–ও।
–তোমরা সব কেমন আছ? বহুকাল খবর বার্তা পাই না।
মহিলা হাসেন। বলেন–আপনি সেই চা বাগানে এখনও আছেন?
–হ্যাঁ। ওখানেই জীবন শেষ করে ফেললাম।
মহিলা একটা শ্বাস ফেললেন–জানি সবই।
বাবা একটা গলা খাঁকারি দেয়। বলে–খগেনের কেমন চলছে?
–ওই একরকম।
বাবা হেসে বলে–খুব বাবু মানুষ ছিল। সেই কোঁচানো ধুতি, গিলে করা পাঞ্জাবি, আর বত্রিশজোড়া জুতো এখনও চালাচ্ছে? চুলে কলপ–টলপ দেয় না?
মহিলা মুখে আঁচল তুলে হাসি ঢাকেন। মৃদুস্বরে বলেন–কলপের দরকার হয় না। টাক পড়ে গেছে।
–পড়ারই কথা। বলে বাবা গম্ভীর হয়ে যায়। এস্রাজটা ইঙ্গিতে দেখিয়ে বলে–এখনও বাজাও?
মহিলা মাথাটা নুইয়ে দেন। মাথা নাড়েন। না, বাজান না।
বাবা চুপ করে দেওয়ালের দিকে চেয়ে থাকে। হলঘর থেকে দেওয়াল ঘড়ির শব্দ আসে। চাকর মিষ্টির প্লেট রেখে যায়। গেলাসে জল। চা।
বাবা প্লেটের দিকে চেয়ে বলে–চিবোতে পারি না।
–কষ্ট হয়?
–হুঁ। আমার পথ্য লিকুইড।
–শরবত করে দিই?
–না।
মহিলা তবু উঠে যান। বোধহয় শরবতের ফরমাশ দিয়ে এসে আবার বসেন। ঘোমটা খসে গেছে। এখনও কী গহীন কালো চুলের রাশি!
–খগেনকে বোলো, আমি এসেছিলাম। কাল বা পরশু ফিরে যাব।
মহিলা চুপ করে থাকেন। শমীক একটা–দুটো মিষ্টি খায়। চা শেষ করে। তারপর উঠে বলে–বাবা, আমি আসি?
যাবে? বাবা তটস্থ হয়ে বলে–আমিই বা বসে থাকি কেন? খগেন যখন নেই!
মহিলা ঘোমটা আবার মাথায় তুলে শমীককে বলেন–তুমি এখন কোথায় যাবে বাবা?
–একটু কাজ ছিল।
–আমি ওঁকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। উনি একটু থাকুন এখানে, কেমন? বাবা অপ্রতিভ হয়। শমীক এটাই চাইছিল। তার সামনে জমবে না ওদের। তার পালানো। দরকার এখন। সে মহিলাকে একটা প্রণাম করে বলে–আচ্ছা। বাবার কোনও তাড়া নেই। সারাদিন তো একা।
মহিলা হাসলেন। বললেন–আমারও তাই। একা।
বলেই সামলে গেলেন। হেসে বললেন–ছেলেপুলে নেই তো।
খুব ধীরে শমীক দরদালানে বেরিয়ে আসে। বারান্দা পার হয়। সিঁড়ির মুখে চলে আসে। আর সেইখানে নিস্তব্ধ সিঁড়ির মুখে চুপ করে একটু দাঁড়িয়ে থাকে। কীসের জন্য যেন উন্মুখ ও উৎকর্ণ হয়ে থাকে। আর হঠাৎ শুনতে পায়, মৃদু একটা সুরের কেঁপে ওঠা। এস্রাজ বেজে উঠল।
নিশ্চিন্তে শমীক সিঁড়ি ভেঙে নামতে থাকে।
.
