অন্দরমহলের দরজায় একটু ঠেলাঠেলি পড়ে গেল। মেয়ে আসছে। একটু কেমন ভয় ভয় করছিল বদরীর। মেয়ের চারখানা হাত বেরোবে না তো!
ভিড় ঠেলে যাকে আনা হচ্ছিল, তার দিকে বদরী চাইতেই পারল না। দেয়ালে একখানা পাখির বাঁধানো ছবি দেখছিল। হলুদ রঙের পাখি। কী পাখি কে জানে বাবা! সুতোর কাজ।
ওরে দেখ, দেখ। দেখে নে। অন্যদিকে চেয়ে আছিস যে?
বদরী মাথাটা প্রথমে নুইয়ে তারপর তুলল। সব মুখই কালো লেপাপোঁছা দেখাচ্ছিল। বাইরে এতক্ষণ বসেছিল বলে, চোখটাও ধাঁধানো। ঘরটাও অন্ধকার।
তবু তারমধ্যেই একজোড়া চোখে তার চোখ আটকাল। একজোড়া? নাকি তিনটে? মেয়ের কি তিনটে চোখ? যা-সব গল্প শুনেছে পুলিনের কাছে, হওয়া বিচিত্র কী?
তবে না। কপালে একটা লম্বাটে বড়োটিপ পরেছে বলে ওইরকম। মুখচোখের তেমন হদিশ পেল না। পেয়ে। হবেটাই বা কী? ফেরার পথে পুলিনকে শুধু একটা কথাই বলতে হবে, পছন্দ হয়নি।
হঠাৎ ঝাঁ করে, এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া কোথা থেকে যে এল কে বলবে? বদরীর মনটাই আজ নানা আলৌকিকের বাসা হয়ে আছে। সে একটু চমকে উঠল। এ কী রে বাবা, ঠাণ্ডা হাওয়া মারে কেন?
কে একজন হেঁড়ে গলায় বলে উঠল, ঝড় আসছে।
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই একটা সিংহগর্জনের মতো মেঘ ডেকে উঠল। সেরেছে। এতক্ষণ লক্ষ করেনি বদরী। লক্ষ করবেই বা কীভাবে। যা ঘিরে ছিল সবাই মিলে।
পুলিনবিহারী পান চিবুচ্ছে। কোত্থেকে পেল কে জানে? তার খুড়োর বাড়ি পেতেই পারে। বলল, আসুক বাবা, আসতে দে। ঘামাচিগুলো মরে তাহলে।
দু-চারজন ছিটকে বেরিয়ে গেল। ঝড় এলে গেরস্তবাড়িতে কিছু সারা-তাড়া থাকে।
জাঁদরেল মহিলা বলল, ও কাতু, অমন মাথা নুইয়ে আছিস যে? মুখটা তোল। ভালো করে দেখুক। নইলে পছন্দ হবে কী করে?
নাঃ, মিঠে হাওয়াটা বন্ধ হল না। বরং বাড়ল। চোতের কালবোশেখি কত তাড়াতাড়ি আসে, তা বদরী আর পাঁচজন চাষির মতোই জানে। দম ফেলার সময়টুকু দেয় না। কড়াৎ কড়াৎ করে দুটো বাজ পড়ল, আর মুঠো মুঠো ধুলো উড়ে এল বাতাসে। ঝপঝপ জানলা-দরজা বন্ধ করছিল সবাই। একটা হুড়োহুড়ি।
পুলিন বলল, ওরে আসতে দে, আসতে দে। এ যে, সূচিভেদ্য করে ফেললি বাপ!
