ছোটাচ্চু বলল, “কী আনব?”
“এই তো, চকোলেট না-হলে আইসক্রিম না-হলে কেক–”
আরেকজন বলল, “না-হলে পিজ্জা, না-হলে ফ্রায়েড চিকেন”
আরেকজন বলল, “না-হলে কাচ্চি বিরিয়ানি, না-হলে জালি কাবাব–”
আরেকজন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ছোটাচ্চু তখন ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়ে বলল, “চুপ কর দেখি। তোদের হয়েছেটা কী? সারাক্ষণ শুধু খাই খাই করিস? মাত্র কালকেই এত বড় একটা চকোলেট কেক আনলাম–”
শান্ত বলল, “মোটেই এত বড় না ছোটাচ্চু, আমি মাত্র চার স্লাইস খেয়েছি!”
একজন চোখ কপালে তুলে বলল, “চার স্লাইস!”
তখন বাচ্চারা কে বেশি সুইস খেয়েছে কে কম সুইস খেয়েছে সেটা নিয়ে নিজেরা নিজেরা ঝগড়া-ঝাটি করতে লাগল। ছোটাচ্চু একটা চেয়ার টেনে দাদির পাশে বসে অন্যমনস্কভাবে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে রইল। বোঝা যাচ্ছিল ছোটাচ্চু টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও সেখানে কী দেখাচ্ছে সেটা দেখছে না। কিছু একটা চিন্তা করছে।
ছোটাচ্চু হঠাৎ করে মাথা তুলে টুনির দিকে তাকিয়ে বলল, “এই টুনি।”
রাজাকার-মুক্তিযোদ্ধা খেলায় টুনি এই মাত্র সেক্টর কমান্ডার হয়েছে, কাজেই সে অন্য কমান্ডারদের কাকে কী করতে অর্ডার দিবে চিন্তা করতে করতে ছোটাচ্চুর দিকে তাকাল।
ছোটাচ্চু বলল, “তুই আমার সাথে একটু দেখা করবি। আমার ঘরে।”
কথাটা এমন কিছু ভয়ানক কথা নয়, কিন্তু কী হলো কে জানে, হঠাৎ করে সব বাচ্চা খেলা বন্ধ করে ছোটাচ্চুর দিকে তাকাল। শুধু যে তাকাল তা নয়, কঠিন চোখে আগুন ছড়িয়ে তাকাল।
ছোটাচ্চু থতমত খেয়ে বলল, “কী হয়েছে? তোরা এভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছিস কেন?”
একজন বলল, “তুমি শুধু টুনির সাথে কথা বলতে চাও কেন?”
আরেকজন বলল, “আমাদের পছন্দ হয় না?”
আরেকজন বলল, “তুমি টুনিকে যেটা বলতে চাও সেইটা আমাদেরকেও বলতে হবে।”
সবাই তখন একসাথে চিৎকার করে বলল, “বলতেই হবে। বলতেই হবে।”
ঠিক তখন টেলিভিশনে একজন সাজুগুজু করে থাকা মহিলা খুবই কাঁদো কাঁদো গলায় আরেকজন ত্যালতেলে চেহারার মানুষকে কিছু একটা বলছিল, বাচ্চাদের চিৎকারের জন্যে দাদি সেটা শুনতে পেলেন না। দাদি (কিংবা নানি) খুবই বিরক্ত হয়ে বললেন, “এই! তোরা চিৎকার থামাবি? তোদের জ্বালায় শান্তিমতো একটা নাটক পর্যন্ত দেখতে পারি না।”
বাচ্চারা হয় দাদির কথা শুনল না কিংবা শুনলেও তাঁর কথায় কোনো গুরুত্ব দিল না। আরো জোরে চিৎকার করে বলল, “বলতে হবে। আমাদের সবাইকে বলতে হবে। এক্ষুনি বলতে হবে।”
দাদি আরো গলা উঁচিয়ে বললেন, “ভাগ এখান থেকে। দূর হ সবগুলো।”
সবাই তখন উঠে ছোটাচ্চুকে ধরে রীতিমতো টেনে টেনে তার ঘরে নিয়ে যেতে শুরু করল। শুধু টুনি সেই টানাটানিতে যোগ দিল না। সবার পিছনে পিছনে শান্ত মুখে হেঁটে হেঁটে ছোটাচ্চুর ঘরে গেল।
ছোটাচ্চুর ঘরে গিয়ে বাচ্চারা ছোটাচ্চুকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে তার চেয়ারে বসিয়ে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে বলল, “বলো এখন, তুমি টুনিকে কী বলতে চাইছিলে। বলো।”
ছোটাচ্চু থতমত খেয়ে বলল, “আরে! তোরা কী পাগল হয়ে গেলি নাকি? সব কথা সবাইকে বলতে হবে? আমি কি আলাদা করে টুনির সাথে একটু কথা বলতে পারব না?”
