“তাহলে কী হবে?”
“এর জন্য আপনার বাবাই দায়ী। ওষুধটা পরীক্ষা করতে যাকে-তাকে ধরে এনে খাইয়ে দিতেন। লোকগুলো ভাল কি মন্দ তা খুঁজে দেখতেন না। তাই রহিম শেখের মতো লোকও যেমন আছে তেমনি কালুগুণ্ডা, নিতাই-খুনে, জগা চোরেরও অভাব নেই। কখন যে কী করে বসে তারা!”
“ওরে বাবা!”
“তবে আপনি ভয় পাবেন না। পঞ্চানন্দ তো আর ঘোড়ার ঘাস কাটে না। তার কাছেও জরিবুটি আছে। শিবুবাবু আমাকে একটা দোরঙা কাঁচের চশমা দিয়ে গেছেন। পাঁচজনের হাতে দেওয়া বারণ। তবে সেই চশমা চোখে দিলেই আমি অদৃশ্য লোকগুলোকে পরিষ্কার দেখতে পাই। আমি থাকতে চিন্তা নেই।”
“আপনি থাকবেন তো?”
“দেখি ক’দিন থাকতে পারি। হিমালয়ও বড় ডাকছে। দেখি কতদিন মনটাকে বেঁধে রাখতে পারি।”
জরিবাবু পানের বাটাটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, “আর একটা পান ইচ্ছে করুন।”
করলাম। আহা বেশ পান। সেই কাশীতে থাকতে একবার রাজা ললিতমোহন খাইয়েছিল। বড় মিঠে আর মোলায়েম পাতা।”
“আমি আপনাকে রোজ খাওয়াব।”
পঞ্চানন্দ মাথা নেড়ে বলল, “সে হবে’খন। তা ইদিকে শীতটাও পড়েছে এবার জেঁকে, ইয়ে আপনার বেশ নরম কম্বল-টম্বল নেই। একখানা ধার পেলে হত।”
“হ্যাঁ আছে, নেবেন?”
“ধার হিসেবে। জাদুইঘরের বারান্দাতেই তো শুতে হবে রাতে। ঠাণ্ডা লাগবে।”
জরিবাবু শশব্যস্ত বলেন, “তা কেন, আমার পাশের ঘরখানাই এমনি পড়ে থাকে। আপনি বাবার বন্ধু, থাকবেন সে তো সৌভাগ্য আমাদের। তবে আপনার কথায় মনে পড়ল, কিছুদিন আগে সন্ধেবেলায় পিছনের উঠোনে ঘুরে ঘুরে একটু সুর তৈরি করার সময় হঠাৎ যেন আমার গায়েও কে একটু আলতো করে ধাক্কা মেরেছিল।”
‘অ্যাঁ?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, তখন মনে হয়েছিল মনের ভুল। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি ব্যাপারটা তা নয়। আরও কথা আছে…’
“অ্যাঁ! কী সর্বনাশ!”
“সেদিন সকালে রেওয়াজের সময় কিছুতেই রেখাবটা লাগাতে পারছিলাম। হঠাৎ কানের কাছে কে যেন গলা খেলিয়ে সুরটা ধরিয়ে দিল। তখন মনে হয়েছিল, গলাটা বোধহয় খৈয়াম খয়ের। তা যে নয়, এখন বুঝতে পারছি। আমার বাবা কি কোনও গায়ককে অদৃশ্য করে দিয়েছিলেন?”
পঞ্চানন্দ জর্দাসুদ্ধু পানের পিক গিলে ফেলে হেঁচকি তুলতে লাগল। জবাব দিতে পারল না।
০৭.
