ইহার একমাত্র তাৎপর্য এই যে , সজনতার সাফাইটুকু রক্ষা করিয়া নির্জনতার সুবিধাটুকু ভোগ করিতে হইলে আমার মতো নবপরিচিত লোককে নিকটে রাখা সর্বাপেক্ষা সদুপায় ; এবং কোনো বিষয়ে একান্তমনে লিপ্ত হওয়ার পক্ষে রমণীর মতো এমন সহজ ছুতা আর কিছু নাই । ইতিপূর্বে মন্মথর আচরণ যেরূপ নিরর্থক এবং সন্দেহজনক ছিল , আমাদের আগমনের পর তাহা সম্পূর্ণ লোপ হইল । কিন্তু এতটা দূরের কথা মুহূর্তের মধ্যে বিচার করিয়া দেখিতে পারে , এত বড়ো মৎলবী লোক যে আমাদের বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করিতে পারে ইহা চিন্তা করিয়া আমার হৃদয় উৎসাহে পূর্ণ হইয়া উঠিল — মন্মথ কিছু যদি মনে না করিত , তবে আমি বোধহয় তাহাকে দুই হাতে বক্ষে চাপিয়া ধরিতে পারিতাম ।
সেদিন মন্মথর সঙ্গে দেখা হইবামাত্র তাহাকে বলিলাম , “ আজ তোমাকে সন্ধ্যা সাতটার সময় হোটেলে খাওয়াইব সংকল্প করিয়াছি । ” শুনিয়া সে একটু চমকিয়া উঠিল , পরে আত্মসংবরণ করিয়া কহিল , “ ভাই , মাপ করো , আমার পাকযন্ত্রের অবস্থা আজ বড়ো শোচনীয় । ” হোটেলের খানায় মন্মথর কখনো কোনো কারণে অনভিরুচি দেখি নাই , আজ তাহার অন্তরিন্দ্রিয় নিশ্চয়ই নিতান্তই দুরূহ অবস্থায় উপনীত হইয়াছে ।
সেদিন সন্ধ্যার পূর্বভাগে আমার বাসায় থাকিবার কথা ছিল না । কিন্তু আমি সেদিন গায়ে পড়িয়া নানা কথা পাড়িয়া বৈকালের দিকে কিছুতেই আর উঠিবার গা করিলাম না । মন্মথ মনে মনে অস্থির হইয়া উঠিতে লাগিল , আমার সকল মতের সঙ্গেই সে সম্পূর্ণ সম্মতি প্রকাশ করিল , কোনো তর্কের কিছুমাত্র প্রতিবাদ করিল না । অবশেষে ঘড়ির দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া ব্যাকুলচিত্তে উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল , “ হরিমতিকে আজ আনিতে যাইবে না ?” আমি সচকিত ভাবে কহিলাম “ হ্যাঁ হ্যাঁ সে কথা ভুলিয়া গিয়াছিলাম । তুমি ভাই আহারাদি প্রস্তুত করিয়া রাখো , আমি ঠিক সাড়ে দশটা রাত্রে তাহাকে এখানে আনিয়া উপস্থিত করিব । ” এই বলিয়া চলিয়া গেলাম ।
আনন্দের নেশা আমার সর্বশরীরের রক্তের মধ্যে সঞ্চরণ করিতে লাগিল । সন্ধ্যা সাত ঘটিকার প্রতি মন্মথের যেপ্রকার ঔৎসুক্য দেখিলাম আমার ঔৎসুক্য তদপেক্ষা অল্প ছিল না, আমি আমাদের বাসার অনতিদূরে প্রচ্ছন্ন থাকিয়া প্রেয়সীসমাগমোৎকণ্ঠিত প্রণয়ীর ন্যায় মুহুর্মুহু ঘড়ি দেখিতে লাগিলাম । গোধূলির অন্ধকার ঘনীভূত হইয়া যখন রাজপথে গ্যাস জ্বালিবার সময় হইল এমনসময় একটি রূদ্ধদ্বার পাল্কি আমাদের বাসার মধ্যে প্রবেশ করিল । ঐ আচ্ছন্ন পাল্কিটির মধ্যে একটি অশ্রুসিক্ত অবগুণ্ঠিত পাপ , একটি মূর্তিমতী ট্র্যাজেডি কলেজের ছাত্রনিবাসের মধ্যে গুটিকতক উড়ে বেহারার স্কন্ধে চাপিয়া সমুচ্চ হাঁই-হুঁই শব্দে অত্যন্ত অনায়াসে সহজভাবে প্রবেশ করিতেছে কল্পনা করিয়া আমার সর্বশরীরে অপূর্ব পুলকসঞ্চার হইল ।
