হরিবাবু ভারী অবাক হয়ে চারদিকে সঁদটাকে খুঁজতে লাগলেন। ছোটখাটো জিনিস নয় যে হারিয়ে যাবে। এত তাড়াতাড়ি চাঁদটার অস্ত যাওয়ারও কথা নয়।
হরিবাবু খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে উত্তেজিতভাবে পায়চারি করতে করতে আপনমনেই। বলে উঠলেন, “এটার মানে কী? অ্যাঁ! এর মানে কী?”
জলের ট্যাঙ্কের পাশে অন্ধকার ঘুপচি থেকে একটা ক্ষীণ গলা বলে উঠল,
“আজ্ঞে, মানেটা বেশ গুরুচরণ।”
হরিবাবু আঁতকে উঠে চারদিকে তাকাতে লাগলেন। অন্ধকারে কিছুই দেখার জো নেই। তবে জলের ট্যাঙ্কের দিক থেকে একটা কিস্তৃত ছায়ামূর্তি ধীরে-ধীরে এগিয়ে এল।
হরিবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, “কে? কে ওখানে?”
“আজ্ঞে চাচাবেন না, আমি পঞ্চানন্দ।”
হরিবাবু একটা নিশ্চিন্তের শ্বাস ছেড়ে একটু হেসে বললেন, “ওঃ পঞ্চানন্দ? তা ইয়ে, বুঝলে, একখানা এইমাত্র লিখে ফেললুম। শুনবে নাকি?”
পঞ্চানন্দ বেশ ঝুল্লুস করে কম্বলখানা গায়ে জড়িয়ে আছে। বেশ অমায়িক ভাবেই বলল, “আপনার কি শীতও করে না আজ্ঞে? গায়ে একখানা পাতলা চাঁদর দিয়ে কী করে এই বাঘা শীত সহ্য করছেন?”
হরিবাবু উদাস হেসে বললেন, “করবে না কেন, করে। তবে কিনা কবিতারও তো একটা উত্তাপ আছে। মাথাটা বেশ গরম হয়ে উঠেছিল একটু আগে”।
“সে না হয় বুঝলুম, কিন্তু চোখের সামনে এত বড় একটা ভূতুড়ে কাণ্ড দেখেও আপনার শুধু কবিতা মাথায় আসে কেন বলুন তো!”
হরিবাবু অবাক হয়ে বললেন, “ভূতুড়ে কাণ্ড! কী রকম ভূতুড়ে কাণ্ড বলল তো!”
“এই যে চোখের সামনে আকাশ থেকে যে বস্তুটাকে নেমে আসতে দেখলেন, সেটা ভূতুড়ে ছাড়া আর কী হতে পারে বলুন দিকি।”
হরিবাবু খুব হাসলেন। তারপর বললেন, “চাঁদটা দেখে ভয় পেয়েছ বুঝি? আমিও একটু অবাক হয়েছিলাম।”
পঞ্চানন্দ অবাক হয়ে বলল, “চাঁদ? আপনার কি তিথিটাও খেয়াল নেই? দিয়ে কালিয়া আর রুচি নতুন গুড়েই মানে? অলাম।”
“আজ কি আকাশে চাঁদ থাকার কথা?”
হরিবাবু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “সে অবিশ্যি ঠিক।”
পঞ্চানন্দ মাথা নেড়ে বলল, “মোটেই ঠিক নয়। এসব ব্যাপার খুবই গোলমেলে। এ-নিয়ে একটু ভাবা দরকার।”
হরিবাবু মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, একটু ভাবলেও হয়।”
পঞ্চানন্দ একখানা হাই তুলে বলল, “আমার মুশকিল কী জানেন? পেট খালি থাকলে মাথাটা মোটেই খেলতে চায় না।”
হরিবাবু এতক্ষণ খিদের কথা ভুলে ছিলেন। হঠাৎ পঞ্চানন্দের কথায় তার পেটটাও খাঁ-খাঁ করে উঠল। মাথা চুলকে বললেন, “খিদে জিনিসটা বোধহয় ছোঁয়াচে। আমারও বোধহয় একটু পাচ্ছে।”
“বোধহয়” শুনে পঞ্চানন্দ চোখ কপালে তুলে বলল, “ধন্য মশাই আপনি! খিদের ব্যাপারেও আবার বোধহয়?”
