ছোট পরিবারই সুখী পরিবার বলে বটে, কিন্তু হরেনের মনে ধন্দটা যায়নি। সামন্তমশাইয়ের বাড়ির দৃশ্যটা দেখে কি জানি কেন হরেনের বুকটায় মেঘ জমে ওঠে। এইরকম একটা হাটখোলায় সে মানুষ হয়েছিল। সুখে নয়, আবার তেমন সুখ আর পাবেও না।
দীর্ঘশ্বাস চেপে সে দু-কদম এগোল। বারান্দার নীচে নর্দমা, তাতে একটা নীল বল পড়ে আছে। উঠোনে ফাটা বেলুনের রবার ন্যাতার মতো, একটা ছাগল ঘাস থেকে মুখ তুলে হরেনের চোখে চোখ রাখে। কোনও বিধবার রোদে–দেওয়া কাপড় অশুচি করেছে হতচ্ছাড়া কাক, বুড়ি দোতলার রেলিং ধরে ঝুঁকে চেঁচাচ্ছে বলি নেন্ডি, কাকে ছোঁয়া কাপড় মা, রাঁড়ি বলে তো আর মানুষের বাইরে যাইনি, তখন থেকে বলছি, বোনা হয় গঙ্গাজলের ছিটে দে…
হরেন নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে।
বোঝা যায় যে, এ-বাড়িতে লোকের যাতায়াত বিস্তর। সে যে ঢুকে এসে দাঁড়িয়ে আছে কেউ গ্রাহ্যই করে না। যেন বা বাড়ির লোক। জয়েন্ট ফ্যামিলিতে বাড়ির লোক আর বাইরের লোক চেনা ভারী মুশকিল। কেউ অচেনা এসে দাঁড়ালে ছোটবউ ভাবে বড় বউর কাছে এসেছে, বাপ ভাবে ছেলের কাছে এসেছ, ভাই ভাবে দাদার কাছে এসেছে। কেউ গা করে না।
গলা খাঁকারি দিয়ে–দিয়ে গলায় ব্যথা। বাচ্চাগুলোকে জিগ্যেস করার চেষ্টা বৃথা। তারা আরও ব্যস্ত।
মিনিটদশেক ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে একটা চলতি বাচ্চাকে থামিয়ে জিগ্যেস করতে হদিস পাওয়া গেল। নেত্য থাকে দোতলার ঘরে। ‘ওই সিঁড়ি বেয়ে উঠে যান, ঘর খোলা আছে, কাকামশাই এ সময়ে অঙ্ক কষেন।’ বলে বাচ্চাটা উঠোনে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
সিঁড়ি চটা ওঠা। হয় সিমেন্ট পায়ে-পায়ে উঠে গেছে, নয়তো লাগানোই হয়নি। গোয়াল সকলের, ধোঁয়া দেবে কে।
দোতলার ঘরে নেত্য সামন্তর অফিস কাম বেডরুম। ঘরটায় তক্তপোশ আছে, টেবিল চেয়ারও। কিন্তু দলিল দস্তাবেজ, মুসাবিদা আর মামলার কাগজে ছয়লাপ। টেবিল–চেয়ার ডাঁই, বিছানাও অর্ধেক দখল নিয়েছে কাগজেরা। থলথলে চেহারার কালো মতো নেত্যগোপাল মেঝেয় বসে চৌকির ওপর গ্রীবা তুলে জিরাফের ভঙ্গিতে–হ্যাঁ-অঙ্কই কষছে বটে। আসলে ফর্দ। কীসের ফর্দ তা অবশ্য দেখার চেষ্টা করে না হরেন।
–কী চাই আজ্ঞে?
–নেত্যগোপাল সামন্তমশাই কি আপনি?
–আজ্ঞে।
–এসেছিলাম একটু বিষয় ব্যাপারে—
নিত্য বা নেত্যগোপাল ঘাবড়ায় না। নিত্যকর্ম। ফর্দটা মুড়ে রেখে বলে–আসুন।
–বসুন। বলে নেত্যগোপাল বিড়ি ধরায়। তারপর বলে–বলুন। –
-একটু বাস্তুজমি।
–জমি?
–আজ্ঞে। হুবহু নেত্যগোপালের অনুকরণ করে হরেন বলে।
–খরচাপাতি কীরকম? এলাকা? তৈরি বা পুরোনো বাড়ি চলবে না?
