জরিবাবু চোখ গোল করে তাকিয়ে রইলেন।
পঞ্চানন্দ আড়চোখে ভাবখানা লক্ষ্য করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “আমি আর কী বলি! বললুম, ভালই আছি। কিছু কিছু অসুবিধে সে তো হতেই পারে। তখন শিবুবাবু ভারি দুঃখ করে বললেন, “ওরে পঞ্চা, আমার বড় ছেলেটাকে খরচের খাতায় লিখে রেখেছি, মেজোটাও বোধহয় মানুষ হল না, সেজোটা পুলিশে ঢুকে গোল্লায় গেছে, ছোটটা তো গবেট। তা তুই যখন গিয়ে পড়েছিস সেখানে, আমার ছেলেগুলোকে একটু দেখিস বাবা।”
জরিবাবু কী একটা বলবেন বলে হাঁ করেছিলেন, কিন্তু স্বর ফুটল না।
পঞ্চানন্দ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “পরের বেগার খেটে-খেটে পঞ্চানন্দর আর নিজের জন্য কিছু করা হয়ে উঠল না। দুনিয়াটার নিয়মই এই। তা চায়ের ব্যবস্থাটা এ-বাড়িতে কীরকম বলুন তো জরিবাবু? পাঁচটা বাজতে চলল যে! এরপর চা খাওয়া যে শাস্ত্রে বারণ।”
জরিবাবু শশব্যস্তে বললেন, “দাঁড়ান দেখছি।”
পঞ্চানন্দ মোলায়েম স্বরে বলল, “খালি পেটে চা খাওয়াটা কিন্তু মোটেই কাজের কথা নয়। গোটাকতক ডিমভাজা আর মাখন-টোস্টেরও ব্যবস্থা করে আসবেন।“
জরিবাবুর ব্যবস্থায় চা এল, টোস্ট আর ডিমভাজা এল। পঞ্চানন্দ খেয়েদেয়ে উঠে ঢেকুর তুলে বলল, “এবার একখানা পান লাগান।”
পান চিবোতে চিবোতে পঞ্চানন্দ যখন জরিবাবুকে ছেড়ে হরিবাবুর সন্ধানে দোতলায় এল, তখন হরিবাবুর বাহ্যজ্ঞান নেই। টেবিলে স্থূপাকৃতি খাম, পোস্টকার্ড আর ইনল্যান্ড। তিনি পোস্টকার্ডের পর পোস্টকার্ডে কবিতা লিখে চলেছেন।
পঞ্চানন্দ একটা গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, “আজ্ঞে কাজ তো বেশ এগোচ্ছে দেখছি।”
হরিবাবু মুখ তুলে খুব পরিতৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, “অফিসের পথেই ডাকঘর। নিজেই পঞ্চাশ টাকার কিনে আনলাম। আইডিয়াটা বেশ ভালই হে।”
পঞ্চানন্দ একটু চাপা গলায় বলল, “এসব কাজ করার সময় দরজাটা এঁটে নেবেন ভালমতন। গিন্নি-মা যদি দেখে ফেলেন তবে কিন্তু কুরুক্ষেত্তর হবে।”
“তা বটে, ওটা আমার খেয়াল হয়নি। আচ্ছা পঞ্চানন্দ, এই ধরো রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী আর মুখ্যমন্ত্রীকে যদি চিঠিতে কবিতা পাঠাই, তবে কেমন হয়?”
