আনমনে একটা হুঁ দিয়ে বিজয়বাবু দ্রুত হাঁটতে লাগলেন। কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। একটা ধন্দ-ধন্দ ভাব। প্রথম বাজারে গেলে বোধ হয় এরকমই হয়।
আলুর দোকানে শিবেন ধর উবু হয়ে বসে আলু বাছছেন দেখে বিজয়বাবুর ধড়ে প্রাণ এল। শিবেন ধর বিষয়ী লোক। ঝুপ করে তার পাশে বসে পড়ে বিজয়বাবু বললেন, “আলু নিচ্ছেন বুঝি শিবেনবাবু?”
“হ্যাঁ। তা আপনিও নেবেন বুঝি? ওই লালচে লম্বা ছাদের আলুগুলো বেছে তুলুন। ওগুলো খাঁটি নৈনিতাল। খবরদার, চার টাকার বেশি দর দেবেন না।”
বিজয়বাবুর ভারী সুবিধে হয়ে গেল। ফুলকপি কিনতে গিয়ে একটু বিভ্রাটে পড়েছিলেন। কালু মোক এগিয়ে এসে বলল, “আহা, ওগুলো নয়! গোড়ার দিকটা একটু সরু মতো দেখে নিন। ওগুলোর সোয়াদ খুব। দিশি জিনিস তো, সঙ্গে কড়াইশুটি নিতে ভুলবেন না। ওই অমর আজ টাটকা কড়াইশুটি এনেছে।”
বেশ ভালই লাগছে বাজার করতে তাঁর। বাজার-ভর্তি এত চেনা লোককে পেয়ে যাবেন তা তো আর জানতেন না!
মাছের বাজারে গিয়ে মাছের একটা টুকরো প্রায় পছন্দই করে ফেলেছিলেন। ঠিক এই সময় গোপেন বিশ্বাস কোত্থেকে উদয় হয়ে বলল, “আহা, করো কী হে বিজয়? ওটা যে শতবাসি মাছ। ওই ফুলেশ্বর টাটকা পোনা মাছটা সবে কেটেছে। যাও-যাও, সের দুই কিনে ফ্যালো গে।”
অতি সুষ্ঠুভাবেই বাজার করছেন বিজয়বাবু, কিন্তু সেই অস্বস্তিটা কিছুতেই যাচ্ছে না। বারবারই মনে হচ্ছে, একটা কীসের যেন হিসেব মিলছে না। একটা বেশ গোলমাল হচ্ছে! কিন্তু কীসের গোলমাল তা ধরতে পারছেন না।
একজন মুটের হাতে বাজারপত্র চাপিয়ে বাজার থেকে বেরোতে যাবেন, সর্বেশ্বর পণ্ডিতের সঙ্গে দেখা।
“বাজার হল বুঝি?”
“যে আজ্ঞে, পণ্ডিতমশাই।”
“তোকে একটা কথা অনেকদিন ধরে বলব-বলব করছি, বলা হয়ে উঠছে না।”
“কী কথা পণ্ডিতমশাই?”
“আহা, ওই বাইবেলটার কথা। জনসাহেবের সেই হিব্রু ভাষার বাইবেল। যদিও ম্লেচ্ছ জিনিস, তবু ওটা আগলে রাখিস। ওটার এখন অনেক দাম।”
বিজয়বাবুর মোটে খেয়ালই ছিল না। ঠিক বটে! তাঁদের বাড়িতে অনেক বইয়ের মধ্যে একটা হিব্রু ভাষার পুরনো বাইবেলও আছে বটে। শোনা যায়, জনসাহেবের নাতি বইখানা তাঁর দাদুকে দিয়েছিল।
বিজয়বাবু একটু অবাক হয়ে বললেন, “অনেক দাম?” সর্বেশ্বর বললেন, “তাই তো শুনি। ওই বাইবেলের মধ্যে নাকি গুপ্তধনের সন্ধান আছে।”
বিজয়বাবু বিস্মিত। হাঁ করে চেয়ে রইলেন।
“কিছু লোক বাইবেলটা হাত করার জন্য ঘুরঘুর করছে বাপু। একটু হুঁশিয়ার থাকি।”
“যে আজ্ঞে।” বলে চিন্তিত বিজয়বাবু বাড়িমুখো হাঁটতে-হাঁটতে ফের অস্বস্তিটা বোধ করছিলেন। কী যেন একটা গরমিল হচ্ছে। কেমন যেন একটু ধাঁধামতো ভাব হচ্ছে! অথচ পকেটমার হয়নি! বিশেষ ঠকেও যাননি। কারও সঙ্গে কথা-কাটাকাটি বা অশান্তি হয়নি। অথচ এরকম হচ্ছে কেন?
