একদিন রাতে রান্না করতে করতে যামিনীদার শাশুড়ি উঠে এসে বলল, ‘অখনও বইয়া আছ? বখ্না বাছুর তুলছ নি?’
নেশার ঘোরে কথাটা বুড়োর কানে গেল। তাই তো, বখ্না বাছুর দুপুর থেকে তেঁতুলতলায় বাঁধা আছে। তাকে তো গোয়ালে তোলা হয়নি। যদি বাঘে নেয়!!
সঙ্গে সঙ্গে তক্তাপোশে ধড়মড় করে উঠে বসল বুড়ো। ওসব অঞ্চলে সেকালে বড়ই বাঘের উপদ্রব ছিল। এক লাফে উঠে পড়ে, দড়াম করে দরজা খুলে শ্বশুর কৃষ্ণপক্ষের রাতে বেরিয়ে পড়ল।
কানে এল তেঁতুলতলা থেকে বাছুরের ডাক। বেচারি ভয় পেয়েছে। শ্বশুর ছুটে গেল সেদিকে। মাঝপথেই দেখে ভয়ের চোটে খুঁটি উপড়ে বাছুর নিজেই চলে এসেছে।
বুড়ো তাকে খপ্ করে কোলে তুলে, ঘরের দিকে ফিরল। বাবা! বাছুরের কী রাগ! প্রাণপণে চার-পা ছুড়ে সে কী ছট্ফটানি। বুড়ো গায়ের জোরে তাকে বুকের কাছে জাপটে ধরে হন্হনিয়ে এগিয়ে চলল।
হঠাৎ ঘর থেকে তেলের পিদিমের একটুখানি আলো বাঁকা হয়ে বাছুরের গায়ে পড়ল। বুড়ো চমকে উঠল। ই কী! বাছুরের ল্যাজে কালো ডোরাকাটা কেন? ভাল করে দেখে, শুধু ল্যাজে নয়, সারা গায়েই ডোরাকাটা! তবে কী— তবে কী! বাছুরটাকে তুলে ধরে দুম করে ছুড়ে ফেলে দিল শ্বশুর। সেও একটা গাঁউক্ শব্দ করে চোঁ-চোঁ দৌড় দিল।
বুড়ো আবার তেঁতুলতলায় ফিরে গিয়ে, বাছুরের দড়ি খুলে, তাকে কোলে নিয়ে ঘরে এনে, তক্তপোশের পায়ার সঙ্গে বেঁধে, দরজা বন্ধ করে, থম্ হয়ে বসে রইল। আরও রাত হলে, নেশার ঘোর কমলে, বউকে একবার বলল, ‘বলে বাঘ কোলে নিছি!’
আজকাল দিন পালটে গেছে, মদের গল্প সবাই বলে। আমার ছোট বোন লতিকা বলেছে কয়েক বছর আগে আমেরিকায় দু’জন সাংবাদিক একজন ৮৯ বছরের বুড়োর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে গেছিল। বুড়োর গাছ থেকে পাকা আমটার মতো স্বাস্থ্য ফেটে পড়ছিল। তিরের মতো সোজা। শহরময় চষে বেড়াতেন। বুদ্ধি টন্টন্ করত।
সাংবাদিকরা জানতে চাইল এই বয়স পর্যন্ত ভদ্রলোক এমন স্বাস্থ্য রাখলেন কী উপায়ে। বুড়ো বললেন, ‘সেটা ঠিক বলতে পারছি না। জেনেশুনে কোনও উপায় নিইনি। তবে আমার মনে হয়, এর একমাত্র কারণ হল আমি কখনো মদদ ছুঁই না।’
একতলার ঘরে এইসব কথাবার্তা হচ্ছে, এমন সময় সিঁড়িতে মহা ধুপধাপ শব্দ। কে যেন ফুর্তির চোটে গান গাইতে গাইতে হুড়মুড় করে ওপরে উঠছে। সাংবাদিকদের চাঞ্চল্য দেখে বুড়ো বললেন, ‘ব্যস্ত হবেন না, মশাইরা! ও আমার বাবা ছাড়া কেউ নয়। দুঃখের কথা আর কী বলব, ৮০ বছর ধরে দেখছি, সন্ধের পর রোজ চুর হয়ে বাড়ি ফেরে! অথচ দেখছেন তো কুড়ি বছরের ছোকরার মতো দাপট। আমার নাতিদের সঙ্গে বেস্বল খেলে!’
