—আমি অত বুঝি না কুশলদা। আমি বলতে এসেছি আমি একটা ছবি প্রডিউস করব। টাকা দাও। শেষবার একটা চেষ্টা করে দেখি।
—দেব। কুশল বিনা দ্বিধায় বলে।
.
চার
উপগুপ্ত আর বাসবদত্তার কবিতাটার শেষে যা ছিল, তাই বুঝি ঘনিয়ে আসে। ছবিটা একদম চলল না। কুশল জানত, তাই টাকাটাকে খরচের খাতায় ধরে রেখেছিল।
প্রেস শো-তে তার পাশেই বসে ছিল টুপু। বলল—চলবে না, না গো কুশলদা?
কুশল খুব দুঃখিত মনে মৃদুস্বরে বলে—বোধহয় না।
—কেন কুশলদা? আমি তো আমার সর্বস্ব দিয়ে অভিনয় করেছি, গল্পটাও ভালো ছিল। সবই চেষ্টা করেছি।
কুশল তেমনি মৃদুস্বরে বলে—টুপু, কেন এত করলে? এর চেয়ে অনেক কম কষ্টে সুখী হওয়া যেত জীবনে।
বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে টুপু একটা অ্যাপার্টমেন্টে থাকে এখন। একা-একা। মা আর ভাই আলাদা থাকে। তাদের সঙ্গে বনিবনা হয় না টুপুর।
তার সেই অ্যাপার্টমেন্টে বিরাট পার্টি দিয়েছে টুপু তার জন্মদিনে। কুশলকেও নিমন্ত্রণ করেছে। কুশল সময় পায় না, তবু সময় করে গেল পার্টিতে।
গিয়ে দেখে, ফ্ল্যাটটা একদম ফাঁকা। রাশি-রাশি খাবার সাজানো টেবিলে, ঘরদোরে প্রচুর আলো, সাজগোজ। তবু কেউ নেই। এমনকী একটা বুড়ি ঝি ছাড়া অন্য কাজের লোকও কেউ নেই। টুপু একটা সাদা খোলের তাঁতের শাড়ি পরে এলোচুলে জানলার ধারে বই পড়ছে। মুখটা ম্লান, কিন্তু প্রসাধনহীন বলে তার সেই কৈশোরের কমনীয়তাটুকু ফুটে আছে।
কুশল অবাক হয়ে বলে—কী হল, লোকজন সব কই?
টুপু বই বন্ধ করে হেসে উঠে আসে, বলে—লোকজন! তারা আবার কারা? কাউকে বলিনি তো? শুধু তোমাকে।
—তাহলে এত আয়োজন দেখছি কেন?
টুপু অনেকক্ষণ চেয়ে থাকে কুশলের মুখের দিকে। তারপর খুব গভীর একটা শ্বাস ফেলে বলে —শোনো, আমি জীবনে দেদার পার্টি দিয়েছি। পার্টির শেষে যখন সবাই চলে যায়, তখন এঁটো বাসন, শূন্য মদের বোতল, ভাঙা কাচ, দলিত ফল সব পড়ে থাকে। ঘরটা বীভৎস লাগে। মনে হয় পরিত্যক্ত, ভূতুড়ে। তাই আজ কাউকে বলিনি।
—আমাকে যে বললে!
—তুমি! ওঃ, তোমার কথা আলাদা। আজ আমরা দুজনে পার্টি করব। আর আমাদের চারিদিকে শূন্য চেয়ার, ফাঁকা ঘর, আর নির্জনতা থাকবে। কুশলদা, তোমার একার জন্যই আজ পঞ্চাশজনের আয়োজন। তুমি সব এঁটো করে, নষ্ট করে যাও। আমি দেখি।
—পাগল। কুশল বলে।
—আমি পুরুষকে লজ্জা পেতে বহুকাল ভুলে গেছি। কিন্তু জানো আবার আমার খুব ইচ্ছে করে লজ্জা করতে। আমাকে একটু লজ্জা দাও কুশলদা।
—পাগল! কুশল হেভরে বলে।
—শোনো, তুমি ভাবছ আমি মদ খেয়েছি। না গো, এই দ্যাখো, শঁকে দ্যাখো মুখ। বহুদিন হল ছেড়ে দিয়েছি। এই বলে ছোট্ট সুন্দর মুখখানা হাঁ করে কাছে এগিয়ে আনে টুপু।
কুশল ওর মুখের বাতাস কল। কী সুন্দর গন্ধ! ওইভাবেই দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ মোহাচ্ছন্ন হয়ে।
টুপু শ্বাস ফেলে মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল—আজ আমার জন্মদিন কুশলদা। তুমি আমাকে কী দেবে?