–চলবে, তবে তিনতলার ভিত হওয়া চাই।
নেত্যগোপাল হাসল। হাতের বিড়িটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল একটু। তারপর বলল –যারা বাড়ি করে তারা তিন কি চারতলার ভিতই গাঁথে, সে একতলা বাড়ি করলেও। শেষপর্যন্ত আর তিন-চারতলা হয়ে ওঠে না। বেশিরভাগই টাকার অভাবে য–তলার ভিত তার আদ্দেক উঠে ফুরিয়ে যায়। মাটির তলায় বৃথা টাকা খরচ।
হরেন চুপ করে রইল। তিনতলাটা তার চাই-ই।
–আমাদের বাড়িরই সেই দশা। মাটির নীচে হাজার পনেরো-বিশ টাকা ওপরেতে ঠেঙে ভূতে–পাওয়া বাড়ি। বলে হাসল নেত্যগোপাল।
হরেনও হাসল। কারণ নেই। তারপর হঠাৎ, দালালের সামনে বেশি হাসা উচিত নয় ভেবে গম্ভীর হয়ে বলল –তবে বাড়ির চেয়ে জমিই ভালো। পছন্দমতো করা যাবে।
–কী রকম করতে চান?
–একতলায় দুটো দোকানের প্রভিশন থাকবে, আর গ্যারেজ। দোতলায় দুটো ফ্ল্যাট, তিনতলাটা আমার। ওটা
নেত্য বা নিত্যগোপাল বিড়িটা মন দিয়ে দেখে। চোখ ছোট, কপালে লম্বা কোঁচকানো দাগ।
–শুনছেন? হরেন সন্দেহবশত জিগ্যেস করে।
–শুনেছি। বলে নেত্যগোপাল।
–তিনতলাটায় চতুর্দিকে বারান্দা টারান্দা হবে, চিলে কোঠার পাশে চারতলায় হবে ঠাকুরঘর।
নেত্যগোপাল শ্বাস ছাড়ল। কথাবার্তায় আরও সময় গেল খানিক। আগামপত্তর করতে হল কিছু। পেয়ে যাবে হরেন। বর্ষার আগেই ভিত গেঁথে ফেলতে পারবে। নেত্যগোপালের দু-হাতের দশটা আঙুলের নখে নখে কলকাতার মাটি লেগে আছে। কলকাতার জমি ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই এক খামচা তুলে নিতে পারবে বলে ভরসা হয় হরেনের। একতলার দুটো দোকানঘরের একটাতে বসাবে গবেট বড় ছেলেটাকে। গ্যারেজটা অবিশ্যি খালিই পড়ে থাকবে এখন, যদি ভগবান কখনও সুদিন দেন…। গরু পুষবার বড় শখ ছিল তার। হবে না। গরু, সবজিখেত, হাঁস-মুরগি এসবের জন্য মফসসলের দিকে কাঁদাল জায়গাই পছন্দ ছিল তার, কিন্তু গিন্নির শখ কলকাতায় থাকবে। থাকো তাই। হরেনের গোরু তাই বাদ গেল। একটা শ্বাস পড়ে যায়। বাপ-দাদার সঙ্গে চিরকালের মতো ছাড়ান কাটান হয়ে যাচ্ছে। যাক। এজমালি সংসারের লোভী মুখখানার হাঁ আর যে বন্ধই হয় না। বাবা গত এগারো বছর বসে আছে, দাদা হাইকোর্টে ফোলিও টাইপ করে বুড়ো হয়ে গেল। পরের ভাই মোটরমিস্ত্রি, তার ওপর লাভ ম্যারেজের দজ্জাল বউ। থাকা যায় না একসঙ্গে। পয়সাকড়িতে রোজগারে, ওর মধ্যে হরেনেরই যা হোক একটু চিকিমিকি। বউ তাই রোজই সাবধান করে–এই বেলা ভেন্ন হও, নইলে সব তোমার ঘাড়েই হামলে থাকবে।
বুড়োটা নীচের বারান্দায় খেতে বসেছে। বাটিতে চিঁড়ের জাউ কিংবা সাগু–কিছু একটা হবে। সপসপে জিনিসটা হাতের কোষে তুলে ভয়ঙ্কর মুখখানা হাঁ করে সড়াৎ টেনে নিচ্ছে। এই বয়সে খাওয়া বাড়ে। বাড়লেই বুঝতে হয়, দিন শেষ হয়ে আসছে। হরেন মুখটা ফিরিয়ে নেয়।
