চৌরঙ্গির ওপরে তুষার ট্যাক্সি পায়।
–কোথায় যাবেন?
ঠিক বুঝতে পারে না তুষার, কোথায় সে যেতে চায়। একটু ভাবে। তারপর দ্বিধাগ্রস্তভাবে বলে–সোজা চলুন।
গাড়ি সোজা চলতে থাকে দক্ষিণের দিকে, যেদিকে তুষারের বাসা। সেদিকে যেতে তুষারের ইচ্ছে করে না। বাড়ি ফেরা–সেই একঘেয়ে বাড়ি ফেরার কোনও মানে হয় না।
সে ঝুঁকে ট্যাক্সিওয়ালাকে বলে–সামনের বাঁদিকের রাস্তা।
এলগিন রোড ধরে ট্যাক্সি ঘুরে যায়।
কোথায় যাব। কোথায়। তুষার তাড়াতাড়ি ভাবতে থাকে। ভাবতে-ভাবতে মোড়ে এসে যায়। এবার? ভিতরে সেই তীব্র ইচ্ছা এখনও কাজ করছে। অন্ধকারময় একটা বাড়ির কাঠামো লোহার বিমে নুড়ি ছুঁড়ে মারার শব্দ–তুষারের বুক ব্যথিয়ে ওঠে। মনে হয়–কেবলই মনে হয়–কী একটা সাধ তার পূরণ হয়নি। এক রহস্যময় অস্পষ্ট মুক্তি বিনা বৃথা চলে গেল জীবনে।
সে আবার বলে–বাঁয়ে চলুন।
ট্যাক্সি দক্ষিণ থেকে আবার উত্তর মুখে এগোতে থাকে। আবার সার্কুলার রোড। গাড়ি এগোয়। ভিতরে ভিতরে ছটফট করতে থাকে তুষার।
একটা বিশাল পুরোনো বাড়ি পেরিয়ে যাচ্ছিল গাড়ি। তুষার বাড়িটাকে দেখল। কী একটা মনে পড়ি পড়ি করেও পড়ল না। আবার বাড়িটা দেখল। হঠাৎ পাঁচ-সাত বছর আগেকার কয়েকটা দুরন্ত দিনের কথা মনে পড়ল। নিনি। নিনিই তো মেয়েটির নাম।
গাড়ি এগিয়ে গিয়েছিল, তুষার গাড়ি ঘোরাতে বলল ।
সেই বিশাল পুরোনো বাড়িটার তলায় এসে থামে গাড়ি।
.
হাতে সদ্য কেনা এক প্যাকেট দামি সিগারেট আর দেশলাই নিয়ে সেই পুরোনো বাড়ির তিন তলায় সিঁড়ি ভেঙে উঠতে-উঠতে তুষার ভাবে–এখনও নিনি আছে কি এখানে? আছে তো!
বাড়িটায় অসংখ্য ঘর আর ফ্ল্যাট। ঠিক ঘর খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তার ওপর পাঁচ-সাত বছর আগেকার সেই নিনি এখনও আছে কি না সন্দেহ। যদি না থেকে থাকে তবে ভুল করে ঢুকে বিপদে পড়বে না তো তুষার?
একটু দাঁড়িয়ে ভেবে, একটু ঘুরে–ফিরে দেখে তুষার ঘরটা চিনতে পারল। দরজা বন্ধ। বুক কাঁপছিল, তবু দরজায় টোকা দিল তুষার।
দরজা খুললে দেখা গেল, নিনিই। অবিকল সেইরকম আছে।
চিনতে পারল না, ভ্রূ তুলে ইংরিজিতে বলল –কাকে চাই?
তুষার হাসল–চিনতে পারছ না?
নিনি ওপরের দাঁতে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরে একটু ভাবল। তুষার দেখল ডান দিকের একটা দাঁত নেই। সেই দাঁতটা বাঁধানো, দাঁতের রং মেলেনি। পাঁচ বছরে এইটুকু পালটেছে নিনি।
–আমি তুষার।
নিনির মুখ হঠাৎ উদ্ভাসিত হয়ে গেল।
এবার বাংলায়–আঃ, তুমি কি সেই রকম দুষ্টু আছ। বুড়ো হওনি?