সোনার একটা গয়না এনেছে কুশল! কিন্তু সেটা বের করল না। একটু ভাবল। তারপর বলল —টুপু, বহুকাল হয় তোমাকে একটা কথা বলার চেষ্ট করেছি। আজ তোমাকে সেই কথাটা বলি বরং। সেইটেই জন্মদিনের উপহার বলে নিও।
–কথা! বলে টুপু হাঁ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ বলে—এতদিন বলেনি কেন?
—সময় হয়নি। কথারও সময় আছে টুপু।
টুপু হেসে মাথা নীচু করে লজ্জায়। তারপর অল্প একটু শ্বাসকষ্টের সঙ্গে বলে—আজ বুঝি সময় হয়েছে?
—হ্যাঁ। খুব দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই এবার বলি। টুপু…
টুপু দু-হাতে কান চেপে ধরে চেঁচিয়ে ওঠে—পায়ে পড়ি, বোলো না, বোলো না তো! বললেই ফুরিয়ে যাবে।
—বলব না? কুশল অবাক।
টুপু স্নিগ্ধ চোখে চেয়ে হাসল। বলল—সারা জীবন ধরে ওই কথাটা একটু-একটু করে বোলো। কথা দিয়ে নয়, অন্যরকম ভাবে।
কার্যকারণ
রাত দুটোয় জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আমি সিগারেট জ্বাললুম। নিঃসাড় ঘুমে অচেতন আমার বউ সোনামন তা জানতেও পারল না। সারা বিকেল আমার সিগারেটের প্যাকেট লুকোনো ছিল হাতব্যাগে। খেয়াল করেনি সোনামন, বিছানায় যাওয়ার আগে অবহেলায় সে আমাদের দুই বালিশের ফাঁকে রেখেছিল ব্যাগটা আমি তা দেখে রেখেছিলাম।
বিয়ের একমাস আগে আমার গ্যাসট্রিকের ব্যথাটা বেড়ে গেল খুব। ব্যথা লুকিয়ে আমি ঘুরে বেড়াতাম। পেট আর বুকের মাঝখানে একটা বিন্দুতে ব্যথাটা প্রথমে শুরু হত। ফুলের কলির মতো। তারপরেই ছিল তার আস্তে আস্তে পাপড়ি মেলে দেওয়া। কিছু খেলেই কমে যেত। তারপর আবার গোড়া থেকে সে শুরু করত। সোনামন যখন রাস্তায় আমার পাশে হাঁটত, ট্যাক্সিতে ঢলে পড়ত আমার কাঁধে, কিংবা রেস্টুরেন্টে বসে চাপা ঠোঁটের হাসিটি হাসতে-হাসতে চায়ে চিনি মেশাত তখন আমি বুক–জোড়া টক জল আর কামড়ে ধরা ব্যথাটা গিলে রেখে অনায়াসে হাসতাম, কথা বলতাম। ওকে টের পেতে দিতাম না। শুধু মাঝে-মাঝে সোনামন চমকে উঠে বলত তোমাকে অত সাদা দেখাচ্ছে কেন মানিকসোনা (আমরা পরস্পরকে নানা নামে ডাকি)? আমি শান্ত গলায় উত্তর দিতাম বোধহয় আলোর মতো। ও বিশ্বাস করত না। বলত–আলো না, তোমাকে কেমন ক্লান্তও দেখাচ্ছে! কী হয়েছে? আমি হাসতাম। হেসেই ধরিয়ে নিতাম সিগারেট। ওই সময়টুকুর মধ্যেই আমি কৌশলে সোনামনকে অন্য কোনও বিষয়ে নিয়ে যেতাম নিজেকে আড়াল করে। আমি কখনও লক্ষই করতাম না, আমি কত সিগারেট খাই। সোনামনের
