সাঁটুলাল দাঁত খেচিয়ে বলে–তুমি কে হে। যার দোকান সে কিছু বলে না তোমার অত ফোপরদালালি কীসের?
লেগে যেত। কিন্তু এ সময়ে সাঁটুর ছেলে বিষ্ণু রাস্তা থেকে উঠে এসে সুখচন্দ্রকে বলল বাবা, মা বলে দিল ফেরার সময় আনাজ নিয়ে যেতে।
সাঁটু প্রাণভরে দেখছিল। তার ছেলে। হ্যাঁ তারই ছেলে। সুখচন্দ্রকে ‘বাবা’ ডাকছে! আহা ডাকুক। ওর ‘বাবা’ ডাকার মতো লোক চাই তো। সে নিজে তো আর মানুষ নয়।
ছেলে বেরোল তো পিছু–পিছু সাঁটুলালও বেরোয়। ছেলে কয়েক কদম হেঁটেই পিছু ফিরে বলে –তুমি আসছ কেন?
সাঁটু একটু রেগে বলে–কেন, তোর বাবার রাস্তা?
–তুমি অন্য বাগে যাও। নইলে মাকে বলে দেব।
–কী বলবি?
–তুমি কুন্তির পয়সা চুরি করেছিলে না? মনে নেই?
–ওঃ চুরি! গঙ্গা-যমুনা খেলতে গিয়ে খুঁড়ি কোথায় পয়সা হারিয়ে আমার ঘাড়ে চাপান দিলে।
–সে যাই হোক, তুমি কাছে আসবে না আমাদের।
–বাপকে কি ভুলে গেলি বুঝি?
ছেলে চলে গেল।
পালপাড়ার পুকুরধারে শেফালি ধরল তাকে। গা ধুয়ে ঘরে ফিরছে। দেখতে পেয়ে বলে–তোমার সঙ্গে কথা আছে।
শেফালি মোটা মানুষ। শরীর ঢিলেঢালা হয়ে গেছে। ঘামাচিতে গা কাঁথার মতো হয়ে আছে। গোলপানা থোম্বা মুখখানা দেখলে কাতলা মাছের মাথার মতো মনে পড়ে। দাঁতে নস্যি দেওয়ার নেশা আছে। একগাল হেসে বলল –খবর শুনেছ নাকি? তোমার যে আবার ছেলে হবে।
ছেলে কি বাতাসে হয়! সাঁটু অবাক হয়ে বলে–আমার ছেলে হবে কী গো!
–ওই হল! তোমার বউয়ের।
সাঁটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলে–কী যে বলো বউঠান!
–বলছি বাপু, শুনে রাখো! তবে এও বলি, সরস্বতীর পেটেরটা যদি তোমার ছেলে না হয় তবে সে তোমাদের সুখবাবুর ছেলেও নয়।
সরস্বতীর ছেলে হবে শুনে সাঁটুলাল খুশিই হল। আহা! হোক, হোক। ছেলেপুলে বড় ভালোবাসে সরস্বতী। ছেলেপুলে নিয়ে সব ভুলে থাকে।
খুশি মনে সাঁটুলাল বলল –ভালো, ভালো।
ভালো কী! অ্যাঁ! ভালোটা কী দেখলে? পাঁচজনে যাই বলুক, আমি তো সুখবাবুর মুরোদ জানি। ছেলের জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা সে মেনিমুখোর নেই। থাকলে আমার বাঁজা বদনাম ঘুচত। তুমি বুঝি ভেবেছ সুখবাবুর ক্ষমতায় কাণ্ডটা হচ্ছে? আচ্ছা দিনকানা লোক তোমরা। এ সুখবাবুর কাজ নয় গো। সাঁট আছে।
কীসের সাঁট?
থোম্বা মুখে ঢলাঢলি হাসি খেলিয়ে শেফালি বলে–দেখেও দ্যাখো না নাকি? বিশে যে তোমাকে সেদিন খুব ঠেঙাল সে কেন জানো? বিশেকে যে দীনবন্ধুবাবু তার কারবারে বেশি মাইনেয় লাগাতে চেয়েছিল তাতে বিশে গেল না কেন জানো? সে যে এখানে বিশ টাকা মাইনে আর দুবেলা খোরাকি পেয়ে আঠার মতো কেন লেগে আছে জানো? বোঝো না? বিশে আর সরস্বতীর ভাবসাব দেখেও বোঝো না? চোখ–কান খোলা রেখে চলবে। তাহলে আর পাঁচজনের কাছে শুনে বুঝতে হবে না। যাও, বাড়ি গিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভাব।
ভাবাভাবির কী আছে তা সাঁটুলাল বোঝে না। দিনের মতো পরিষ্কার ব্যাপার। তবে কিনা সাঁটু এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। আসল ব্যাপার হল, সরস্বতীর আবার ছেলে হচ্ছে।
.
