আমি ভীষণ উত্তেজিতভাবে বলি–মিস্টার লুলু, আপনি এসব কী বলছেন এ যে সরকারের অসম্মান।
লুলু উঠে দাঁড়ায় এবং জানলার কাছে গিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলে–সাংবাদিক, এসো দ্যাখো এসে বাইরে কী সুন্দর দৃশ্য।
আমি মহান লুলুর আদেশে জানলার কাছে যাই।
মুহূর্তে দুর্দান্ত লুলু আমাকে পাঁজাকোলে তুলে গরাদহীন জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দেয়। আমি বিকট একটা চিৎকার করে চোখ বুজে ফেলি।
কিন্তু পড়লাম না। লুলু আমার একটা হাত ধরে রেখেছে। একমাত্র লুলুর হাতটিই আমার অবলম্বন, পায়ের তলায় পাঁচতলার শূন্যতা। আমি ঊর্ধ্বমুখ হয়ে কাতর স্বরে বলি–হে মহান লুলু, হে দয়ালু লুলু, আমাকে তুলুন।
লুলু আমাকে ধরেই থাকে। ঠিক যেমন দেখেছিলাম ‘টু ক্যাচ এ থিফ’ ছবিতে। ক্যারি গ্র্যান্ট বাড়ির ছাদ থেকে একটা চোর মেয়েকে ঝুলিয়ে রেখে যেভাবে স্বীকারোক্তি আদায় করেছিল, ঠিক সেইভাবেই লুলু বলল –বলো প্রিয় সাংবাদিক, দিল্লির বা রাজ্যের সরকার এখন তোমার জন্য কী করছে! তুমি যদি এখন মরে যাও তাহলে সরকার কতটা ধাক্কা খাবে? কিংবা তুমি মরে গেলে কি না সেই সংবাদ কি প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির কাছে কোনওদিন পৌঁছোবে? তুমি যে আছ তাই তাঁরা জানবেন না।
ঝুলতে ঝুলতে আমি লুলুর কথার সত্যতা খানিকটা বুঝতে পারি। বলি–মহান আপনার কথা অতি সত্য।
–মূর্খ সাংবাদিক, সরকার-সরকার বলে দিনরাত তোমরা চেঁচিয়ে বেড়াচ্ছ কিন্তু কোনওদিন বুঝলে না সরকার নয়, তুমি বেঁচে আছ নিজেরই দায়িত্বে। তুমিই তোমার বেঁচে থাকা বা মরে যাওয়ার জন্য দায়ী। তুমি কবে বুঝবে সরকার নয়, তোমার পাশেপাশের সামনের ও পিছনের জনগণই তোমাকে দেখছে, দয়া করছে, ঘৃণা করছে, খুন করছে আবার ভালোও বাসছে। মূর্খ, আমি সেই জনগণের এক প্রতিনিধি হয়ে তোমাকে আজ জিগ্যেস করি, বলল , তুমি এদেশে রাষ্ট্রমুক্ত সমাজের কথা মানে কি না!