মুটে ছেলেটা তাঁর পিছু পিছু আসছিল। হঠাৎ বলল, “আচ্ছা বাবু, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“কী কথা রে?”
“আপনি একা-একা কথা বলেন কেন?”
“একা-একা কথা বলি? দূর পাগল, কখন আমাকে একা-একা কথা বলতে দেখলি?”
“আজ্ঞে, সারাক্ষণই তো আপনি বাজার করতে-করতে বেশ জোরে জোরে কথা বলছিলেন। এই যে একটু আগে বললেন, “যে আজ্ঞে পণ্ডিতমশাই। তারপর বললেন, “তাই নাকি পণ্ডিতমশাই। সবাই বলছিল বাবুটা পাগলা আছে।”
বিজয়বাবু রেগে একটা ধমক দিতে গিয়েও হঠাৎ বজ্রাহত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাই তো! সর্বেশ্বর পণ্ডিত আসবেন কোত্থেকে? তিনি তো অন্তত পাঁচ বছর আগে…। মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল বিজয়বাবুর। তাই তো! ভবেন রক্ষিত, শিবেন ধর, কালু মোক বা গোপেন বিশ্বাস কারওরই তো বেঁচে থাকার কথা নয়। এঁদের প্রত্যেকের শ্রাদ্ধে তাঁর নেমন্তন্ন ছিল।
“ভূ-ভূত! ভূ-ভূত! ভূ-ভূত!” বলে আবার হাত-পা ছড়িয়ে সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন বিজয়বাবু। লোকজন ছুটে এল। ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হল তাঁকে। এল জল, এল পাখা। ৬৮
খবর পেয়ে যতীনডাক্তারও এসে হাজির। বিজয়বাবুর প্রেশার দেখা হল, জিভ দেখা হল, চোখ দেখা হল, নাড়ি দেখা হল, বুক পরীক্ষা হল, পেট টিপে দেখা হল।
শশীমুখী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, “ভূত দেখারও তো একটা নিয়মকানুন রীতিনীতি থাকবে রে বাপু! যখন-তখন দেখলেই তো হবে না! অন্ধকার চাই, একা হওয়া চাই, নিরিবিলি জায়গা চাই! বাজার-ভর্তি একহাট লোকের মধ্যে দিনের ফটফটে আলোয়, তাও একটি-দুটি নয়, গন্ডায়-গন্ডায় ভূত দেখে নাকি কেউ? ছ্যা-হ্যাঁ, এ যে ভূতের উপর ঘেন্না ধরে গেল বাবা! ভূত যদি এমন নির্লজ্জ, আদেখলে বেহায়া হয়, তা হলে ভূতকে আর কেউ কখনও ভয় পাবে?”
মূৰ্ছনাদেবীও রাগ করে বললেন, “চারদিকে মনিষ্যিগুলোকে কখনও ওঁর নজরে পড়ে না, নজরে পড়ে কেবল ভূতেদের!”
এই কদিন আগেও বিজয়বাবু ভূতের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন। ভূত বলে যে কিছু থাকতে পারে এটা কোনও কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ কি বিশ্বাস করতে পারে? তা হলে এখন এসব কী হচ্ছে? এ কি ভূত না ভুল? তাঁর কি কাণ্ডজ্ঞান লোপ পেয়েছে? লজিক কাজ করছে না? ঘরভর্তি পাড়া-প্রতিবেশী আর বাইরের মানুষজন তাঁকে হাঁ করে দেখছে, আর নানা কথা কইছে। লজ্জায় মুখ দেখানোর জো রইল না তাঁর! চোখ বুজে মটকা মেরে পড়ে থাকা ছাড়া তাঁর আর কী-ই বা করার আছে? এইভাবে দশজনের কাছে হাস্যাস্পদ হয়ে বেঁচে থাকাও যে কঠিন হয়ে উঠছে তাঁর কাছে!