হরিবাবুর বড় দুই ছেলের নাম হল ঘড়ি আর আংটি। পোশাকি নাম অবশ্য আছে, সেটা কেবল স্কুলের খাতায়। দুজনেই অতি দুর্দান্ত প্রকৃতির দুষ্টু। সামলাতে সবাই হিমসিম।
ছুটির দিনে আজ দুজনেই গিয়েছিল জেলা স্কুলের সঙ্গে ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে। দু’ভাইয়ের আর তেমন কোনও গুণ না থাকলেও তারা খেলাধুলোয় খুব ভালো। তল্লাটে খেলোয়াড় হিসেবে দুজনেরই বেশ নামডাক। হরিবাবু অবশ্য খেলাধুলো পছন্দ করেন না। তিনি কবি মানুষ এবং মনে প্রাণে কবি বলেই বোধহয় এসব স্থল খেলাধুলোকে তাঁর ভারি ছেলেমানুষি বলে মনে হয়। ফুটবলের নাম শুনলে তিনি আঁতকে উঠে বলেন, “বর্বরতা। ফুটবল মানেই হচ্ছে তোণ্ডুতি, ল্যাং মারামারি, ডুসোর্টুসি, বর্বরতা।” ক্রিকেটের কথা শুনলে নাক সিঁটকে বলেন, “কে যেন বলেছে ক্রিকেট হল উইলো কাঠের কবিতা! ছ্যাঃ, সে লোকটা কবিতার। ক-ও বোঝে না। ডাংগুলি, স্রেফ ডাংগুলি, সাহেবরা মান বাঁচাতে নাম দিয়েছে ক্রিকেট।”
বলা বাহুল্য হরিবাবু দৌড়ঝাঁপ লাফালাফিও পছন্দ করেন না। তিনি চান সকলে সব সময়ে শান্তশিষ্ট হয়ে থাকুক। চেঁচামেচি ঝগড়া কাজিয়া না করুক। কথা কম বলুক। আরও বেশি করে ভাবুক। কবিতা ছাড়া অন্য কোনও বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে ভালবাসেন না। কপালদোষে তার বড় এবং মেজো ছেলে ঘড়ি আর আংটি স্বভাবে হয়েছে বিপরীত। দুটোই দুর্দান্ত বর্বর।
হরিবাবুর বড় ছেলে খুবই ভাল ব্যাটসম্যান। আংটি বোলার। ফুটবলও তারা খুবই ভাল খেলে। দৌড়ঝাপেও কম যায় না। বিনোদবিহারী হাইস্কুল যে জেলার মধ্যে খেলাধুলোর সেরা, তা এই দুজনের জন্যই।
জেলা স্কুলের সঙ্গে বিনোদ হাই-এর রেষারেষি অনেক দিনের। এবছর কলকাতা থেকে তিন-চারটি টাটকা খেলোয়াড় ছেলে এসে ভর্তি হওয়ায় জেলা স্কুলের জেল্লা বেড়ে গেছে। জেলা ক্রিকেট লিগে তারা ইতিমধ্যেই প্রায় সব স্কুলকে গো-হারা হারিয়ে দিয়েছে। আশিস রায় নামে তাদের একজন পাকা ব্যাটসম্যান আছে। দেবর্ষি ভট্টাচার্য দুরন্ত ফাস্ট বোলার, একজন গুগলিবাজও আছে-মদন মালাকার। তিনজনেরই দারুণ নামডাক। কলকাতায় এরা ফার্স্ট ডিভিশনে খেলত।
জেলা স্কুলের ক্যাপটেন আশিস টসে জিতে ব্যাট নিল। বিনোদ হাই-এর ক্যাপটেন ঘড়ি তার দলকে প্যাভিলিয়নের সামনে জড়ো করে বলল, “জেলা স্কুলের প্রধান ভরসা আশিস। সে নামবে ওয়ান ডাউন। ওদের ওপেনার নাড় আর গণেশের মধ্যে গণেশটা গেঁতো, সহজে আউট হবে না। সুতরাং আমরা কনসেনট্রেট করব নাড়র ওপর। তাকে চটপট ফেলে আশিসকে মুখোমুখি এনে ফেললেই আসল লড়াই শুরু হবে। মনে রেখো, আশিসের অফ সাইড স্টোক ভাল নয়। আংটি,তুই অফ স্টাম্পে বা অফ স্টাম্পের বাইরে বল দিবি। জ্যোতি, তুইও অ্যাটাক করবি অফ স্টাম্প। ক্যাচ যেন আজ একটাও মাটি না ছোঁয়।”
বিনোদ হাই-এর লেখাপড়ায় নাম না থাকলেও খেলায় খুব সুনাম। তাই মাঠ ভেঙে পড়েছে লোকে। লিগ চ্যাম্পিয়নশিপের এইটাই চূড়ান্ত খেলা। যে জিতবে, সে-ই চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে। কাজেই উত্তেজনা স্বাভাবিক।