আমি নীচের প্রকাণ্ড শূন্যতার দিকে চেয়ে আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠি–মানি।
–বলো গণতন্ত্রের জয়।
–গণতন্ত্রের জয়।
–বলো তুমিই সেই জনগণ।
–আমিই সেই জনগণ।
এরপর মহান লুলু আমাকে টেনে তোলে। তারপর ব্যক্তি স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার ও গণতন্ত্রের অর্থ বুঝতে আমার আর দেরি হয়নি।
লড়াই
পালান আমাদের খেতে কাজ করে।
সে ভালো লোক কি মন্দ লোক তা বোঝা খুব মুশকিল। তবে সে জানে খুব ভালো মাঞ্জা দিতে, মাছের এক নম্বর চার তৈরি করতে, কাঠমিস্ত্রির কাজও তার বেশ জানা, আর পারে গভীর ভাঙা গলায় গেঁয়ো গান গাইতে।
পালান গাছের নারকেল চুরি করে বেচে দিয়ে আসে। নিশুতরাতে পুকুরে জাল ফেলে মাছ তুলে নিয়ে যায়, খেতের ফসল চুরি করে। কিন্তু ধরা পড়লেই দোষ স্বীকার করে পায়ে ধরে ক্ষমা চায়। অনেক কাজের কাজী বলে আর তার হাসিটি বড় নির্দোষ আর সরল বলে দাদু তাকে তাড়ায় না।
আমাদের দিশি কুকুরটার নাম ঘেউ। ভারী তেজি কুকুর। মেজকাকা যখন বিয়ে করে কাকিমাকে ঘরে আনলেন—বেশিদিনের কথা নয়—তখন কাকিমার বড়লোক বাপের বাড়ি থেকে যেমন হাজাররকমের দামি জিনিস দিয়েছিল তেমনি আবার দুটো প্রাণীও দিয়েছিল সঙ্গে। এক প্রাণী হল এক যুবতী ঝি, তার নাম অধরা, অন্য প্রাণীটি হল ঘেউ।
ঘেউয়ের রং সাদা, চেহারা বিশাল আর চোখ রক্তবর্ণ। সে আসবার পর থেকে এ বাড়িতে বাইরের লোক আসা প্রায় বন্ধ। ঘেউ ডাকে কম কিন্তু কামড়ায় বেশি। সে আসার পর থেকে এ বাড়িতে অন্য বাড়ির ছেলেরা আসে না, অন্যের কুকুর-গরু আসা বন্ধ। হাঁস-মুরগি পর্যন্ত ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছে।
মেজকাকিমা বড় সুন্দরী। হাঁটু পর্যন্ত এক ঢাল চুল, দুধে-আলতায় গায়ের রং, রূপকথার রাজকন্যের মতো চেহারা। তিনি আস্তে হাঁটেন, কম কথা বলেন, দুটো বড়-বড় চোখে মাঝে-মাঝে অবাক হয়ে চারধার দেখেন। জেঠিমা, মা, বড়কাকিমা যখন উদয়াস্ত সংসারের কাজ করছেন তখন মেজকাকিমা শুয়ে বসে বই পড়ে সময় কাটান। তাঁর ছাড়া কাপড় অধরা কেচে মেলে দেয়, চুল আঁচড়ে দেয়, আলতা পরিয়ে দেয়। সবাই গোপনে বলে, নতুন বউ কারও বশ মানবে না।
তা হোক, তবু মেজকাকিমাকে আমাদের বড় পছন্দ। তাঁর কাছে জিনিস কেনার পয়সা চাইলেই পাই। শিশুদের তিনি বড় ভালোবাসেন। প্রায়ই মিষ্টি কিনে এনে আমাদের খাওয়ান।
আমার দাদুর অনেক পয়সা। লোকে তাকে বিরাট ধনী বলে জানে। কিন্তু বড়লোকদের মতো চালচলন দাদুর নয়। যেটুকু সময় ওকালতি করেন সেটুকু বাদ দিলে অন্য সময়ে তার হেঁটো ধুতি, খালি গা—আর হাতে হয় দা নয়তো কোদাল কিংবা বেড়া বাঁধবার বাঁখারির গোছা। দাদু কখনও বিশ্রাম করতে ভালোবাসেন না। বলেন, বিশ্রাম এক ধরনের মৃত্যু। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে চার ঘণ্টা ঘুমোবে। বাকি সময়টায় কাজ করবে।
পালান আর ঘেউ দাদুর ছায়া হয়ে ঘোরে। বাড়িতে ধোপা নাপিত এলে ঘেউ তাদের তাড়া করবেই। তখন দাদু বা পালান তাকে ধমক দিলে তবেই ক্ষান্ত হয়। অন্য কারও ধমককে সে গ্রাহ্য করে না, এমনকী মেজকাকিমা বা অধরার ধমককেও নয়। তাই মেজকাকিমা একদিন রাগ করে অধরাকে বললেন বাপের বাড়িতে থাকতে ঘেউ আমার কত বাধ্য ছিল। এখন বেয়াড়া হয়েছে। অধরা, ওকে এখন থেকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখবি।
মেজকাকা কাকিমাকে বড় ভয় পেতেন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলতে গেলে প্রায়ই চোখে চোখে তাকাতে পারতেন না। কাকিমা তাঁকে শেকল কেনার কথা বলতে কাকা খুব মজবুত বিলেতি শেকল কিনে এনে দিলেন। ঘেউ বাঁধা পড়ল।
