শীতের বেলা। রোদ মরে গিয়ে এ সময়টা বাতাসটা ভারী হয়ে ওঠে। মাটির ভাপ না ধোঁয়া মেঘের মতো মাটির ওপর। ওর ভারী বাতাস। দুঃখের শ্বাসের মতো জমে আছে পৃথিবীর ওপর।
সামন্তমশাই পাকা লোক। জমি একটা পেয়েই যাবে সুবিধে মতো। বর্ষার আগেই ভিত গেঁথে ফেলবে। ভারী একটা আনন্দ হয় হরেনের।
আবার কী জানি কেন রোদমরা বিকেলটার দিকে চেয়ে বুকটা হঠাৎ ঝাঁৎ করে ওঠে। কী একটা যেন মনে হয়, একটু ভয়-ভয় করে। বুকটায় বগড়ি পাখির মতো কী একটা গুরগুর করে ডাকে। পেটটা পাকিয়ে ওঠে।
ভিখিরিদের সংসার, প্ল্যাটফর্মের কৃষ্ণচূড়া গাছ, দূরের সিগন্যাল–এ সবের ওপর দিয়ে আকাশ আর জমির মাঝবরাবর একটা অদ্ভুত আলো-আঁধারি ঘনিয়ে আসছে। ট্রেন রেল-পুল পেরিয়ে আসছে। হরেন চৌধুরী গাড়ির শব্দটা ঠিক শুনতে পায় না। সেই আলো-আঁধারিটার দিকে অন্য মনে চেয়ে থাকে।
সংবাদ : ১৯৭৬
বিশ্ব সেবার কুলু মানালিতে বেড়াচ্ছে যাচ্ছে। দুর্গাপুরে ভালো চাকরি করে, যা মাইনে পায় তার সবটুকুই নিজের পিছনে খরচ করতে পারে। সবসময়ে ঝকঝকে তার জামা কাপড়। নিত্য নতুন।
দেখা হল কল্যাণের অফিসঘরে, যেমন প্রায়ই হত। সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে অনায়াস দক্ষতায় কোনও তরুণ কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ আঁকছিল। মাথা নীচু থাকায় তার বিরল কেশ তালু দেখা যাচ্ছে। কবিতার বইয়ের মলাটে সে ছিল সিদ্ধ।
তার মনোযোগে ঘা দিয়ে প্রশ্ন করি–কী খবর?
তার দাঁত ছিল চমৎকার, কণ্ঠস্বর অল্প ফ্যাঁসফাঁসে আর নীচু পরদায় বাঁধা।
হেসে সে বলে–কুলু মানালি চ লোম।
একা?
–একা। দোকার চেয়ে একাই ভালো। অন্যরা সঙ্গে গেলে নিজের ইচ্ছে মতো ঘোরা যায় না।
আমার মনে একটা দুশ্চিন্তার মেঘ ছায়া ফেলে গেল। বেড়াতে যেতে বরাবরই আমার এক ভয়াতুর অস্বস্তি! তার ওপর কোনও দূর জায়গায় একা যাওয়া তো আরও অসম্ভব।
বললাম–একা যাচ্ছেন, যদি বাইরে গিয়ে কোনও বিপদ–আপদ হয়?
–বিপদ আবার কী? বিপদ টিপদের কথা ভাবি না। একা বেড়াতেই বেশ লাগে।
–অনেক দূর! দ্বিধাভরে বলি।
–দূরই তো ভালো। নতুন একটা ক্যামেরা কিনেছি, আসাহি পেন্টাক্স। ক্যামেরার কথা জানতাম। বললাম–কত পড়ল যেন?
–দুই চেয়েছিল। আঠারোশো দেব ঠিক করেছি। যা ছবি তুলে আনব না, দেখবেন। চারটে কালার রোল নিয়ে যাচ্ছি। আমার ম্যামিয়া ক্যামেরাটা বেচে দেব। আপনি কিনবেন বলেছিলেন। কী হল?
আমার এক জার্মান ক্যামেরা ছিল বহুকাল আগে। পূর্ণ দাস রোডের মেসে থাকবার সময়ে সেটা কোনও উপকারী সঙ্গী হাতসা ফাঁই করে। তারপর থেকে ক্যামেরার জন্য একট অভাববোধ থেকে গেছে।
বললাম–ম্যামিয়া ক্যামেরাটা বড্ড ভালো। কিনবার ইচ্ছেও ছিল। কিন্তু টাকা কোথায় পাব?