সবাই চিৎকার করে বলল, “না, পারবে না।”
“কী মুশকিল! তোদের যন্ত্রণায় আমাকে পাগল হয়ে যেতে হবে।”
একজন বলল, “তোমাকে পাগল হতে হবে না ছোটাচ্চু, তুমি আগে থেকে পাগল।”
ছোটাচ্চু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তখন টুনি এগিয়ে এসে বলল, “ছোটাচ্চু–”
বাচ্চারা টুনির কথা শোনার জন্যে চেঁচামেচি থামিয়ে চুপ করল। টুনি বলল, “ছোটাচ্চু, তুমি আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির সি.ই.ও. হতে পারো কিন্তু তোমার মাথায় বুদ্ধি খুব বেশি নাই।”
ছোটাচ্চু চোখ পাকিয়ে বলল, “কী বললি তুই?”
“তুমি যদি শুধু আমার সাথে কথা বলতে চাও তাহলে সেটা গোপনে শুধু আমাকে বলতে হবে। সবার সামনে বললে হবে না। এখন দেরি হয়ে গেছে, সবাই জেনে গেছে, এখন যেটা বলতে চাও সেটা তোমাকে সবার সামনেই বলতে হবে। বলো, কী বলতে চাও।”
ছোটাচ্চু গরম হয়ে বলল, “যা ভাগ এখান থেকে। আমার কাউকেই আর কিছু বলতে হবে না।”
টুনি শান্ত গলায় বলল, “বলে ফেলো ছোটাচ্চু। এই বাসায় কোনো কিছু গোপন নাই, আমরা সবাই সবার সব কিছু জানি।”
ছোটাচ্চু কিছুক্ষণ গজগজ করল, তারপর বলল, “ঠিক আছে, বলছি।”
সবাই আরেকটু এগিয়ে এসে ছোটাচ্চুকে ঘিরে দাঁড়াল। ছোটাচ্চু একটু গলা পরিষ্কার করে বলল, “ফারিয়া একটা প্রজেক্ট করছে, সেটা ছেলে মেয়েদের বিজ্ঞান এবং গণিত-ভীতি নিয়ে। ফারিয়া সে জন্যে কয়েকটা স্কুলে একটা জরিপ চালাতে চায়, সেই জন্যে বলেছে টুনির সাথে একটু কথা বলবে।”
বাচ্চারা ছোটাচ্চুর কথা শুনে খুবই হতাশ হলো, একজন বলল, “এই কথা? এই রকম ফালতু একটা কথা বলার জন্যে তুমি এ রকম ঢং করেছিলে? ছোটাচ্চু, টুনি ঠিকই বলেছে, তোমার মাথায় কোনো বুদ্ধি নাই।”
আরেকজন বলল, “আয় যাই। রাজাকারের খেলাটা শেষ করি।”
শুধু টুনি বলল, “থ্যাংকু ছোটাচ্চু। তুমি ফারিয়াপুর সাথে আমাকে কথা বলিয়ে দিও। আমি ফারিয়াপুকে আমাদের স্কুলে নিয়ে যাব।”
ছোটাচ্চু শুকনো মুখে বলল, “ঠিক আছে।”
বাচ্চারা সবাই তখন বসার ঘরে ফিরে গেল রাজাকার-মুক্তিযোদ্ধা খেলার জন্যে। চিৎকার, চেঁচামেচি, হইচইয়ের মাঝখানে একসময় যে টুনি খেলা থেকে উঠে এলো সেটা কেউ লক্ষ করল না।