হরিবাবু লাজুক হেসে বললেন, “অনেকক্ষণ ধরেই বোধহয় খিদেটা পেয়ে আছে। কিন্তু খাবার-টাবার কিছুই ঘরে নেই দেখলাম।”
পঞ্চানন্দ একগাল হেসে বলল, “নেই মানে? আজ্ঞে, খাওয়ার ঘরের ঠাণ্ডা আলমারিতে এক ডেকচি নতুন গুড়ের পায়েস, এক বাটি রসগোল্লা, ছানার গজা, মাছের কালিয়া আর কয়েকখানা পরোটা রয়েছে। অবশ্য গিন্নি-মা ফ্রিজে চাবি দিয়ে রাখেন। কিন্তু তাতে কী?”
হরিবাবুর মাথায় ফ্রিজের কথাটা খেলেনি। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন, “তুমি বাস্তবিকই প্রতিভাবান।”
দু’জনে নিঃশব্দে নেমে এলেন। পঞ্চানন্দ ঠিক এক মিনিটে ফ্রিজের দরজা খুলে খাবার-দাবার বের করে ফেলল। খেতে-খেতে দু’জনের কথা হতে লাগল।
হরিবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাঁ, চাঁদ নিয়ে কী যেন বলছিলে!”
পঞ্চানন্দ এক কামড়ে আধখানা মাছ উড়িয়ে দিয়ে বলল, “চাঁদ নয়, চাঁদ হলে ওরকম বেয়াদবি করত না।”
“তা হলে জিনিসটা কী?”
“মনে হয় এ হল গগন-চাকি।”
হরিবাবু খুব বিরক্ত হয়ে বলল, “গগন চাকি? সে তো কামারপাড়ার দিকে থাকে, তার পাটের ব্যবসা! সে এর মধ্যে আসে কী করে?”
পঞ্চানন্দ পরোটা ঝোলে ডুবিয়ে খেতে-খেতে বলল, “আজ্ঞে সে গগন চাকি নয়। গগন মানে আকাশ আর চাকি হল গোলাকার বস্তু। উড়ন্ত-চাকিও বলতে পারেন।”
“উড়ন্ত-চাকি? সে তো এক দুরন্ত ফাঁকি। শুনেছি উড়ন্ত-চাকি বলে আসলে কিছু নেই। নিষ্কর্মা লোক ওসব গুজব রটায়!”
পঞ্চানন্দ দুটি রসগোল্লা দু’গালে ফেলে নিমীলিত নয়নে, অনেকক্ষণ চিবোল। তারপর বলল, “লোকে কত কী বলে। ওসব কথায় কান দেবেন না। যখন হিমালয়ে ছিলুম তখন খাড়াবাবার কাছে পরামর্শ নিতে বারদুনিয়া থেকে কত কিম্ভূত চেহারার জীব আসত। তারা আসত ওইসব উড়ন্ত-চাকিতে করেই। কোনওটা চ্যাপটা, কোনওটা বলের মতো গোল, কোনওটা আবার পটলের মতো লম্বাপানা। একবার আপনাদের পিছনের বাগানেও একটা নেমেছিল। তখন শিবুবাবু বেঁচে। কয়েকটা লোমওয়ালা হুমদো গোরিলা একখানা মস্ত পিপের মতো বস্তু থেকে বেরিয়ে গটগট করে গিয়ে শিবুবাবুর ল্যাবরেটরির দরজায় ধাক্কা দিল। আমি বারান্দায় শুয়ে চোখ মিটমিট করে সব দেখছিলাম।”
হরিবাবু এক চামচ পায়েস মুখে দিয়ে সেটা গিলতে ভুলে গিয়ে চেয়ে রইলেন।
পঞ্চানন্দ সস্নেহে বলল, “গিলে ফেলুন হরিবাবু, নইলে বিষম খাবেন যে!”
হরিবাবু পায়েসটা গিলে বললেন, “তারপর?”
“ভিতরে কী সব কথাবার্তা হল বুঝলাম না। তবে একটু বাদে দেখি, শিবুবাবু সেই গোরিলাগুলোর সঙ্গে বেরিয়ে যাচ্ছেন। যাওয়ার সময় আমাকে বলে গেলেন, “ওরে পঞ্চা, এই এদের সঙ্গে একটু আকাশের অন্যদিকে যেতে হচ্ছে। এদের গ্রহে একটা যন্ত্র একটু খারাপ হয়েছে। মেরামত করে দিয়ে আসতে হবে। কদিন বাদে ফিরব। তা বাস্তবিকই সেই পিপেটায় গিয়ে উঠলেন শিবুবাবু। আর তারপর সেটা একটা গোঁ-ও-ও শব্দ করে একটা গুডুরেল মতো ছিটকে আকাশে উঠে গেল।”