লতিকার কাছে একটা দিশি গল্পও শুনেছি। রামু শ্যামু মুখোমুখি বসে সমানে তাড়ি খেয়ে যাচ্ছে। অনেক রাত হয়ে গেছে। দু’জনার মধ্যিখানে একটা তেলের বাতি জ্বলছে। সেই আলোতে হঠাৎ শ্যামুর মুখের দিকে তাকিয়ে, রামু বলল, ‘ওরে শ্যামু, অত মদ খাস্নে বলছি! তোর মুখটা কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে!’
মনে হয় গুলিখোরদের মধ্যে ভারী একটা দিশি ভাব আছে। জ্যাঠামশাইদের কাছে এন্তার গুলিখোরের গল্প শুনেছি। তাদের মনে নানারকম খেয়াল চাপে। কল্পনাশক্তি বেজায় বেড়ে যায়। একজন কড়া মেজাজের ভদ্রলোকের ছেলে, বাপের শাসন এড়িয়ে গুলিখোরদের দলে গিয়ে জুটেছিল। পাড়ার একজন লোক তার বাপকে বলে এল, ‘দেখুন গিয়ে, গুলির আড্ডায় আপনার পুত্র গাড়ু সেজে বসে আছে।’
তাই শুনে অগ্নিশর্মা হয়ে বাপ ছুটলেন সেখানে। বলাবাহুল্য অমন জঘন্য জায়গায় পা না দিয়ে, রাস্তায় দাঁড়িয়েই তিনি ছেলেকে যা-নয়-তাই বলে বকাবকি করতে লাগলেন। ছেলে এক হাত কোমরে দিয়ে, অন্য হাত বক দেখানোর ভঙ্গিতে শূন্যে তুলে, গাড়ু হয়ে বসে ছিল। গাড়ু তো আর কথা বলে না, তাই সে চুপ করে রইল।
বাপ তখন পথ থেকে একটা ছোট ঢিল তুলে ছেলের গায়ে ছুড়ে মারলেন। গায়ে লাগতেই ছেলে বলল, ‘ঠুং!’ পেতলের গাড়ুতে ঢিল লাগলে তো ঠুং করবেই।
বাপ রাগে অন্ধ হয়ে, এক লাফে ঘরে ঢুকে, ছেলের কোমরে রাখা হাতটা ধরে তাকে হিড়হিড় করে টেনে রাস্তায় ফেললেন। ছেলে ফুটপাথে কাত হয়ে পড়ে, বলতে লাগল গব্-গব্-গব্-গব্-গব্! গাড়ু উলটোলে জল বেরিয়ে যাবে না?
পটোদিদি
পটোদিদিকে শেষ বয়সে দেখেছি শ্যামলা রং, মোটা শরীর, কথা বলার বিরাম নেই। কিন্তু ওই কাটা-কাটা নাক-মুখ আর ঈগল-পাখির চাহনি নিয়ে এক কালে যে সুন্দরী ছিলেন, সে বিষয়ে কোনও প্রশ্নই উঠতে পারে না। ভারী স্বাধীন ও স্বাবলম্বী মানুষটি। বিয়ের সময় বাপ যেসব টাকাকড়ি, বাড়ি-ঘর দিয়েছিলেন, সে সমস্তই কোন কালে একে-ওকে ইত্যাদিকে বিলিয়ে, কিচ্ছু না দিয়েই জীবনের শেষ কটা বছর দিব্য কাটিয়ে দিলেন।
নিজের আনাড়ি হাতে জোড়াতালি দেওয়া জামা আর সরু পাড়ের মিলের মোটা কাপড় পরনে; পায়ে সবুজ ক্যাম্বিসের জুতো, ভাইপোর বাড়ির দরজা-জানালায় সবুজ রং হবার সময় টিনে যেটুকু তলানি পড়েছিল, তাই দিয়ে স্বহস্তে রঞ্জিত।
আমাকে বললেন, ‘কেন, সবুজ কি খারাপ রং, তা হলে আর গাছপালা সবুজ হত না। তা ছাড়া কত সুবিধা ভেবে দ্যাখ, ময়লা হলেও টের পাবার জো নেই। অথচ এক পয়সা খরচ নেই।— আচ্ছা ওই মন্দির-প্যাটার্নের বড় বড়িগুলোকে আলাদা টুকরিতে ভরে লগেজ বাড়াচ্ছিস কেন?’