আমি আর বিলম্ব করিতে পারিলাম না । অনতিকাল পরে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বাহিয়া দোতলায় উঠিলাম । ইচ্ছা ছিল , গোপনে লুকাইয়া দেখিয়া-শুনিয়া লইব , কিন্তু তাহা ঘটিল না ; কারণ সিঁড়ির সম্মুখবর্তী ঘরেই সিঁড়ির দিকে মুখ করিয়া মন্মথ বসিয়াছিল , এবং গৃহের অপর প্রান্তে বিপরীতমুখে একটি অবগুণ্ঠিতা নারী বসিয়া মৃদুস্বরে কথা কহিতেছিল । যখন দেখিলাম মন্মথ আমাকে দেখিতে পাইয়াছে , তখন দ্রুত ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়াই বলিলাম ,
“ ভাই , আমার ঘড়িটা ঘরে ফেলিয়া আসিয়াছি , তাই লইতে আসিলাম । ” মন্মথ এমনি অভিভূত হইয়া পড়িল যে , বোধ হইল যেন তখনি সে মাটিতে পড়িয়া যাইবে । আমি কৌতুক এবং আনন্দে নিরতিশয় ব্যগ্র হইয়া উঠিলাম, বলিলাম , “ ভাই , তোমার অসুখ করিয়াছে না কি । ” সে কোনো উত্তর দিতে পারিল না । তখন সেই কাষ্ঠপুত্তলিকাবৎ আড়ষ্ট অবগুণ্ঠিত নারীর দিকে ফিরিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম , “ আপনি মন্মথর কে হন । ” কোনো উত্তর পাইলাম না , কিন্তু দেখিলাম , তিনি মন্মথর কেহই হন না , আমারই স্ত্রী হন। তাহার পর কী হইল সকলে জানেন ।
এই আমার ডিটেক্টিভ-পদের প্রথম চোর ধরা ।
আমি কিয়ৎক্ষণ পরে ডিটেক্টিভ মহিমচন্দ্রকে কহিলাম , “ মন্মথর সহিত তোমার স্ত্রীর সম্বন্ধ সমাজবিরুদ্ধ না হইতেও পারে । ”
মহিম কহিল , “ না হইবারই সম্ভব । আমার স্ত্রীর বাক্স হইতে মন্মথর এই চিঠিখানি পাওয়া গেছে । ” বলিয়া একখানি চিঠি আমার হাতে দিল ; সেখানি নিম্নে প্রকাশিত হইল। —
সুচরিতাসু ,
হতভাগ্য মন্মথর কথা তুমি বোধকরি এতদিনে ভুলিয়া গিয়াছ । বাল্যকালে যখন কাজিবাড়ির মাতুলালয়ে যাইতাম , তখন সর্বদাই সেখান হইতে তোমাদের বাড়ি গিয়া তোমার সহিত অনেক খেলা করিয়াছি । আমাদের সে খেলাঘর এবং সে খেলার সম্পর্ক ভাঙিয়া গেছে । তুমি জান কি না বলিতে পারি না , একসময় ধৈর্যের বাঁধ ভাঙিয়া এবং লজ্জার মাথা খাইয়া তোমার সহিত আমার বিবাহের সম্বন্ধ-চেষ্টাও করিয়াছিলাম , কিন্তু আমাদের বয়স প্রায় এক বলিয়া উভয় পক্ষেরই কর্তারা কোনোক্রমে রাজি হইলেন না ।
তাহার পর তোমার বিবাহ হইয়া গেলে চার-পাঁচ বৎসর তোমার আর কোনো সন্ধান পাই নাই । আজ পাঁচ মাস হইল তোমার স্বামী কলিকাতার পুলিসের কর্ম লইয়া শহরে বদলি হইয়াছেন , খবর পাইয়া আমি তোমাদের বাসা সন্ধান করিয়া বাহির করিয়াছি ।
তোমার সহিত সাক্ষাতের দুরাশা আমার নাই এবং অন্তর্যামী জানেন , তোমার গার্হস্থ্যসুখের মধ্যে উপদ্রবের মতো প্রবেশলাভ করিবার দুরভিসন্ধিও আমি রাখি না । সন্ধ্যার সময় তোমাদের বাসার সম্মুখবর্তী একটি গ্যাস্ পোস্টের তলে আমি সূর্যোপাসকের ন্যায় দাঁড়াইয়া থাকি , তুমি ঠিক সাড়ে সাতটার সময় একটি প্রজ্বলিত কেরোসিন ল্যাম্প্ লইয়া প্রত্যহ নিয়মিত তোমাদের দোতলার দক্ষিণদিকের ঘরের কাঁচের জানলাটির সম্মুখে স্থাপন কর ; সেইসময় মুহূর্তকালের জন্য তোমার দীপালোকিত প্রতিমাখানি আমার দৃষ্টিপথে উদ্ভাসিত হইয়া উঠে , তোমার সম্বন্ধে আমার এই একটিমাত্র অপরাধ ।
