কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো ,
আকুল করিল মোর প্রাণ ।
এখন বয়স হইয়াছে এবং ওকালতি ছাড়িয়া মুন্সেফি-লাভের জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠিয়াছি , তবু হৃদয়ের মধ্যে ঐ নামটি পুরাতন বেহালার আওয়াজের মতো আরো বেশি মোলায়েম হইয়া বাজিতেছে ।
প্রথম বয়সের প্রথম প্রেম অনেকগুলি ছোটোখাটো বাধার দ্বারা মধুর । লজ্জার বাধা , ঘরের লোকের বাধা , অনভিজ্ঞতার বাধা- এইগুলির অন্তরাল হইতে প্রথম পরিচয়ের যে আভাস দিতে থাকে তাহা ভোরের আলোর মতো রঙিন- তাহা মধ্যাহ্নের মতো সুস্পষ্ট , অনাবৃত এবং বর্ণচ্ছটাবিহীন নহে ।
আমাদের সেই নবীন পরিচয়ের মাঝখানে বাবা বিন্ধ্যগিরির মতো দাঁড়াইলেন । তিনি আমাকে হস্টেলে নির্বাসিত করিয়া দিয়া তাঁহার বউমাকে বাংলা লেখাপড়া শিখাইতে প্রবৃত্ত হইলেন । আমার এই গল্পের শুরু হইল সেইখানে ।
শ্বশুরমশায় কেবল তাঁহার কন্যার নামকরণ করিয়াই নিশ্চেষ্ট ছিলেন না , তিনি তাহাকে শিক্ষাদানেরও প্রভূত আয়োজন করিয়াছিলেন । এমন-কি , উপক্রমণিকা তাহার মুখস্থ শেষ হইয়াছিল । মেঘনাদবধ কাব্য পড়িতে হেমবাবুর টীকা তাহার প্রয়োজন হইত না ।
হস্টেলে গিয়া তাহার পরিচয় পাইয়াছিলাম । আমি সেখানে থাকিতে নানা উপায়ে বাবাকে লুকাইয়া নববিরহতাপে অত্যন্ত উত্তপ্ত দুই-একখানা চিঠি তাহাকে পাঠাইতে আরম্ভ করিয়াছিলাম । তাহাতে কোটেশন-মার্কা না দিয়া আমাদের নব্য কবিদের কাব্য ছাঁকিয়া অনেক কবিতা ঢালিয়াছিলাম ; ভাবিয়াছিলাম — প্রণয়িনীর কেবল প্রেম আকর্ষণ করাই যথেষ্ট নহে , শ্রদ্ধাও চাই । শ্রদ্ধা পাইতে হইলে বাংলা ভাষায় যেরূপ রচনাপ্রণালীর আশ্রয় লওয়া উচিত সেটা আমার স্বভাবত আসিত না , সেইজন্য মণৌ বজ্রসমুৎকীর্ণে সূত্রস্যেবাস্তি মে গতিঃ । অর্থাৎ , অন্য জহরিরা যে-সকল মণি ছিদ্র করিয়া রাখিয়াছিলেন , আমার চিঠি তাহা সূত্রের মতো গাঁথিয়া পাঠাইত । কিন্তু, ইহার মধ্যে মণিগুলি অন্যের , কেবলমাত্র সূত্রটুকুই আমার , এ বিনয়টুকু স্পষ্ট করিয়া প্রচার করা আমি ঠিক সংগত মনে করি নাই — কালিদাসও করিতেন না , যদি সত্যই তাঁহার মণিগুলি চোরাই মাল হইত ।
চিঠির উত্তর যখন পাইলাম তাহার পর হইতে যথাস্থানে কোটেশন-মার্কা দিতে আর কার্পণ্য করি নাই । এটুকু বেশ বোঝা গেল , নববধূ বাংলাভাষাটি বেশ জানেন । তাঁহার চিঠিতে বানান-ভুল ছিল কি না তাহার উপযুক্ত বিচারক আমি নই- কিন্তু সাহিত্যবোধ ও ভাষাবোধ না থাকিলে এমন চিঠি লেখা যায় না , সেটুকু আন্দাজে বুঝিতে পারি ।
