শওকত থতমত খেয়ে উঠে দাঁড়াল। আফতাব বললেন, আমার মেয়ে তোমাকে দুপুরে খাবার নিমন্ত্রণ করেছে?
জি স্যার!
টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে, খেতে আস। আমার মেয়ে তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে।
আফতাব সাহেব ছেলের পিঠে হাত রাখতে রাখতে বললেন, আমার মেয়েটা খুব কাঁদছে। এত কান্নার কী আছে বুঝলাম না। সে আজ জীবনের প্রথম চিংড়ি মাছ রান্না করেছে। খেয়ে দেখ তো কেমন।
আনোভা
স্যার, আমার নাম মকবুল। আমেরিকানরা মকবুল বলতে পারে না। তারা ডাকে ম্যাক। কেউ কেউ ডাকে ম্যাকবুল। শুরুর দিকে আপত্তি করতাম। বলতাম, ম্যাকবুলের চেয়ে মকবুল উচ্চারণ অনেক সহজ। খামোকা কঠিন নামে কেন ডাক? শেষের দিকে এইসব বলা ছেড়ে দিয়েছি। আমেরিকানরা নিজে যা বুঝে তাই। যুক্তির ধার ধারে না।
কাগজপত্র ছাড়া আমি আমেরিকায় তেরো বছর কাটিয়ে পশুর মতো স্বভাবের হয়ে গিয়েছিলাম। পশু যেমন মানুষকে দেখেই আতঙ্কে অস্থির হয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে, আমিও তাই করতাম। পুলিশ দেখলে বুকে এবং তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা হতো। ব্যথা মাঝে মাঝে এমন তীব্র হতো যে, বাথরুমে ঢুকে বমি করতাম।
রাতে থাকতাম কিছু মেক্সিকানদের সঙ্গে। তারা ড্রাগ নিত, তবে আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করত। তাদের জন্যে প্রতিরাতেই খিচুড়ি রাধতাম। তারা আমার খিচুড়ি ড্রাগস-এর মতোই আগ্রহ করে খেত। খিচুড়িকে তারা বলত কিচলি।
খিচুড়ি রান্না আমি দেশ থেকে শিখে আসি নি। কেউ আমাকে শেখায়ও নি। সম্পূর্ণই আমার নিজের আবিষ্কার। হাতের কাছে যা পেতাম, সবই বড় একটা হাঁড়িতে চড়িয়ে জ্বাল দিতে থাকতাম। প্রচুর ঝাল দিতাম। রান্না শেষ হবার পর ডাল বাগাড়ের মতো বাটারে বাগার দিতাম। খিচুড়ি খাবার সময় মেক্সিকান বন্ধুরা বেশির ভাগ সময় ঝালের কারণে হাঁ করে থাকত। তারপরেও নিজেদের মধ্যে মেক্সিকান ভাষায় বলাবলি করত, কিচলি জগতের শ্রেষ্ঠ খাবার।
আমি আমার এই ম্যাক্সিকান বন্ধুদের কারণেই গ্রিনকার্ড পাই। তাদের একজন আমাকে গাড়ি চালানো শেখায় এবং খোদ নিউইয়র্ক শহরে আমি ক্যাব চালাতে শুরু করি। সবই সম্ভব হয় খিচুড়ি নামক অখাদ্য এক রান্নার কারণে।
আমি ক্যাব চালাতাম রাতে। দিনে ঘুমাতাম। রাতে উলার বেশি পেতাম। ট্রাফিকও থাকত কম। তবে রাতে ক্যাব চালানোয় সমস্যাও ছিল। অনেক দুষ্টলোক যাত্রী সেজে ক্যাবে উঠত। তারপর পিস্তল দেখিয়ে টাকাপয়সা নিয়ে নিত। কয়েকজন ক্যাব চালক সন্ত্রাসীদের হাতে গুলি খেয়ে মারাও গেছে। ক্যাব। পরিচালনা সংস্থাগুলি নানান নিয়মাবলি ক্যাব চালকদের জন্যে তৈরি করেছিলেন। যাতে তাদের জানমালের ক্ষতি না হয়। যেমন–
