লুলু হাসল। আমার শরীরে ঘাম দিল। শ্বাস ছেড়ে আমি বললাম কত টাকা?
–দু-লাখ।
লুলু রিভলভার পকেটে পুরে নিয়ে আলমারি খুলল। কয়েকটা নোটের বান্ডিল আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল –এই টাকা দিয়ে একদিন আমি জিনিকে কিনে নিয়েছিলাম। এই টাকার হুকুমেই জিনি তার অন্য সব প্রেমিককে ভাগিয়ে দিয়েছিল। আজ সেই টাকায় তোমাকে কিনছি রিপোর্টার। কে জানে এই টাকাতেই কখনও আর-একজনকে কিনতে হবে কি না।
আমি টাকার বান্ডিলগুলো ছুঁয়ে থেকে একটু শিউরে উঠি। বলি–আপনি আমাকে ওয়ার্নিং দিচ্ছেন না তো মিস্টার লুলু?
লুলু গম্ভীর হয়ে বলে–না। কিন্তু এ ধরনের রোজগারে কিছু রিস্ক যেসব সময়েই থাকে, তা আপনাকে মনে করিয়ে দিলাম।
আমি গম্ভীর হয়ে বলি–আমাকে ভয় দেখাবেন না মিস্টার লুলু, আমার হার্ট খুব ভালো নয়।
লুলু কাঁধ ঝাঁকিয়ে পুরো প্রসঙ্গটি অবহেলায় ঝেড়ে ফেলে বলে–আপনি নাগরিক অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কে কী যেন জানতে চাইছিলেন?
পাশেরই ঘরেই হয়তো জিনির মৃতদেহ পড়ে আছে। পরিস্থিতিটা খুবই অস্বাভাবিক। তবু নিজের কর্তব্যে অবিচল থেকে আমি নোটবই বের করি এবং আগ্রহের গলায় বলি–দয়া করে বলুন।
কিন্তু পরমুহূর্তেই আনমনা হয়ে যায় লুলু। টাইয়ের ল্যাজে আদর করে হাত বোলাতে বোলাতে উলটোদিকের সোফায় বসে আপনমনে বলতে থাকে–ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়ে মানুষেরে, ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়ে মানুষেরে, অবহেলা করে দেখিয়াছি মেয়ে-মানুষেরে…
–মানে? আমি কিছু অবাক হই।
লুলু হাই তুলে বলে–লিখে নাও, আমরা চাই ভালোবাসার বা সঙ্গমের স্বাধীনতা, ঘৃণা করার স্বাধীনতা, খুন করার স্বাধীনতা।
মিস্টার লুলু! আমি মহান লুলুকে তার মন্তব্য সম্পর্কে সাবধান করার জন্য একটু ধমকের সুরে বলি।
লুলু আমার দিকে অবাক চোখে চেয়ে বলে–তুমিও কি তাই–ই চাও না রিপোর্টার? ভেবে দ্যাখো, খুব ভালো করে ভেবে দ্যাখো, একজন অ্যাভারেজ ভারতবাসী–সে চাকুরে, বেকার বা পলিটিক্যাল ওয়ার্কার যাই হোক তার মোটামুটি চাহিদাটা কী? সে কীসের স্বাধীনতা চায়? কীসের অধিকার তার কাম্য? ভেবে দ্যাখো রিপোর্টার, ব্যক্তিগত জীবনে তুমিও চাও ভালোবাসা বা আনন্দের স্বাধীনতা। এরপর সামাজিক জীবনের কথা ভেবে দ্যাখো। দেখবে প্রতিনিয়ত রোজ-রোজ রাস্তায়, ঘাটে, অফিসে দফতরে যত লোকের সঙ্গে তুমি মুখোমুখি হচ্ছে, তাদের প্রায় অধিকাংশকেই তুমি ঘৃণা করো কি না। করো, তার কারণ তাদের অধিকাংশের আচার ব্যবহার, কথা, ইডিওলজির সঙ্গে তোমার চিন্তা বা বিশ্বাসের অমিল, তোমার স্ত্রী বা প্রেমিকা–যাদের কাছ থেকে তুমি যতটা চাও, তার অর্ধেকও পাও না তাদের কাউকে তুমি জেনুইনলি খুন করতে চাও। কি না। এবং সেই হননেচ্ছাকে প্রতিদিন তুমি ভদ্রতাবোধ, শিষ্টাচার, মায়া–মমতা ইত্যাদি দিয়ে চাপা দিয়ে রাখছ কি না। ধরো, যদি আজ একটা আইন করে বলা হয়, কেউ খুন করলে তার ফাঁসি বা জেল হবে না, কোনও শাস্তিই দেওয়া হবে না তাকে, তাহলে তোমার কি মনে হয় না যে। আইন পাশ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে সারা দেশে লক্ষ-লক্ষ লাশ পড়ে যাবে?
