যতীন কুড়ানির পাশে বসিয়া তাহাকে অল্প অল্প গরম দুধ খাওয়াইয়া দিতে লাগিল । খাইতে খাইতে অনেকক্ষণ পরে সে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া চোখ মেলিল । যতীনের মুখের দিকে চাহিয়া তাহাকে সুদূর স্বপ্নের মতো যেন মনে করিয়া লইতে চেষ্টা করিল । যতীন যখন তাহার কপালে হাত রাখিয়া একটুখানি নাড়া দিয়া কহিল “ কুড়ানি ” তখন তাহার অজ্ঞানের শেষ ঘোরটুকু হঠাৎ ভাঙিয়া গেল — যতীনকে সে চিনিল এবং তখনই তাহার চোখের উপরে বাষ্পকোমল আর-একটি মোহের আবরণ পড়িল । প্রথম-মেঘ সমাগমে সুগম্ভীর আষাঢ়ের আকাশের মতো কুড়ানির কালো চোখদুটির উপর একটি যেন সুদূরব্যাপী সজলস্নিগ্ধতা ঘনাইয়া আসিল ।
যতীন সকরুণ যত্নের সহিত কহিল , “ কুড়ানি , এই দুধটুকু শেষ করিয়া ফেলো । ”
কুড়ানি একটু উঠিয়া বসিয়া পেয়ালার উপর হইতে যতীনের মুখে স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়া সেই দুধটুকু ধীরে ধীরে খাইয়া ফেলিল ।
হাসপাতালের ডাক্তার একটিমাত্র রোগীর পাশে সমস্তক্ষণ বসিয়া থাকিলে কাজও চলে না , দেখিতেও ভালো হয় না । অন্যত্র কতর্ব্য সারিবার জন্য যতীন যখন উঠিল তখন ভয়ে ও নৈরাশ্যে কুড়ানির চোখদুটি ব্যাকুল হইয়া পড়িল । যতীন তাহার হাত ধরিয়া তাহাকে আশ্বাস দিয়া কহিল , “ আমি আবার এখনই আসিব, কুড়ানি , তোমার কোনো ভয় নাই । ”
যতীন কর্তৃপক্ষদিগকে জানাইল যে , এই নূতন-আনীত রোগিনীর প্লেগ হয় নাই , সে না খাইয়া দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে । এখানে অন্য প্লেগরোগীর সঙ্গে থাকিলে তাহার পক্ষে বিপদ ঘটিতে পারে ।
বিশেষ চেষ্টা করিয়া যতীন কুড়ানিকে অন্যত্র লইয়া যাইবার অনুমতি লাভ করিল এবং নিজের বাসায় লইয়া গেল । পটলকে সমস্ত খবর দিয়া একখানি চিঠিও লিখিয়া দিল ।
সেইদিন সন্ধ্যার সময় রোগী এবং চিকিৎক ছাড়া ঘরে আর কেহ ছিল না । শিয়রের কাছে রঙিন কাগজের আবরণে ঘেরা একটি কেরোসিন ল্যাম্প্ ছায়াচ্ছন্ন মৃদু আলোক বিকীর্ণ করিতেছিল ব্র্যাকেটের উপরে একটা ঘড়ি নিস্তব্ধ ঘরে টিক্টিক্ শব্দে দোলক দোলাইতেছিল ।
যতীন কুড়ানির কপালে হাত দিয়া কহিল , “ তুমি কেমন বোধ করিতেছ , কুড়ানি । ”
কুড়ানি তাহার কোনো উত্তর না করিয়া যতীনের হাতটি আপনার কপালেই চাপিয়া রাখিয়া দিল ।
যতীন আবার জিজ্ঞাসা করিল, “ ভালো বোধ হইতেছে ? ”
কুড়ানি একটুখানি চোখ বুজিয়া কহিল, “ হাঁ। ”
যতীন আবার জিজ্ঞাসা করিল , “ তোমার গলায় এটা কী কুড়ানি । ”