দুপুরে যখন খেতে হোটেলে ফিরেছিল শমীক তখনও বাবা ফেরেনি। শমীক তাই বেরিয়ে পড়ল। মন ভালো ছিল না। এলোপাথাড়ি ঘুরল কেবল। বাবাজি চললেন। গাছের মতো, স্তম্ভের মতো বাবাজি আর থাকবেন না। তিনটে বোনের বিয়ে বাকি, ভাইরা এখনও নাবালক। কিন্তু সে সমস্যার চেয়ে বড় হচ্ছে শোক। সংসারের অপরিত্যাজ্য, অবিভাজ্য একজন থাকবে না। লোকটা তার প্রেমিকার বাড়িতে সকালে এস্রাজ বাজাতে বসেছিল। জানে না একটা কালো হাত নালি ঘা বেয়ে নেমে যাচ্ছে তার বুকের সুরের উৎসের দিকে। প্রাণঘড়ির কল টিপে বন্ধ করে দেবে। নার্সটা চেঁচিয়ে বলেছিল–ক্যানসার, থার্ড স্টেজ। কিছু করার নেই। সে কথা বাবা কি শোনেনি! কিংবা ডাক্তার মিত্রের লেখা চিঠিখানায় ‘হোপলেস’ শব্দটাও কি দেখেনি। নিশ্চিতভাবে! বড় অবাক লাগে। লোকটা নিশ্চিন্ত মনে এস্রাজ বাজাচ্ছিল আজ সকালেও।
ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল। এসে দেখল, বাবা খুব নিবিষ্ট মনে সুটকেস গোছাচ্ছে! তাকে দেখে আনন্দিত স্বরে বলে–আয়। কোথায় ছিলি!
–ঘুরছিলাম। তুমি দুপুরে ফেরোনি?
–না। ছাড়ে নাকি! দুপুরে খাওয়াল। ঝোলভাত মেখে নরম করে দিল, ঘোল–টোল, শরবৎ, ফলের রস, কত কী!
শমীক হাসে। বলে–ভালো।
বাবার মুখে একটা রক্তাভা। একটু বুঝি হালকা পলকা তার মন। একটা হাওয়া এসে মনের। ওপরকার সব ধুলো উড়িয়ে নিয়ে গেছে। বলল –একটা রাগ শেখাচ্ছিলাম সেই কবে! পুরোটা তখনও তুলতে পারেনি, হঠাৎ বিয়ে হয়ে গেল। আর শেখা হয়নি। আজ সারাদিন সেটা শিখিয়ে দিয়ে এলাম।
–ও।
–অসম্পূর্ণ একটা কাজ সম্পূর্ণ হল।
–খগেনকাকার সঙ্গে দেখা হয়নি?
বাবা একটু গম্ভীর হয়ে বলে–না। সে নাকি অনেক রাতে ফেরে। আমি আর বসলাম। রাত হয়ে যাচ্ছিল।
–রিজার্ভেশন পেয়েছি বাবা। কালকের।
–পেয়েছ। বাঃ নিশ্চিন্ত! বলে বাবা খুব খুশি হয়। বলে—
সব দিক দিয়েই ভালো হল। কী বলিস!
–হ্যাঁ বাবা।
বাবা খুব একরকম উজ্জ্বল হাসে। বিছানার ওপর ছড়ানো নতুন কেনা শাড়ি, প্যান্ট আর পাটের কাপড়, টুকটাক নানান জিনিসের দিকে মমতাভরে তাকিয়ে থাকে বাবা। বলে–জিনিসগুলো খারাপ কিনিনি, না রে? সবাই খুশি হবে।
শমীক একটু দুষ্টুমি করে বলে–কিন্তু অত দামি জিনিস কিনেছ! অত দামি জামাকাপড় তো আমরা কখনও পরি না।
–তা হোক, তা হোক। বাবা খুশির গলায় বলে–আমার তো এটাই শেষ পুজোর বাজার। এবারটায় না হয় দামিই দিলাম।
বড় চমকে যায় শমীক। একদৃষ্টে বাবার দিকে চেয়ে থাকে। তবে কি বাবা জানে! জেনেও
বাবা স্বাভাবিক আছে? এত আনন্দ। অত খুশির মেজাজ। শমীক মনে-মনে বলে, তবে কি জানে বাবা?
বাবা তার দিকে চোখ তুলে চায়। বলে–একটা অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ হল, বুঝলে। কমলাকে রাগটা শিখিয়ে এলাম। মনটা বহুকাল ধরে ভার হয়ে ছিল।
বাবা চুপ করে হাসিমুখে ছেলের দিকে চেয়ে থাকে। শমীক পরিষ্কার বুঝতে পারে, বাবার চোখ নিঃশব্দে তার প্রশ্নের জবাব দিল–জানি হে জানি!
সাঁঝের বেলা
শুষনি শাক তুলতে গিয়ে খেতে সাপ দেখেছিল মেজো বউ। ‘সাপ সাপ’ বলে ধেয়ে আসছিল, বেড়ায় আঁচল আটকে ধড়াস করে পড়ল। পেটে ছ’মাসের বাচ্চা। তাই নিজের ব্যথা ভুলে পেট চেপে কোনও সর্বনাশের কথা ভেবে কেঁদে উঠল চেঁচিয়ে।