স্ত্রীর বিদ্যা দেখিয়া সৎস্বামীর যতটুকু গর্ব ও আনন্দ হওয়া উচিত তাহা আমার হয় নাই এমন কথা বলিলে আমাকে অন্যায় অপবাদ দেওয়া হইবে , কিন্তু তারই সঙ্গে একটু অন্য ভাবও ছিল । সে ভাবটুকু উচ্চদরের না হইতে পারে , কিন্তু স্বাভাবিক । মুশকিল এই যে , যে উপায়ে আমার বিদ্যার পরিচয় দিতে পারিতাম সেটা বালিকার পক্ষে দুর্গম । সে যেটুকু ইংরেজি জানে তাহাতে বার্ক্ -মেকলের ছাঁদের চিঠি তাহার উপরে চালাইতে হইলে মশা মারিতে কামান দাগা হইত — মশার কিছুই হইত না , কেবল ধোঁয়া এবং আওয়াজই সার হইত ।
আমার যে তিনটি প্রাণের বন্ধু ছিল তাহাদিগকে আমার স্ত্রীর চিঠি না দেখাইয়া থাকিতে পারিলাম না । তাহারা আশ্চর্য হইয়া কহিল , “ এমন স্ত্রী পাইয়াছ , ইহা তোমার ভাগ্য । ” অর্থ্যাৎ , ভাষান্তরে বলিতে গেলে এমন স্ত্রীর উপযুক্ত স্বামী আমি নই ।
নির্ঝরিণীর নিকট হইতে পত্রোত্তর পাইবার পূর্বেই যে কখানি চিঠি লিখিয়া ফেলিয়াছিলাম তাহাতে হৃদয়োচ্ছ্বাস যথেষ্ট ছিল , কিন্তু বানান-ভুলও নিতান্ত অল্প ছিল না । সতর্ক হইয়া লেখা যে দরকার তাহা তখন মনেও করি নাই । সতর্ক হইয়া লিখিলে বানান-ভুল হয়তো কিছু কম পড়িত , কিন্তু হৃদয়োচ্ছ্বাসটাও মারা যাইত ।
এমন অবস্থায় চিঠির মধ্যস্থতা ছাড়িয়া মোকাবিলায় প্রেমালাপই নিরাপদ । সুতরাং , বাবা আপিসে গেলেই আমাকে কালেজ পালাইতে হইত । ইহাতে আমাদের উভয় পক্ষেরই পাঠচর্চায় যে ক্ষতি হইত, আলাপচর্চায় তাহা সুদসুদ্ধ পোষণ করিয়া লইতাম । বিশ্বজগতে যে কিছুই একেবারে নষ্ট হয় না , এক আকারে যাহা ক্ষতি অন্য আকারে তাহা লাভ — বিজ্ঞানের এই তথ্য প্রেমের পরীক্ষাশালায় বারংবার যাচাই করিয়া লইয়া একেবারে নিঃসংশয় হইয়াছি ।
এমন সময়ে আমার স্ত্রীর জাঠ্তুতো বোনের বিবাহকাল উপস্থিত — আমরা তো যথানিয়মে আইবুড়োভাত দিয়া খালাস , কিন্তু আমার স্ত্রী স্নেহের আবেগে এক কবিতা রচনা করিয়া লাল কাগজে লাল কালি দিয়া লিখিয়া তাহার ভগিনীকে না পাঠাইয়া থাকিতে পারিল না । সেই রচনাটি কেমন করিয়া বাবার হস্তগত হইল । বাবা তাঁহার বধূমাতার কবিতায় রচনানৈপুণ্য, সদ্ভাবসৌন্দর্য, প্রসাদগুণ, প্রাঞ্জলতা ইত্যাদি শাস্ত্রসম্মত নানা গুণের সমাবেশ দেখিয়া অভিভূত হইয়া গেলেন । তাঁহার বৃদ্ধ বন্ধুদিগকে দেখাইলেন , তাঁহারাও তামাক টানিতে টানিতে বলিলেন , “ খাসা হইয়াছে! ” নববধূর যে রচনাশক্তি আছে এ কথা কাহারও অগোচর রহিল না । হঠাৎ এইরূপ খ্যাতিবিকাশে রচয়িত্রীর কর্ণমূল এবং কপোলদ্বয় অরুণবর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল ; অভ্যাসক্রমে তাহা বিলুপ্ত হইল । পূর্বেই বলিয়াছি , কোনো জিনিস একেবারে বিলুপ্ত হয় না — কী জানি , লজ্জার আভাটুকু তাহার কোমল কপোল ছাড়িয়া আমার কঠিন হৃদয়ের প্রচ্ছন্ন কোণে হয়তো আশ্রয় লইয়া থাকিবে ।