–রেখে দিন না! টাকা না হয় পরে দেবেন।
একটু ভাবি। ক্যামেরাটার দাম বিশ্ব চেয়েছে আটশো টাকা। অতগুলো টাকা একসঙ্গে দেওয়া! একটু ভাবতে হয়। ক্যামেরা মানেই তো খরচ।
বললাম–আপনি ঘুরে আসুন দেখা যাবে।
বিশ্ব একটা চমৎকার কাঠকয়লা রঙে আস্তরণ দিল প্রচ্ছদের ভূমিতে। মিষ্টি হয়ে গেল এযাবৎ ভুতুড়ে ছবিটা। আঁকিয়েরা পারেও বটে ম্যাজিক দেখাতে।
তুলি দিয়ে রং এদিক-ওদিক টেনে দিতে-দিতেই বলল –প্রায়ই ক্যামেরটার জন্য খদ্দের আসছে। আপনার জন্যই ধরে রেখেছি। পাশের অফিসের ভটচায্যিই চাইছে, হাজার দেবে।
একটু লোভ শরীরে কিলবিল করে উঠল। নেব?
কিন্তু বরাবরই যে কোনও কাজের আগে, সিদ্ধান্তের আগে আমি একটু ভাবি। তার ফলেই আমি কিছু ধীর, অপটু এবং ব্যর্থ। দ্বিধা যে মানুষের কত বড় শত্রু।
অনেক ভেবে বললাম–না এক্ষুনি বলতে পারছি না। বরং ভটচায্যিকেই দিয়ে দিন।
–দেব?
–দিন।
বাকি দশ মিনিটে বিশ্ব প্রচ্ছদটা শেষ করল। অসাধারণ এক মলাট এঁকেছে সে। আগাগোড়া কথা বলতে-বলতে, আধা–অন্যমনস্কতায়।
মলাটটা আমার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বলল –কেমন হল?
–দারুণ।
–তবু কমার্শিয়াল কনসার্নগুলো আমায় কাজ দেয় না।
–আমি চেষ্টা করব। কয়েকজন চেনা আছে।
–দেখবেন তো।
–বিয়ে কবে করছেন?
বিশ্ব ভারী লাজুক, হেসে বলল –এই তোশিগগিরই।
–মেয়ে তো ঠিক হয়ে আছে। দেখতে কেমন?
–মোটামুটি।
–আপনি দেখেছেন?
–হ্যাঁ।
ওর মুখভাব দেখে মনে হয়েছিল, পাত্রী পছন্দই হয়েছে।
সেই দেখা হওয়ার পর মাঝে-মাঝেই মনে হত, একা কুলু মানালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ব ভালো করেনি। অত দূরে গিয়ে যদি অসুখ করে তো কে দেখবে? যদি দুর্ঘটনায় পড়ে তবে?
ক্যামেরাটার কথাও প্রায়ই মনে হয়েছে। ছেড়ে দিয়ে খারাপ হল। নিয়ে নিলেই হত। যাওয়ার আগে ক্যামেরাটা ভটচায্যিকে দিয়ে গেছে বিশ্ব। এখন আর কিছু করার নেই।
মাসখানেক বাদে ডিউক রেস্তোঁরায় দুপুরবেলা আড্ডাধারীদের খোঁজে হানা দিতেই মাধুর সঙ্গে দেখা। বলল –বিশ্ব মারা গেছে জানেন?
–কুলু মানালিতে?
–না, না। সেখান থেকে কয়েকদিন আগে ফিরে এসেছে। অনেক ফটো তুলে এনেছে, দেখাল।
–তবে?
–মারা গেছে হাওড়ায়, বাস অ্যাকসিডেন্টে।
রেগে গিয়ে বলি–এ হয় না। ভুল খবর।
–কল্যাণকে জিগ্যেস করবেন। আমরা হাসপাতাল যাইনি, ও গেছে। সন্ধেবেলা কল্যাণ এসে বলল –বিশ্বকে শেষ করে এলাম।
–কী দেখলেন?
–কিছু না। খুব নর্মাল মুখচোখ। কোথাও থেঁতলে বা কেটে যা ভেঙে যায়নি। নাক দিয়ে সামান্য রক্ত গড়াচ্ছিল। কেউ কিছু বলতে পারছে না।