বাড়ি ঢুকতেই আগে বাবুর সঙ্গে দেখা। বাগানের রাস্তায় শোয়ানো চেয়ার পেতে বসে বই পড়ছে। কেবল বই পড়ে। শোনা যায় কলেজের খুব নামকরা মাস্টার। মেলা বিদ্যা জানে। যদিও ধান আর চিটের তফাত বুঝতে পারে না। তা সে যা হোক, বেশি বোঝেন না বলেই ভালো। বুঝলে বড় মুশকিল।
বাবু মুখ তুলে দেখে বললেন–সাঁটুলাল যে! কোথায় গিয়েছিলে?
–এই আজ্ঞে। কাল থেকে আর হবে না।
–সে জানি। কিন্তু বাড়ির সবাই ভাবছিল খুব।
–আর হবে না।
বাবু রোগা-রোগা লোক, বেশি কথা বলে না। শুধু গম্ভীর হয়ে বলল –বিশ্বাসী লোক পাওয়া বড় মুশকিল দেখছি।
ভিতর বাড়িটা থমথম করছে। বউদি এই সবে দুপুরের ঘুম থেকে উঠল। মুখ–টুখ ফুলে রাবণের মা। তার ওপর এলোকেশী ঠোঁটে শুকনো রক্তের মতো পানের রস। গলায় কপালে ঘাম। আঁচল কুড়োতে–কুড়োতে কুয়োতলায় যাচ্ছিল, ভিতরের বারান্দায় তাকে দেখে থমকে গিয়ে বলল –তুমি কার হুকুমে বাড়িতে ঢুকেছ? বেরোও এক্ষুনি।
সাঁটুলাল টপ করে কান ধরে ফেলে বলল –কাল থেকে আর হবে না।
ঘুম থেকে উঠলে মানুষের তখন–তখন আর তেমন তেজ থাকে না। বউদিরও রাজ্যের আলিস্যি। হাই তুলে বলল –পয়সাটা ফেরত দেবে তো?
–মাইনে থেকে কাটান দিয়ে দিব বরং।
–চায়ের জল চড়াও গে যাও। বলে বউদি কুয়োর দিকে গেল।
চায়ের জল চড়ানোর কথা সাঁটুলালের নয়। সে বাইরের কাজের লোক। জল তোলে, গরুর দেখাশোনা করে, দুধ দোয়ায়, বাগান করে, কাপড় কাঁচে আর ফাইফরমাশ খাটে। ঘরের কাজ সরস্বতীর ওপর। রান্না বাসন মাজা, ঘর ঝাঁটানো বা মোছা। তাই চায়ের জল করার কথায় অবাক মানে সাঁটুলাল।
কাজ তেমন জানা নেই। তবু পায়ে-পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগোল। রান্নাঘরের দরজা জুড়ে মেঝেয় আঁচল পেতে সরস্বতী শোওয়া। অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
আহা, ঘুমোক। আবার মা হবে। এ সময়টায় শরীর এলিয়ে যায়। সরস্বতীর হাঁ মুখের কাছে মাছি উড়ছে, বসছে। হাত নেড়ে তাড়াল সাঁটুলাল।
তারপর খুব সাবধানে সরস্ব তাঁকে ডিঙিয়ে রান্নাঘরে ঢোকে সে। কেরোসিনের স্টোভকে জুত করতে পারছিল না। খুটুরমুটুর করে নাড়ছিল। শব্দ পেয়ে সরস্বতী পাশ ফিরে রক্তচোখে চেয়ে বলল –ও কী! রান্নাঘরে ধুলোপায়ে ঢুকেছ যে বড়! বাইরের জামাকাপড় নিয়ে ছিষ্টি ছুঁচ্ছো! তুমি কি মানুষ? সাতবাসি হেগো মোতা কাপড়। তার ওপর কোথায় কোন আস্তাকুঁড়ে রাত কাটিয়েছ! বেরোও!
