্যাসেজেই জলের কুঁজো রাখা। শ্বশুরমশাই সারাদিন বাড়ির সর্বত্র থুতু ফেলছেন। সর্বত্র।
লীলাময়ী নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন বাইরের ঘরের দরজার পাশে। একটু গোপনীয়তার ভঙ্গি মাখানো তাঁর শরীর।
গোপনীয়তা বাহুল্যমাত্র। বাইরের ঘর থেকে যে আসছে তা শোনবার জন্য কান পাততে হয় না।
৪.
যতটা সুভদ্রাকে ততটা আর কোনও মেয়েমানুষকে ঘেন্না করে না অধীপ। গুয়ের পোকাও কী ওর চেয়ে ভালো নয়?
সুভদ্রা খাটে বসে আছে, সামনের দিকে জোড়া পা ছড়ানো, পিছনে হাতের ভর। মুখ সাদা, চোখ জ্বলছে। বলল –ন্যাকা–জানো না?
–তুমি বলতে পারলে? কোনও ভদ্রলোকের মেয়ে বলতে পারে ওকথা?
–নিজেরা কী? লোকে শুনলে থুতু দিয়ে যাবে গায়ে। ভদ্রলোকের মেয়ে! আমি ভদ্রলোকের মেয়ে না তো কী, তোমার মতো ইতরের বাচ্চা?
মেয়েমানুষকে মারা ভালো নয় অধীপ জানে। কিন্তু এই মুহূর্তে বুঝতে পারে, মারমারের মতো এমন নিরাময় আর কিছুতেই নেই। মারাই বোধহয় সবচেয়ে শান্তি। এক পা এগিয়ে সে শরীরে রিমঝিম রাগের নাচ শেষ কয়েক মুহূর্তের জন্য সহ্য করে প্রায় রুদ্ধস্বরে বলল –এই বজ্জাত মাগি! মুখ ঘষে দেব দেওয়ালে!
দাও না দাও! বলে চোখের পলকে উঠে আসে সুভদ্রা। একদম কাছে এসে চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বলে–ছোটলোকের ইতরের গর্ভে যার জন্ম তার কাছে কী আশা করব? মারো!
অধীপ কথা বলতে পারে না। কাঁপে। স্ট্রোক হয়ে যাবে! পাগল হয়ে যাবে! ডিভোর্স…।
সুভদ্রা ধকধক করতে-করতে বলে–ন্যাকা! জানো না, তোমার শরীরে কীসের রক্ত! গুষ্টিসুদ্ধ। বদমাইশ তোমরা, জানো না? তোমার ওই আদরের লেংড়ি বোন চুনু কেন আমাকে বিয়ের পরদিনই বলেছিল–এই বউদি, তুমি কেন আমার দাদার সঙ্গে শোবে!
অধীপের এ কথাটা মাথায় ঢোকে কিন্তু সুভদ্রাই কথাটা বলতে–এটা যেন বিশ্বাস হয় না। তার সমস্ত বিশ্বাসের ভূমি থেকে কে যেন তাকে তুলে ছুঁড়ে দেয় অন্য একটা হীন আর ক্লিব জগতে। সে কাঁপতে-কাঁপতে কসাইয়ের গলায় বলে–কেন বলেছিল?
সুভদ্রা সে-কথার সরাসরি জবাব না দিয়ে দিগবসনা আক্রোশে প্রায় নেচে উঠে বলে–সহ্য হবে কেন? আদরের দাদার সঙ্গে অন্য কেউ শোয় তাতে বুক জ্বলে যাবে না? ছিঃছিঃ! তোমরা লোকসমাজে মুখ দেখাও কী করে?
অধীপ হঠাৎ পাথরের মতো শান্ত হয়ে গেল! খুন করার আগে যেমন মানুষ কখনও-কখনও হয়। একটু বাদেই সুভদ্রা তার হাতে খুন হবে, সুতরাং সে নিশ্চিন্ত সিদ্ধান্তের পর ঠান্ডা গলাতেই বলল –তুমি নর্দমার পোকা।
–তা তো বলবেই। নিজেরাই কি না। শ্বশুর আমাকে ভালোবাসে বলে তোমার মা বলেনি, শ্বশুর বলেই কী, পুরুষ তো। যুবতী বউয়ের সঙ্গে অত মাখামাখি কীসের? তুমিও বলোনি, সুভ, তুমি বাবার সঙ্গে অত মেলামেশা কোরো না। বলোনি?
বলেছে। ঠিক কথা, মায়ের কাছে শুনে কারও এক সময়ে বিশ্বাস হয়েছিল, বাবার সঙ্গে সুভদ্রার অত স্নেহের সম্পর্কের মধ্যে কিছু একটা অসঙ্গতি আছে। বলেছে। কিন্তু মানুষের কি ভুল হয় না!
সুভদ্রা ঝোড়ো দ্রুতবেগে বলে–সন্দেহ করোনি নিজের বাবাকে? অমন মাতৃভক্তির কপালে ঝাঁটা। ডাইনি মুখে পোকা পড়ে মরবে, পচে গলে মরবে।
ঠিক এই সময়ে দুর্গন্ধটা আসে। বহু দিনকার জমানো মল, ময়লা, জলের প্রচণ্ড গ্যাস। ঘরটার বাতাস পলকে বিষিয়ে ওঠে। কিন্তু তারা দুজন গন্ধটাকে টেরই পায় না; কিংবা পেয়েও উপেক্ষা করতে পারে। কিংবা হয়তো তারা ঠিক এই মুহূর্তে দুর্গন্ধটাকে উপভোগই করে।
আশ্চর্যের বিষয়, অধীপ হাসল। অবশ্য এটা হাসি নয়। খুন করার আগে অভ্যস্ত খুনি কখনও সখনও এরকমই হাসে হয়তো।
তার পরেই সে চড়টা মারল। সুভদ্রা যে পাঁচ মাসের পোয়াতি তা মনে রইল না। লক্ষও করল যে তার দু-বছরের ছেলে দৃশ্যটা দেখছে।
৫.
–চালা! জোরসে চালা জলদি।
–হচ্ছে বাবা, হচ্ছে। পাম্প তো নেহি যে ভটভট করে গাদা খিচে লিবে!
দু-নম্বর ট্যাংকিতে ঘপ করে বালতি মারে মাগন। হাউস ফুল।
দত্তবাবু চেঁচিয়ে বলেন–এই ব্যাটা ময়লা ফেলার গর্ত করবি না?
–হ্যাঁ-হ্যাঁ, গোর্তো হোবে, গোর্তো ভি হোবে। এক বোতল শরাবের দাম দিবেন তো বড়বাবু?
–নালিতে ময়লা ফেলবি তো পয়সা কাটব। নালি আটকালে বাড়িওয়ালা পাঁচ কথা শোনাবে। খুব সাবধান।
–কোই চিন্তা নাই বড়বাবু। কাম পুরা করে পয়সা লিব।
প্লাস পাওয়ারের চশমাটা পরেও স্টেটসম্যানের খবরগুলো দেখতে পান না দত্তবাবু। পুরোটাই আবছা, অস্পষ্ট, হিজিবিজি এবং অর্থহীন। তবু মুখের সামনে কাগজটা ধরে রাখেন। মুখোশের মতো।