বাস্তবিকই, দরজা-জানলা বন্ধ হওয়ার পর, ঘরখানা জম্পেশ অন্ধকার হয়ে গেল হঠাৎ। বাইরে তুমুল গর্জন করে একটা বড়ো হাওয়ার ঝটকা, টিনের চালে মটমট শব্দ করে গেল। দু-নম্বর ঝটকায় দরজাটা উঠল মড়মড় করে। তারপর একেবারে হুহুংকারে কেঁপে উঠল চারদিক। বাইরে চেঁচামেচি, দৌড়োদৌড়ি, ঠাস ঠাস কপাট-জানলার শব্দ।
ঝড়ের গর্জনে ঘরের ভেতরকার কথাবার্তাও চাপা পড়ে গেল। কানে তালা ধরিয়ে বাজ পড়ল কোথাও। খুব কাছেই।
বদরীর অবশ্য ভয় নেই। প্রতিবারই খোলা মাঠে এই ঝড়ের সঙ্গে তার দু-চারবার দেখা হয়। ঘরে বসে সে শুধু শব্দটা শুনে তান্ডবটা কীরকম তা আন্দাজ করছিল। বেশি বাড়াবাড়ি হলে ট্রেনটা পিছলে যাবে।
আচমকাই ফের মনের ভুল? নাকি চোখের বিভ্রম! পরিষ্কার দেখল সে, একটা নয়, দুটো নয়, তিন তিনটে চোখ অন্ধকারে তিনটে পিদিমের শিখার মতো জ্বলছে। স্থির।
নাঃ, আজ তার মাথাটাই গেছে। কোথায় কী? ঘর যেমন কে তেমন অন্ধকার। তার মধ্যেই পুলিন টর্চ জ্বালাল। পাত্রীর চেয়ার ফাঁকা। উঠে গেছে কোন ফাঁকে। ঘরের ভিড়ও পাতলা হয়ে গেছে। সেই বুড়ো, জাঁদরেল মহিলা আর কদম দাস দাঁড়িয়ে।
পুলিন বলল, এ তো মুশকিল হল রে! যাবি কী করে?
পাঁচ-দশ মিনিটের বেশি তো আয়ু নয়। থেমে যাবে। বদরী বলল।
সে যাবে। কিন্তু রাস্তাটার কী অবস্থা হবে জানিস?
একটু হাসল বদরী। সে হেলে চাষা, জলকাদা ভেঙে চাষ। এসব বাবু-ঘেঁষা কথা শুনলে মায়া হয়।
ঝড়ের তাড়স বাড়ল। বৃষ্টিটা এখনও শুরু হয়নি।
কদম দাস বলল, আমের বউলগুলো সব গেল।
পুলিন বলল, যায় যাক, তবু ঠাণ্ডা হোক। চাষবাস লাটে উঠতে বসেছিল।
তা বটে।
চালের টিন ধরে টানাটানি করছে ঝড় বাবাজীবন। ওপড়ায় আর কি!
কদম দাস উধ্বমুখে চেয়েছিল। চালের নীচে কাঠের পাটাতন। পাটাতনে রাজ্যের জিনিস।
এ-ঘরের না হলেও অন্য কোনো ঘরের টিন মড়াৎ করে উলটে গেল বটে। বিকট শব্দে সেটা আছড়ে পড়ল কোথাও। দুটো গাছ ভেঙে পড়ার শব্দ হল পর পর।
সুপুরি আর জামগাছটা গেল। কদম দাস মুখ শুকনো করে বলল।
পুলিন টর্চটা নিবিয়ে বলল, অ বদরী।
বদরী বলল, ঘড়িটা দ্যাখো পুলিনদা।
ছ-টা বত্রিশ। টাইম দেখে হবেটা কী? ঝড় না থামলে তো নড়ার উপায় নেই।
এরপর খানিকক্ষণ কথাবার্তা বন্ধ। তারপর-ই বৃষ্টিটা এল। প্রথম চড়বড়ে কয়েকটা ফোঁটা। তারপর তুমুল। তারপর মুষলধারে।
বদরী চুপ করে বসে রইল। বাইরের ঝড়বৃষ্টি বা মেয়ের চিন্তা, শেষ ট্রেন কোনোটার কথাই ভাবছে না সে। ভাবছে, ভুল দেখল। কী দেখল সে? কাত্যায়নীর গপ্পো তো গপ্পোই। ওর কম অনেক রটনা হয়। তাহলে এরকমধারা হচ্ছে কেন?
বুড়ো মানুষটি হঠাৎ বলল, সুলক্ষণ।
পুলিন বলে, কীসের সুলক্ষণ?
এই কালবোশেখির কথাই বলছি।
অ।
কদম একটা শ্বাস ফেলে বলল, যাক, ফাঁড়াটা কেটেছে। গোয়ালঘরের একটা টিন গেছে। তা যাক।
বদরী বসে আছে চুপচাপ। তার যেন আর তাড়া নেই। গেলেও হয়, না গেলেও হয়।
তাড়াটা এল পুলিনের দিক থেকেই, ওরে ওঠ, সাতটা বাজে যে।
ঝড় থেমেছে। বৃষ্টিটাও ধরে এল। টিনের চালে এখন শুধু মিঠে রিমঝিম। বদরী উঠল।