কুড়ানি তাড়াতাড়ি কাপড়টা টানিয়া তাহা ঢাকিবার চেষ্টা করিল । যতীন দেখিল সে একগাছি শুকনো বকুলের মালা । তখন তাহার মনে পড়িল , সে মালাটা কী । ঘড়ির টিক্টিক্ শব্দের মধ্যে যতীন চুপ করিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিল । কুড়ানির এই প্রথম লুকাইবার চেষ্টা- নিজের হৃদয়ের ভাব গোপন করিবার এই তাহার প্রথম প্রয়াস । কুড়ানি মৃগশিশু ছিল , সে কখন হৃদয়ভারাতুর যুবতী নারী হইয়া উঠিল । কোন্ রৌদ্রের আলোকে , কোন্ রৌদ্রের উত্তাপে তাহার বুদ্ধির উপরকার সমস্ত কুয়াশা কাটিয়া গিয়া তাহার লজ্জা , তাহার শঙ্কা , তাহার বেদনা এমন হঠাৎ প্রকাশিত হইয়া পড়িল ।
রাত্রি দুটা-আড়াইটার সময় যতীন চৌকিতে বসিয়াই ঘুমাইয়া পড়িয়াছে । হঠাৎ দ্বার খোলার শব্দে চমকিয়া উঠিয়া দেখিল , পটল এবং হরকুমারবাবু এক বড়ো ব্যাগ হাতে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিলেন ।
হরকুমার কহিলেন , “ তোমার চিঠি পাইয়া কাল সকালে আসিব বলিয়া বিছানায় শুইলাম । অর্ধেক রাত্রে পটল কহিল , ‘ ওগো , কাল সকালে গেলে কুড়ানিকে দেখিতে পাইব না — আমাকে এখনই যাইতে হইবে । ‘ পটলকে কিছুতেই বুঝাইয়া রাখা গেল না, তখনই একটা গাড়ি করিয়া বাহির হইয়া পড়িয়াছি । ”
পটল হরকুমারকে কহিল , “ চলো , তুমি যতীনের বিছানায় শোবে চলো । ”
হরকুমার ঈষৎ আপত্তির আড়ম্বর করিয়া যতীনের ঘরে গিয়া শুইয়া পড়িলেন , তাঁহার নিদ্রা যাইতেও দেরি হইল না ।
পটল ফিরিয়া আসিয়া যতীনকে ঘরের এক কোণে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল , “ আশা আছে ? ”
যতীন কুড়ানির কাছে আসিয়া তাহার নাড়ি দেখিয়া মাথা নাড়িয়া ইঙ্গিতে জানাইল যে , আশা নাই ।
পটল কুড়ানির কাছে আপনাকে প্রকাশ না করিয়া যতীনকে আড়ালে লইয়া কহিল , “ যতীন , সত্য বলো , তুমি কি কুড়ানিকে ভালোবাস না । ”
যতীন পটলকে কোনো উত্তর না দিয়া কুড়ানির বিছানার পাশে আসিয়া বসিল । তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া নাড়া দিয়া কহিল , “ কুড়ানি , কুড়ানি । ”
কুড়ানি চোখ মেলিয়া মুখে একটি শান্ত মধুর হাসির আভাসমাত্র আনিয়া কহিল , “ কী , দাদাবাবু । ”
যতীন কহিল , “ কুড়ানি, তোমার এই মালাটি আমার গলায় পরাইয়া দাও । ”
কুড়ানি অনিমেষ অবুঝ চোখে যতীনের মুখের দিকে তাকাইয়া রহিল ।
যতীন কহিল , “ তোমার মালা আমাকে দিবে না ? ”
যতীনের এই আদরের প্রশ্নটুকু পাইয়া কুড়ানির মনে পূর্বকৃত অনাদরের একটুখানি অভিমান জাগিয়া উঠিল । সে কহিল , “ কী হবে , দাদাবাবু । ”
যতীন দুই হাতে তাহার হাত লইয়া কহিল , “ আমি তোমাকে ভালোবাসি , কুড়ানি । ”
শুনিয়া ক্ষণকালের জন্য কুড়ানি স্তব্ধ রহিল ; তাহার পরে তাহার দুই চক্ষু দিয়া অজস্র জল পড়িতে লাগিল । যতীন বিছানার পাশে নামিয়া হাঁটু গাড়িয়া বসিল , কুড়ানির হাতের কাছে মাথা নত করিয়া রাখিল । কুড়ানি গলা হইতে মালা খুলিয়া যতীনের গলায় পরাইয়া দিল ।
তখন পটল তাহার কাছে আসিয়া ডাকিল , “ কুড়ানি । ”
