সদাশিব খানিকটা শান্ত হয়ে বসলেন। বললেন, “সেটাই সম্ভব। তবু বচনকে সঙ্গে নিয়ে যাও। খবরটা না পেলে আমার হার্ট ফেল হয়ে যাবে।”
নবীন বেরিয়ে এসে বচনকে আড়ালে নিয়ে বলল, “দ্যাখো, ব্যাপারটা একটু গোলমেলে ঠেকছে। তুমি যাত্রার আসরটা দেখে এসো তো! কিন্তু যদি সেখানে ওদের না দেখতে পাও, তবে কতাবাবুকে এসে সেই খবরটা দিও না। ব’লো, ওরা যাত্রা দেখছে। আমি একটু জঙ্গলটা খুঁজে আসছি।”
নবীন বাড়ি ফিরে তার টর্চ বাতিটা আর লাঠিগাছ সঙ্গে নিল। লাঠিটা বোধহয় দুশো বছরের পুরনো। শোনা যায়, এই লাঠি তার কোনও পূর্বপুরুষ ব্যবহার করতেন। প্রতিটা গাট পেতল দিয়ে বাঁধানো। মহাদেব আজও এটাকে খুব পরিচর্যা করে বলে এখনও মজবুত আর তেল-চুকচুকে আছে। গায়ের চাঁদর ছেড়ে নবীন একটা ফুলহাতা সোয়েটার আর বাঁদুরে টুপি পরে নিল। ধুতির বদলে পরল প্যান্ট। পায়ে বুট জুতো।
তার পর বেরিয়ে পড়ল।
জঙ্গলের মধ্যে স্বাভাবিক পথে ঢুকে কোনও লাভ নেই। অনেকটা ঘুরতে হবে। নবীনের একটা শর্টকাট জানা আছে। ঝিলের পশ্চিম ধার দিয়ে গেলে জঙ্গলের কালীবাড়ি কাছেই হয়।
নবীন সেই পথই ধরল। আসলে পথ বলে কিছু নেই। ঝোঁপঝাড় ভেদ করেই হাঁটতে হয়। তবে দিনের বেলা এখান দিয়ে কিছু লোক কাঠ কুড়োতে যায়। গরিবেরা আসে জঙ্গলের ফল-পাকুড় পাড়তে। দুষ্টু ছেলেদেরও আনাগোনা আছে। তাই সামান্য একটু পথের চিহ্নও আছে।
নবীন দ্রুত সেই পথ ধরে এগোতে লাগল।
তার পথ ভুল হওয়ার ভয় নেই। অল্প সময়ের মধ্যেই সে কালীবাড়ির কাছে পৌঁছে গেল। চার দিক অন্ধকারে ডুবে আছে। শেয়াল ডাকছে। ঝিঝি ডাকছে। পেঁচা ডাকছে।
নবীন চার দিকটা সতর্ক পায়ে ঘুরে দেখল। কোথাও অনু বা বিলুর কোনও চিহ্ন নেই। নবীন এই জায়গায় দিনে-দুপুরে বহু বার এসেছে। ছেলেবেলা থেকেই এই জায়গা তার চেনা। মাঝে-মধ্যে এক সাধু এসে এখানে থানা গাড়তেন। ফের কিছু দিন পর চলে যেতেন। তাঁর নাম অঘোরবাবা। লোকে বলে, অঘোরবাবা গত আড়াইশো বছর ধরে প্রতি বছর এক বার করে আসেন। ছেলেবেলায় নবীন অঘোরবাবার কাছে এসেছে। অঘোরবাবা কারও সঙ্গে কথা বলতেন না। আপন মনে খুনি ৭৬
জ্বালিয়ে চুপচাপ বসে থাকতেন চোখ বুজে। লোকে ফল-মূল চাল-ডাল দিয়ে যেত মেলাই। সবই পড়ে থাকত। মাঝে-মধ্যে হয়তো এক-আধটা ফল খেতেন।
অঘোরবাবাকে নবীন মৌনী সাধু বলেই জানত। কিন্তু এক দিন সেই ভুল ভাঙল। বছর তিনেক আগে অঘোরবাবা যখন সকালে ধ্যানে বসেছিলেন, তখন নবীন এসে প্রণাম করে সামনে বসতেই অঘোরবাবা চোখ মেলে চাইলেন।
নবীনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “এ-জায়গাটার নাম কী রে?”
