‘আপনার মত ভদ্রলোক কি এখানে থাকতে পারবেন? আমরা যে বড্ড গরিব।’
চানু আর চুপ থাকতে পারল না, ‘বাবা, তুমি কি তোমার ছেলেকেও চিনতে পারছ না?’
চানুর মা-বাবা খানিকক্ষণ অবাক হয়ে রইল, তারপর চানুকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘এমন সুন্দর পোশাক তুমি কোয়ায় পেলে বাবা?’
চানুঃ ‘পোশাক দেখেই অবাক হয়ে গেলে, তা হলে এই টাকাগুলো দেখে কি করবে?’ এই বলে চানু পকেট খালি করে সব মোহর টেবিলের উপর রাখল।
এতগুলো মোহর দেখে চানুর বাবার বড্ড ভয় হল। চানু তখন সব কথা খুলে বলল। তার আশ্চর্য বুদ্ধির কথা শুনে চানুর মা-বাপের আনন্দ আর ধরে না।
পরের দিন সকালে চানু বাবাকে বলল, ‘বাবা, যাও জমিদারবাড়ি। বলো গিয়ে, আমি তাঁর মেয়েকে বিয়ে করতে চাই।’
চানুর কথা শুনে তার বাবার চোখ বড় হয়ে গেল, ‘বলিস কিরে বেটা! তা হলে যে আমার পিছনে কুকুর লেলিয়ে দেবে।’
‘না! তুমি বোলো যে আমি সর্দার চোর, আমার মত ঝানু চোর দুনিয়ায় নেই, জবরদস্ত ও ওস্তাদ চোরদের ফাঁকি দিয়ে লাখ টাকা রোজগার করে এনেছি। দেখো বাবা, যখন দেখবে জমিদারের মেয়েও সেখানে আছে, তখনই এ-সব কথা বোলো।’
‘আচ্ছা, এত করে যখন বলছ, যাচ্ছি। কিন্তু কিছু হবে বলে মনে হয় না।’ প্রায় দুই ঘণ্টা পরে চানুর বাবা ফিরে এল। চানু বলল, ‘কি করে এলে, বাবা?’
‘নেহাত মন্দ নয়। মেয়েটি যে বড় অনিচ্ছুক, তা ত মনে হল না। বোধ করি বাবাজি তুমি এর আগেও তার কাছে এ প্রস্তাবটি করেছ-না? যা হোক, জমিদার বললেন, আসছে রবিবারে তাঁরা বাকি একটি হাঁস ভেজে খাবেন। তুমি যদি কড়া থেকে হাঁসটা বে-মালুম চুরি করতে পার, তা হলে তিনি তোমার কথা ভেবে দেখবেন।’
‘এ আর তেমন শক্ত কাজ কি? দেখা যাবে এখন।’
রবিবার দিন জমিদার এবং বাড়ির সকলে রান্নাঘরে রয়েছেন। হাঁস ভাজা হচ্ছে, এমন সময় রান্নাঘরের দরজা কুলে গেল। একটা অতি কুৎসিত বুড়ো ভিখারি, পিঠে তার একটা মস্তবড় থলে ঝুলছে, সে এসে রান্নাঘরের দরজায় উঁকি মেরে বলল, ‘জয় হোক বাবা! আপনাদের খেয়ে-দেয়ে কিছু থাকলে আমি বুড়ো ভিখারি কিছু খেতে পাব কি?’
জমিদারমশায় বললেন, ‘অবশ্যি পাবে। রান্নাঘরের দাওয়ায় একটু বোসো।’
জানালার পাশে একজন লোক বসেছিল। খানিক পরে সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘আরে, মস্তবড় একটা খরগোশ ছুটে বাগানের দিকে যাচ্ছে-এটাকে মারলে হয় না?’