–আগে বলল , তুমি সেই নিনি আছ কি না! তোমার স্বামী পুত্র হয়নি তো! হয়ে থাকলে দোরগোড়া থেকেই বিদায় দাও।
নিনি ঠোঁট উলটে বলল –আমার ওসব নেই। এসো।
ঘরে সেই রঙিন কাগজে ছাওয়া দেওয়াল, ভাড়া করা ওয়ার্ডরোব, মেয়েলি আসবাবপত্র। এখনও সেন্ট–পাউডার ফুলের গন্ধ ঘরময়। বিছানার মাথার কাছে গ্রামোফোন, টেবিলে রেডিও আর গিটার।
নিনি কয়েক পলক তাকিয়ে বলল –তুমি একটুও বদলাওনি।
–তুমিও।
কিন্তু তুষারের তীব্র ইচ্ছাটা এখনও অস্থির অন্ধের মতো বেরোবার পথ খুঁজছে! সে কি এইখানে তৃপ্ত হবে? হবে তো? উত্তেজনায় অস্থিরতায় সে কাঁপতে থাকে।
ওয়ার্ডরোবের পাল্লা খুলে সাবধানে গুপ্ত জায়গা থেকে একটা দামি মদের বোতল বের করে নিনি, তারপর হেসে বলে–এই মদ কেবল আমার বিশেষ অতিথিদের জন্য।
এই সবই তুষারের জানা ব্যাপার। ওই যে গোপনতার ভান করে দামি বোতল বের করা ওটুকু নিনির জীবিকা। তুষারের মনে আছে নিনি বারবার তাকে এই বলে সাবধান করে দিত–মনে রেখো এটা ভদ্র জায়গা। আর, আমি বেশ্যা নই। মাতাল হয়ো না, হুল্লোড় করো না।
তুষার হাসল। সে বারবার নিনির কাছে মাতাল হয়ে হুল্লোড় করেছে।
তুষার আজ মাতাল হওয়ার জন্য উগ্র আগ্রহে প্রস্তুত ছিল। একটুতেই হয়ে গেল। তখন তীব্র মাদকতায় একটা গৎ গিটারে বাজাচ্ছিল নিনি। ওত পেতে অপেক্ষা করছিল তুষার। বাজনার সময়ে নিনিকে ছোঁয়া বারণ। বাজনা থামলে তারপর–
ভিতরে তীব্র ইচ্ছেটা গিটারের শব্দে তীব্রতর হয়ে উঠেছে।
মুক্তি। সামনেই সেই মুক্তি। চোখের সামনে আবার সেই খাড়া বিশাল লোহার কাঠামোতে ঘনায়মান অন্ধকার, লোহার বিমে নুড়ির শব্দ।
বাজনা থামতেই বাঘের মতো লাফ দিল তুষার।
তীব্র আশ্লেষ ইচ্ছা আনন্দময় আবরণ উন্মোচন, তারই মাঝখানে হঠাৎ ব্যাথায় ককিয়ে ওঠে নিনি–থামো, থামো, আমার বড় ব্যথা–
তুষার থামে–কী বলছ?
নিনি ঘর্মাক্ত মুখে ব্যথায় নীল মুখ তুলে বলে–এইখানে বড় ব্যথা–
পেটের ডান ধার দেখিয়ে বলে–গত বছর আমার একটা অপারেশন হয়েছিল। অ্যাপেন্ডিসাইটিস–
তুষারের লিত হাত পড়ে যায়। পাঁচ বছরে অনেক কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। সবকিছু কি আর ফিরে পাওয়া যায়?
সময় পেরিয়ে গেল, তুষার ফিরল না।
বিকেলে চুল বেঁধেছে কল্যাণী। সেজেছে। চায়ের জল চড়িয়েছিল, ফুটে–ফুটে সেই জল শুকিয়ে এসেছে। গ্যাসের উনোন নিভিয়ে কল্যাণী ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। উত্তরের ব্যালকনি, উলটোদিকে ফুটপাথে সেই বকুলগাছ, গাছতলায় ধুলো–মাখা আকীর্ণ ফুলের মধ্যে বসে আছে। পাগলটা। একটু দূরে বসে একটা রাস্তার কুকুর পাগলটাকে দেখছে।
দৃশ্যটাকে করুণ বলা যায়। আবার বলা যায় না। অরুণকে নিয়ে এখন আর ভাববার কিছু নেই। এখন এক রাস্তার পাগল। মুক্ত পুরুষ।