নবীন ভীষণ চমকে উঠল গমগমে সেই গলা শুনে। ভয়ে-ভয়ে বলল, “ঝিলের ও-পাশটা কেটেরহাট। তবে এ-দিকটার নাম হল চাঁপাকুঞ্জ। লোকে বলে ‘চাঁপার বন’”।
অঘোরবাবা তাঁর বিপুল গোঁফদাড়ির ফাঁকে একটু হেসে বললেন, “বড্ড ফাঁকা জায়গা। ভিতরটা একেবারে খোল।
কথাটার মানে নবীন বুঝতে পারেনি। অঘোরবাবাও আর ব্যাখ্যা করেননি।
অঘোরবাবার সেই কথাটা আজ মনে পড়ল নবীনের। তা হলে কি চাঁপাকুঞ্জের তলায় মাটির নীচে কোনও গুহা আছে?
নবীন ঘুরতে ঘুরতে যাদের কাছে চলে এল। এখানেই ভুজঙ্গকে মেরে ফেলে রাখা হয়েছিল। নবীন খাদের ভিতরে নেমে চার দিক ঘুরে দেখল। কোথাও অনু-বিলুর কোনও চিহ্ন নেই।
হঠাৎ একটু শিরশিরে বাতাস বয়ে গেল, পাতায়-পাতায় শব্দ উঠল ফিসফিস। আর নবীনের গায়ে হঠাৎ কেন যেন কাঁটা দিয়ে উঠল।
তার পর নবীন সেই আশ্চর্য অশরীরী কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, “চলো দক্ষিণে..দক্ষিণে… ভারী বিপদ।”
নবীন একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু চট করে দুর্বলতা কাটিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার পর দক্ষিণ দিকে এগোতে লাগল।
চলতে চলতে চাঁপাকুঞ্জের চেনা ছক হারিয়ে গেল। সে শুনেছে, দক্ষিণের জঙ্গল গিয়ে মিশেছে সুন্দরবনে। এ-দিকটা সাঙ্ঘাতিক দুর্গম। লোকবসতি একেবারেই নেই।
“এগোও…ভয় পেয়ো না…এগিয়ে যাও।”
আবার সেই কণ্ঠস্বর।
নবীন প্রাণপণে এগোতে লাগল। ক্রমে লতাপাতা কাঁটাঝোঁপ এত ঘন হয়ে উঠল যে, চলাই যায় না।
কিন্তু সেই অশরীরীর কণ্ঠস্বর তার কানে কানে বলে দিতে লাগল, “বাঁ দিক ঘেঁষে চলো..নিচু হও…ডাইনে ঘোরো…”
নবীন ঠিক-ঠিক সেই নির্দেশ মেনে চলতে লাগল।
আশ্চর্যের বিষয়, মিনিট পনেরো হাঁটবার পর সে একটা বেশ ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে গেল। সামনে একটা বিশাল বটগাছ। তার তলাটা বাঁধানেনা।
নবীন টর্চ জ্বালল। শিশিরে-ভেজা নরম মাটিতে সে স্পষ্ট দেখতে পেল দু জোড়া কেডসের ছাপ।
“পায়ের ছাপ ধরে এগোও…কুয়োর মধ্যে…”
নবীন কণ্ঠস্বরের নির্দেশ অনুযায়ী এগোতে লাগল। টর্চের আলোয় একটু বাদেই সে দেখতে পেল, একটা ভাঙা মস্ত উঁচু ইদারার মুখ।
এই কি সেই কুখ্যাত ফাঁসিখানা? এ-অঞ্চলের লোকের মুখে-মুখে ফাঁসিখানার কথা শোনা যায় বটে। নবীন ভেবেছিল, নিতান্তই আজগুবি গল্প। কিন্তু এ তো সত্যিকারের ফাঁসির মঞ্চ বলেই মনে হচ্ছে।
নবীন সিঁড়ি বেয়ে ইদারার ধারে উঠে পড়ল। ভিতরে টর্চ ফেলে দেখল, অগাধ গহ্বর। কিন্তু তলা থেকে বিস্তর লতাপাতা উঠে এসেছে ওপরে। সরু সিঁড়িটায় টর্চের আলো ফেলল সে। অনু আর বিলু কি এই সিঁড়ি দিয়ে নেমেছে? সাহস বটে বাচ্চা দুটোর।