জমিদার ধমক দিয়ে বললেন, ‘খরগোশ মারবার ঢের সময় মিলবে, এখন চুপ করে বসে থাকো।’ খরগোশটা বাগানে গিয়ে ঢুকল। ভিখারি পোশাক- পরা চানু থলের থেকে আর-একটা খরগোশ ছেড়ে দিল। একটু পরেই চাকর আবার চেঁচিয়ে উঠল, ‘বাবু বাবু, খরগোশটা এখনো রয়েছে- এখনো চেষ্টা করলে মারা যায়।’
আবার জমিদার ধমক দিলেন, ‘চুপ করে থাকো বলছি।’
খানিক বাদে চানু আরো একটা খরগোশ থলে থেকে বের করে ছেড়ে দিল। চাকরও চেঁচিয়ে উঠল-আর যায় কোথা! একজন একজন করে সবকটি চাকর রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে খরগোশের পেছনে তাড়া করল, জমিদারমশায়ও বাদ পড়লেন না।
খরগোশ তাড়িয়ে সকলে ফিরে এসে দেখে, ভিখারিও নেই, কড়ার মধ্যে হাঁসও নেই। জমিদারমশাই বললেন, ‘আচ্ছা ফাঁকিটা দিয়েছে চানু, সত্যি সত্যি আমাকে জব্দ করেছে।’
একটু পরেই চানুদের বাড়ি থেকে একজন চাকর এসে জমিদারমশায়কে বলল, ‘আজ্ঞে, আমার মনিব বলে পাঠিয়েছেন, আপনারা অনুগ্রহ করে আমাদের বাড়ি গিয়ে খাবেন।’
জমিদার বড় চমৎকার সাদাসিধে লোক ছিলেন, মনে একটুও অহংকার ছিল না। স্ত্রীকে ও মেয়েকে নিয়ে চানুদের বাড়ি গেলেন। চানুর চালাকির কথা বলে জমিদারমশায় হাসতে হাসতে পাঁজরে ব্যথা ধরিয়ে ফেললেন। মেয়েটি ত আগে থেকেই চানুকে পছন্দ করত, এখন তার পোশাক দেখে এবং তার আদব-কায়দা দেখে মনে মনে আরো খুশি হল।
খাওয়া-দাওয়ার পর জমিদার বললেন, ‘চানু, শুধু হাঁস চুরি করেই আমার মেয়ে পাবে না। কাল রাত্রে আমার আস্তাবল থেকে আমার ছয়টি ঘোড়া যদি চুরি করতে পার, তা হলে দেখা যাবে এখন। ছ’জন সহিস কিন্তু ছয়টি ঘোড়ার পিঠে চড়ে পাহারা দেবে মনে রেখো।’
চানু বললে ‘আচ্ছা, চেষ্টা করে দেখব এখন।’
সোমবার রাত্রে জমিদারের আস্তাবলে ছয়জন সহিস ছয়টি ঘোড়ার পিঠে বসে আছে। বেজায় ঠাণ্ডা, রক্ত যেন জমে যেতে চায়। তাই প্রত্যেকের জামার পকেটে একটি করে মদের বোতল, খানিক পরে পরে একটু করে মদ খেয়ে গা গরম করে নিচ্ছে। ঘুমিয়ে পড়লে চলবে না, তাই সকলে মিলে মহা গল্প জুড়ে দিল। চানুর জন্য আস্তাবলের দরজা খোলাই রেখেছিল। রাত যত বেশি হতে লাগল, ঠাণ্ডাটাও যেন বাড়তে লাগল। মদে আর শানায় না, গায়ে কাঁপুনি ধরে গেল। এমন সময় ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে একটা কদাকার বুড়ি এরে উকি মেরে বলল, ‘বাবা সকল, শীতে জমে গেলাম, একমুঠো খড় দাও ত, আস্তাবলের এককোণে রাতটা পড়ে থাকি। তা না হলে বুড়ো মানুষ-শীতে মরেই যাব। ‘বুড়ির পিঠে ছয়টা থলে, মুখে প্রায় দু আঙ্গুল লম্বা দাড়ি-চেহারাটি কুৎসিতের একশেষ!
বুড়ি আস্তাবলের দরজার উঁকি মেরে বলল, ‘লক্ষ্মী বাপ আমার, বুড়ো মানুষ শীতে মরে গেলাম, ঐ কোণটাতে একটু জায়গা দাও, একমুঠো খড়া নিয়ে পড়ে থাকব এখন।’
সহিসরা ভাবল, ‘এলই বা বুড়ি, বেচারি শীতে জমাট বেঁধে গেল, ও ত আর কোনো অনিষ্ট করবে না।’ আস্তাবলের কোণে খড় পেতে বুড়ি বেশ আরামে বসল। সহিসরা দেখল, বুড়ি খানিক পরিই একটা কালো বোতল বের করে একটু মদ খেল। তার মুখে আর হাসি ধরে না, যেন সে খুবই আরাম বোধ করেছে। সহিসদের বুড়ি বলল, ‘বাবা, তোমাদের সব বোধ করি শেষ করে ফেলেছ, তা আমার কাছে ঢের আছে। তরে কিনা তোমরা পাছে কিছু মনে কর, তাই তোমাদের দিতে ভরসা পাচ্ছি না।’ এতে বেজায় শীত, তার উপরে সত্যি সত্যি তাদের মদ শেষ হয়ে গেছে, বুড়ির কথা শুনে সহিসরা যেন হাতে চাঁদ পেল-’ সে কি বুড়িমা, তুমি দাও তা হলে ত বেঁছে যাই। ঠাণ্ডায় মরে গেলাম।
