শোনো সতীশ, আর একটা কথা আছে। শুনলাম, তোমার মেসোর কাছ হতে তুমি নূতন সুট কেনবার জন্য আমাকে না বলে টাকা চেয়ে নিয়েছ । যখন নিজের সামর্থ্য হবে তখন যত খুশি সাহেবিয়ানা কোরো, কিন্তু পরের পয়সায় ভাদুড়ি-সাহেবদের তাক লাগিয়ে দেবার জন্য মেসোকে ফতুর করে দিয়ো না। সে টাকাটা আমাকে ফেরত দিয়ো। আজকাল আমাদের বড়ো টানাটানির সময়।
সতীশ। আচ্ছা , এনে দিচ্ছি।
সুকুমারী। এখন তুমি দোকানে যাও, সেই টাকা দিয়ে কিনে বাকিটা ফেরত দিয়ো। একটা হিসাব রাখতে ভুলো না যেন।
সতীশের প্রস্থানোদ্যম
শোনো সতীশ, এই কটা জিনিস কিনতে আবার যেন আড়াই টাকা গাড়িভাড়া লাগিয়ে বোসো না। ঐ জন্যে তোমাকে কিছু আনতে বলতে ভয় করে। দু পা হেঁটে চলতে হলেই অমনি তোমার মাথায় মাথায় ভাবনা পড়ে— পুরুষমানুষ এত বাবু হলে তো চলে না। তোমার বাবা রোজ সকালে নিজে হেঁটে গিয়ে নতুন বাজার হতে কই মাছ কিনে আনতেন— মনে আছে তো? মুটেকেও তিনি এক পয়সা দেন নি।
সতীশ। তোমার উপদেশ মনে থাকবে— আমিও দেব না। আজ হতে তোমার এখানে মুটেভাড়া বেহারার মাইনে যত অল্প লাগে সে দিকে আমার সর্বদাই দৃষ্টি থাকবে।
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
হরেন। দাদা, তুমি অনেকক্ষণ ধরে ও কী লিখছো, কাকে লিখছ বলো-না।
সতীশ। যা যা, তোর সে খবরে কাজ কী, তুই খেলা কর্ গে যা।
হরেন। দেখি-না কী লিখছ— আমি আজকাল পড়তে পারি।
সতীশ। হরেন, তুই আমাকে বিরক্ত করিস নে বলছি— যা তুই।
হরেন। ভয়ে আকার ভা, ল, ভাল, বয়ে আকার বা, সয়ে আকার সা, ভালোবাসা। দাদা, কি ভালোবাসার কথা লিখছ বলো-না। তুমিও কাঁচা পেয়ারা ভালোবাস বুঝি । আমিও বাসি।
সতীশ। আঃ হরেন,অত চেঁচাস নে , ভালোবাসার কথা আমি লিখি নি।
হরেন। অ্যাঁ ! মিথ্যা কথা বলছ! আমি যে পড়লেম ভয়ে আকার ভাল,ভাল, বয়ে আকার সয়ে আকার ভালোবাসা। আচ্ছা, মাকে ডাকি, তাঁকে দেখাও।
সতীশ। না না , মাকে ডাকতে হবে না। লক্ষ্মীটি, তুই একটু খেলা করতে যা,আমি এইটে শেষ করি।
হরেন। এটা কী দাদা । এ যে ফুলের তোড়া, আমি নেব।
সতীশ। ওতে হাত দিস নে, হাত দিস নে, ছিঁড়ে ফেলবি।
হরেন। না, আমি ছিঁড়ে ফেলব না, আমাকে দাও-না।
সতীশ। খোকা, কাল তোকে আমি অনেক তোড়া এনে দেব, এটা থাক্।
হরেন। দাদা, এটা বেশ, আমি এইটেই নেব।
সতীশ। না, এ আর-একজনের জিনিস, আমি তোকে দিতে পারব না।
হরেন। অ্যাঁ, মিথ্যে কথা! আমি তোমাকে লজঞ্জুস আনতে বলেছিলেম, তুমি সেই টাকায় তোড়া কিনে এনেছ— তাই বৈকি, আর-একজনের জিনিস বৈকি।
সতীশ। হরেন, লক্ষ্মী ভাই, তুই একটুখানি চুপ কর্ , চিঠিখানা শেষ করে ফেলি। কাল তোকে আমি অনেক লজঞ্জুস কিনে এনে দেব।
হরেন। আচ্ছা, তুমি কী লিখছ আমাকে দেখাও।