“সে তো খুবই ভাল প্রস্তাব। তাদের হাতেই তো সব কলকাঠি। কবিতা পড়ে যদি কাত হয়ে পড়েন তো আপনার কপাল খুলে গেল। সভাকবি-টবিও করে ফেলতে পারেন।”
‘দূর! সভাকবি আজকাল আর কেউ হয় না।”
“নিদেন দরবারে তো ডাক পড়তে পারে। চাই কি নোবেল প্রাইজের খাতায় আপনার নাম তুলবার জন্য উঠে-পড়ে লেগে যাবেন তিনজনে।”
হরিবাবু একটু ব্যথিত হয়ে বললেন, “নোবেল প্রাইজের কথা থাক। এ-দেশের সম্পাদকরাই আমার কবিতা ছাপল না, তো নোবেল প্রাইজ। তবে আমি ঠিক করেছি নিজের খরচে একখানা কবিতার বই ছেপে বের করব।”
“সে তো হেসে-খেলে হবে। টাকাটা ফেলে নিশ্চিন্তে কবিতা লিখে যান, ছাপাখানা থেকে দফতরির বাড়ি দৌড়োদৌড়ি যা করার আমিই করব। তা আজ
এক-আধখানা কবিতা নামিয়েছেন। একখানা ছাড়ন শুনি।”
“শুনবে!” বলে একটু লজ্জার হাসি হাসলেন হরিবাবু। তারপর গলাখাঁকারি দিয়ে শুরু করলেন :
কবিতা কখনও ক্ষমা করে না কবিরে।
ক্ষমা পায় হত্যাকারী, ক্ষমা লভে চোর,
ডাকাত, মস্তান আর যত ঘুষখোর–
সিক্ত হয় ক্ষমারূপ বৃষ্টিবারিধারে।
কবির বাগানে নাচে প্রেত, ডাকে তারে
মরীচিকা। তা-ই কাব্য যমের দোসর।
কবিরে শোষণ করে, দিয়ে দেয় গোর।
কবিতা কখনও ক্ষমা করে না কবিরে।
২০.
পঞ্চানন্দ মাথা নেড়ে-নেড়ে শুনছিল। বলল, “আবার একবার পড়ুন তো!”
পুলকিত হরিবাবু আবার পড়লেন।
পঞ্চানন্দ কাপড়ের খুঁটে চোখ মুছে বলল, “চোখের জল রাখা যায় না। আহা, কী জিনিসটা লিখেছেন! বুকটা যেন খাঁ-খাঁ করে ওঠে, জিব শুকিয়ে যায়, আর তেষ্টায় যেন ছাতি ফাটতে থাকে।”
হরিবাবু বিনয়ে মাথা চুলকোলেন।
পঞ্চানন্দ কিছুক্ষণ ঝিম মেরে থেকে বলল, “নাঃ তেষ্টাটা বড্ড চেপে বসেছে বুকে। তা হরিবাবু, বলে আসব নাকি চায়ের কথাটা? সঙ্গে একটু ঝাল চানাচুর!”
হরিবাবু প্রশংসায় এমনই বিগলিত হয়ে পড়েছিলেন যে ফশ করে বলে বসলেন, “আহা, শুধু ঝাল চানাচুর কেন, বেশ গরম গরম কড়াইশুটির কচুরি ভাজছে ভজুয়ার দোকানে। রেমোটাকে পাঠাও, এনে দেবে।”
এ-কথায় পঞ্চানন্দ আর একবার চোখ মুছে উঠে গেল। কচুরি আর চায়ের ব্যবস্থা করে ফিরে এসে বেশ গম্ভীর মুখে সে বলল, “এ দেশটার কিছু হল না কেন জানেন? ভাল জিনিসের সমঝদার নেই বলে। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র বা আকবরের আমল হলে আপনি নির্ঘাত সভাকবি হয়ে বসতেন!”
হরিবাবু খুব লাজুক মুখে হাসতে লাগলেন।
পঞ্চানন্দ নিমীলিত নয়নে খাটের তলায় একখানা তালা-দেওয়া তোরঙ্গকে লক্ষ্য করতে করতে বলল, “অবশ্য পঞ্চানন্দ তা বলে হাল ছাড়বে না। কাল সকালে শ-দুয়েক টাকা একটু গোপনে আমার হাতে দিয়ে দেবেন তো। কিছু খাম-পোস্টকার্ড কিনে ফেলব’খন, আর পোস্টারের ব্যবস্থা করতে হবে। খরচটা নিয়ে বেশি ভাববেন না। পেটের পুজো তো অনেকেই করে, কাব্যলক্ষ্মীর পুজো
অনেক উঁচুদরের ব্যাপার। খরচটা গায়ে মাখলে তো চলবে না।”
হরিবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “বটেই তো। তা টাকাটা তুমি এখনই নিয়ে রাখতে পারো।”
জিব কেটে পঞ্চানন্দ বলল, “না, না, আমাকে অত বিশ্বেস করে বসবেন। লোক্টা আমি তেমন সুবিধের নই। টাকা হাতে এলেই লোভ চাগাড় দেয়। আর লোভ থেকে কত কী হয়। ও কাল সকালেই দেবেন’খন।”