১. ওয়াকিটকি সর্বক্ষণ খোলা রাখবে।
২. কেউ পিস্তল ধরলে তার সঙ্গে আমেন্টে যাবে না। সে যা চায় সবই দিয়ে দিবে।
৩. সন্দেহজনক কাউকে গাড়িতে তুলবে না। ভদ্রভাবে তাকে নিষেধ করবে। যেমন–গাড়ির ইজেকশন ফুয়েল আমাকে ট্রাবল দিচ্ছে, এখন তোমাকে নিতে পারছি না, সরি।
এইসব নিয়মকানুন আমি মোটেই মানতাম না। সবাইকে গাড়িতে তুলতাম। আমার তখন প্রচুর ডলার দরকার। অনেকদিন দেশে যাই না। দেশে যাব। সম্ভব হলে বিয়ে করব। মা চিঠিতে জানিয়েছেন তিনি মেয়ে দেখে রেখেছেন। মেয়ে ইন্টার পাস। গাত্রবর্ণ অত্যন্ত পরিষ্কার। নাম কমলা।
অতি লোভে একবার মহাবিপদে পড়লাম। স্যার, আপনাকে সেই গল্পটাই বলব। আপনি লেখক মানুষ, অনেকের কাছে অনেক গল্প শুনেছেন–আমি যে গল্প বলব সেটা শুনেন নাই। এখন স্যার আমাকে যদি তিন মিনিট সময় দেন, তাহলে বারান্দায় গিয়ে একটা সিগারেট খাব। আপনার সামনে সিগারেট খাওয়ার মতে বেয়াদবিটা করব না। এই গল্পটা করার সময় আমার খুব টেনশন হয়। তখন সিগারেট না খেয়ে পারি না।
ডিসেম্বর মাসের শেষ। কয়েক বছর পর সেবারই খুব বরফ পড়েছে। ক্রিসমাসে বরফ ছিল না, হোয়াইট ক্রিসমাস হয় নি। ছাব্বিশ তারিখ থেকে শুরু হলো তুষারপাত। সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া। সেই দেশে ঝড়ো হাওয়াকে বলে ব্লিজার্ড। রিজার্ডের সময় অফিস-আদালত ছুটি হয়ে যায়। জমিয়ে সবাই আড্ডা দেয়, পোকার খেলে, বিয়ার খায়। ধনী দেশ তো! তারা কষ্টটাকেও আনন্দ বানিয়ে ফেলে।
আমি ইয়েলো ক্যাব নিয়ে ঘুরি। অতিরিক্ত ভাড়া পাওয়া যায়। আমার কাছে ব্লিজার্ভ বড় ব্যাপার না। ডলার জমানো বড় ব্যাপার।
একজন লং রুটের যাত্রী পেলাম। সে যাবে নিউজার্সি। তার নাকি বিশেষ প্রয়োজন। এক্ষুনি যেতে হবে। সে বলল, ব্লিজার্ডের রাতে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি। আমি ভালো টিপস দেব।
আমি সাহেবকে নিয়ে গেলাম। ভালো টিপস পেলাম। ভাড়ার ওপর একশ ডলার। ফেরার পথে পড়লাম বিপদে। হুলস্থূল ব্রিজর্ডি শুরু হলো। এমন তুষারপাত আমি জন্মে দেখি নাই। যেন একসঙ্গে কয়েক লক্ষ বস্তা শিমুল তুলা কেউ আকাশ থেকে ছেড়ে দিচ্ছে। গাড়ি নিয়ে আগানোই মুশকিল। রাস্তার বরফ জমে কাচ হয়ে গেছে। গাড়ি সমানে স্কিড করছে। আমি সাবধানে এগুচ্ছি। হাইওয়েতে বড় বড় ট্রাক ছাড়া কোনো গাড়ি নেই। রাত তেমন হয় নি। দশটা, কিন্তু মনে হচ্ছে নিশুতি
হাইবিম দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি যাতে অনেকদূর দেখা যায়। হাইবিমে কাজ হচ্ছে না। দশ গজ সামনেও কিছু দেখা যাচ্ছে না। গাড়ির ফগ লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছি, তাতেও উনিশ-বিশ হচ্ছে না। হঠাৎ দেখলাম একটা মেয়ে রাস্তার পাশে আঙুল তুলে দাঁড়িয়ে আছে, লিফট চায়।