সতীশ। আচ্ছা দেখাব, আগে লেখাটা শেষ করি।
হরেন। তবে আমিও লিখি।
স্লেট লইয়া চিৎকারস্বরে
ভয়ে আকার ভা, ল, ভাল, বয়ে আকার বা সয়ে আকার সা ভালোবাসা।
সতীশ। চুপ চুপ, অত চিৎকার করিস নে। আঃ , থাম্ থাম্।
হরেন। তবে আমাকে তোড়াটা দাও।
সতীশ। আচ্ছা নে, কিন্তু খবরদার ছিঁড়িস নে— ও কী করলি! যা বারণ করলেম তাই! ফুলটা ছিঁড়ে ফেললি! এমন বদ ছেলেও তো দেখি নি।
তোড়া কাড়িয়া লইয়া চপেটাঘাত করিয়া
লক্ষ্মীছাড়া কোথাকার! যা, এখান থেকে যা বলছি, যা।
হরেনের চিৎকারস্বরে ক্রন্দন, সতীশের সবেগে প্রস্থান
বিধুমুখীর ব্যস্ত হইয়া প্রবেশ
বিধু। সতীশ বুঝি হরেনকে কাঁদিয়েছে, দিদি টের পেলে সর্বনাশ হবে। হরেন,বাপ আমার, কাঁদিস নে, লক্ষ্মী আমার, সোনা আমার।
হরেন। (সরোদনে) দাদা আমাকে মেরেছে।
বিধু। আচ্ছা আচ্ছা, চুপ কর্, চুপ কর্। আমি দাদাকে খুব করে মারব এখন।
হরেন। দাদা ফুলের তোড়া কেড়ে নিয়ে গেল।
বিধু। আচ্ছা , সে আমি তার কাছ থেকে নিয়ে আসছি।
হরেনের ক্রন্দন
এমন ছিচ্কাঁদুনে ছেলেও তো আমি কখনো দেখি নি। দিদি আদর দিয়ে ছেলেটির মাথা খাচ্ছেন। যখন যেটি চায় তখনই সেটি তাকে দিতে হবে। দেখো-না, একবারে দোকান ঝাঁটিয়ে কাপড়ই কেনা হচ্ছে। যেন নবাবপুত্র
ছি ছি,নিজের ছেলেকে কি এমনি করেই মাটি করতে হয়। (সতর্জনে)
খোকা, চুপ কর্ বলছি। ঐ হামদোবুড়ো আসছে।
সুকুমারীর প্রবেশ
সুকুমারী। বিধু, ও কী ও! আমার ছেলেকে কি এমনি করেই ভূতের ভয় দেখাতে হয়। আমি চাকর-বাকরদের বারণ করে দিয়েছি, কেউ ওর কাছে ভূতের কথা বলতে সাহস করে না। আর তুমি বুঝি মাসি হয়ে ওর এই উপকার করতে বসেছ। কেন বিধু, আমার বাছা তোমার কী অপরাধ করেছে। ওকে তুমি দুটি চক্ষে দেখতে পার না, তা আমি বেশ বুঝেছি। আমি বরাবর তোমার ছেলেকে পেটের ছেলের মতো মানুষ করলেম, আর তুমি বুঝি আজ তারই শোধ নিতে এসেছ।
বিধু। (সরোদনে) দিদি, এমন কথা বোলো না। আমার কাছে আমার সতীশ আর তোমার হরেনে প্রভেদ কী আছে।
হরেন। মা, দাদা আমাকে মেরেছে।
বিধু। ছি ছি খোকা, মিথ্যা বলতে নেই। দাদা তোর এখানে ছিলই না তা মারবে কী করে।
হরেন। বাঃ, দাদা যে এইখানে বসে চিঠি লিখছিল— তাতে ছিল ভয়ে আকার ভা, ল, ভাল, বয়ে আকার সয়ে আকার, ভালোবাসা। মা, তুমি আমার জন্যে দাদাকে লজঞ্জুস আনতে বলেছিলে, দাদা সেই টাকায় ফুলের তোড়া কিনে এনেছে— তাতেই আমি একটু হাত দিয়েছিলেম বলেই অমনি আমাকে মেরেছে।
সুকুমারী । তোমরা মায়ে পোয়ে মিলে আমার ছেলের সঙ্গে লেগেছ বুঝি। ওকে তোমাদের সহ্য হচ্ছে না । ও গেলেই তোমরা বাঁচ । আমি তাই বলি, খোকা রোজ ডাক্তার-ক’বরাজের বোতল বোতল ওষুধ গিলছে , তবু দিন দিন এমন রোগা হচ্ছে কেন । ব্যাপারখানা আজ বোঝা গেল।