–আমি জানি না মিস্টার লুলু।
–জানো জানো, স্বীকার করো না। বুদ্ধ রিপোর্টার, আমরা আসলে এই স্বাধীনতাগুলি চাই। লিখে নাও।
আমি ঘামতে-ঘামতে লিখতে থাকি।
লুলু উঠে দাঁড়ায় এবং ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে যায়। আমি লিখতে গিয়ে দেরি করে ফেলি। কোনওক্রমে লুলুর শেষ কথাগুলি টুকে নিয়ে যখন ধাঁ করে উঠে দাঁড়াই, তখনই হঠাৎ সামনে দেখি জিনির ভূত দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়ানো। মুখে লোল হাসি এবং বিলোল মুগ্ধতা।
ভয় পেয়ে আমি আবার সোফায় বসে পড়ে আড়াই লাখ টাকায় গর্ভবতী আমার ব্রিফকেস চেপে ধরি বুকে। জিনি এসে আমার পাশে বসে। আমাকে ছোঁয় এবং বলে–আই অ্যাম ফর সেল।
–তুমি মরোনি জিনি? আমি বলি।
–মরেছি হাজার মরণে। জিনি বলে এবং হাসে।
আমি বুঝতে পারি যে, আড়াই লাখ টাকা আমি রোজগার করতে পারিনি। বুঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। কিছুদিন আগে রাইটার্স বিল্ডিংসে আমি একজন মন্ত্রীর ব্রিফিং নিতে যাই। মন্ত্রীর সঙ্গেই যখন করিডোরে বেরিয়ে আসি, তখন বাইরেটা ঘন মেঘে কালো, তুমুল বৃষ্টি দেখতে থাকি। উনি তখন বলছিলেন, ন্যাশনাল ইনমেন্টের ফাংশনে দেওয়া ওঁর বক্তৃতাটা আমি কাগজে সবটুকু দেব কি না। আমি ওঁকে আশ্বাস দিচ্ছিলাম। আর তখন হঠাৎ সেই বর্ষা সমাগমের সৌন্দর্য দেখে আনন্দিত মন্ত্রী গুনগুন করে গেয়ে ওঠেন–আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে…। ঋতু বিচার করলে খুবই ভুল গান। কিন্তু তবু সেই অতুলন বৃষ্টির দৃশ্য দেখে তাঁর হৃদয় যে নেচেছিল, তা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। কিছুক্ষণ উনি তো কাগজে ওঁর স্টেটমেন্টের কতটা ছাপা হবে, সেই দুশ্চিন্তা ভুলেছিলেন।
বলতে কি আমিও এই প্রবল সংকটের সময়ে গুনগুন করে গেয়ে ফেললাম–আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে…
জিনি এগিয়ে আসে। মুখে–চোখে বিহুল আসঙ্গলিপ্সা, সম্মোহিত লিত বিভঙ্গ। আমিও কী রকম হয়ে যেতে থাকলাম।
কয়েক মাসের মধ্যেই জিনি তার আড়াই লাখ টাকা আমার কাছ থেকে বের করে নিল।
কংগ্রেসের বিপুল পরাজয় ও জনতা পার্টির ক্ষমতায় আসার পর আমি আবার লুলুর কাছে। যাই। দেখি, মহান লুলু আগের মতোই তার চেয়ারে বসে, টেবিলের ওপর পা।
