বনমালী যে একদিন ফিরিওলা ছিল তা বোধহয় অতসী ভুলতে পারে না। দোষ নেই। নিজের অবস্থাকে আজও তো নিজেই সঠিক বিশ্বাস করতে পারে না বনমালী!
স্বপ্ন! সবই স্বপ্ন। মার্বেল মাজা বাথরুমে হাতমুখ ধুয়ে ওডিকোলোন আর দামি পাউডারের গুঁড়ো গায়ে মেখে কিছুক্ষণ বারান্দায় বসে বনমালী। বাগানে জ্যোৎস্না পড়ে, ফুলের গন্ধ আসে। নিজের গা থেকে প্রসাধনের গন্ধ ছড়ায়। পাশেই হেলানো চেয়ারে বসে থাকা অতসীর গয়নার টুং টুংশোনা যায়। স্বপ্ন ছাড়া আর কী!
টেবিলে বসে রাতের খাবার খায় সে। মোদকের নেশার রেশটা তখনও থাকে। খাবারের স্বাদ ভারী ভালো লাগে। ছেলেমেয়েরা সব ইংরেজি স্কুলে পড়ে। অতসীর কড়া নিয়ম, বাড়িতেও ভাইবোনেরা পারতপক্ষে ইংরেজিতে কথা বলবে। খাওয়ার টেবিলের এধারে-ওধারে ছেলেমেয়েরা পরস্পরের দিকে ইংরেজি কথা ছুড়ে দেয়, লুফে নেয়, বাবার দিকে চেয়ে হাসে। বনমালী ভালো বোঝে না, কিন্তু ভারী একটা সুখ হয়। সেও হাসে। এ যেন কোনও-না-কোনও বড়লোকের সাহেবি কেতার খাওয়ার ঘরে তার মতো উটকো এক লোকের নিমন্ত্রণ, অস্বস্তিটা মোদকটাকে ধাক্কা মারে, নেশাটা ফিকে হয়ে আসে প্রায়। তবু হাসে বনমালী, সুখও হয়।
সত্যচরণ মাঝে-মাঝে দুহাতের বুড়ো আঙুল অশ্লীল ভঙ্গিতে নেড়ে তাকে দেখিয়ে বলে—এত যে করলে হে, কিছুই তোমার নয়। যখন পটল প্লাক করার সময় হবে তখন বুঝবে কী গু-খোরের কাজই করেছ একটা জীবন। নিজেকেই জানলে না বনমালী।
ফক্কড়। সত্যচরণের কথা ভাবতেই তার ওই শব্দটাই কেবল মনে আসে। রাতে ভালো ঘুম হয় বনমালীর। চারদিক নিশুত হয়ে গেলে সারা বাড়ি জুড়ে কে যেন, কারা যেন কেবলই খুটখাট শব্দ করে। উদ্বেগ। মহাজনের মেয়ে তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে এক খাটে ঘুমোয়। বনমালীর ঘর আলাদা, বিছানাও, তবু পাছে মহাজনের মেয়ের ঘুম ভাঙে সেই ভয়ে বনমালী বাতি জ্বালে না। টর্চ জ্বেলে-জ্বেলে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। দরজা-জানলা ঠেলে দেখে, গ্রিলের দরজার তালা নেড়ে দেখে। আবার শোয়, ঝিমুনি আসে। আবার শব্দ পেয়ে ওঠে।
জ্যোৎস্না ফুটেছে খুব। অন্ধকারে ভূতের মতো ঘর থেকে ঘরে ঘুরতে-ঘুরতে বনমালী তার বিষয়-সম্পত্তি দেখতে পায়। দেখে বাগানের জ্যোৎস্না। সুখ তাকে খামচে ধরে। সুখ তাকে যন্ত্রণা। দেয়। সত্যচরণ বলে—একটা জীবন পরের ঘরেই বাস করল বনমালী, সেটা টেরই পেল না। ফক্কড়, কে কার ঘরে বাস করে দেখে যা হারামজাদা। চিরকাল মদ-মেয়েমানুষের পিছনে উচ্ছন্নে গেলি! থু!
বেঁটে একটা ডেশান্ড কুকুর আছে অতসীর। কর্মের নয়। কেবল হাত-পা চাটে, আর পায়ে পায়ে ঘোরে। মাঝে-মাঝে ভুক-ভুক করে নরম আদুরে আওয়াজ ছাড়ে। বনমালীর সঙ্গে প্রায়। রাতেই সেটাও ইঁদুরের মতো বেঁটে-বেঁটে পায়ে তুরতুর করে ঘোরে।
ছাদের সিঁড়িঘরের দরজা দেখে পিছু ফিরতেই সে কুকুরটার লেজ মাড়িয়ে দিল। বলল—আঃ হাঃ, ব্যথা পাসনি তো! কুকুরটা আদুরে আওয়াজ ছাড়ে। গ্রিলের গেট-এ একটা শব্দ হয়। কে যেন। দরজা নাড়ে।
বনমালী টর্চ জ্বেলে নেমে আসে। কুকুরটা দৌড়ে গিয়ে ভয় পেয়ে ফিরে আসে। পায়ের চারধারে ঘোরে। বনমালী গাল দেয়–ব্যাটা নিষ্কর্মা।
সদরটা খুলে বারান্দায় পা দিতেই ভীষণ চমকে যায় বনমালী। কোলকুঁজো এক মানুষ, গ্রিলের ওধারে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে।
চিলের মতো চিল্কার করে সে–কে?
ছায়াটা ফিসফিস করে বলে—দাদা, আমি গো, আমি হরিপদ।
বনমালী ভারী অবাক হয়,–হরিপদ? এত রাতে তুই কোত্থেকে?
—একবার বাড়ি চলো, মার অবস্থা খুব খারাপ।
—মা? বনমালী যেন কিছুক্ষণ বুঝতে পারে না। বাগবাজারের দোকান কি মাকালতলার বাড়ি জুড়ে তার যে জীবন তাতে মা তো নেই!
—অবস্থা কেমন বললি?
—ভালো নয়। অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। রাত বোধহয় কাটবে না।
বনমালী চাবি এনে দরজা খোলে। চোরের মতো সাবধানে ঢোকে হরিপদ। এইসব বাড়িঘর দেখে তাদের অভ্যাস নেই, দাদা-বউদি নিষ্পর! বলে–কুকুর সামলাও।
–কামড়াবে না, ঘরে আয়। শব্দ সাড়া করিস না, তোর বউদির আবার পাতলা ঘুম।
অন্ধকারেই মাথা নাড়ে হরিপদ–না, না, সেসব আমরা জানি।
ঘরে এসে দুই ভাই অন্ধকারে মুখোমুখি বসে। বাতি জ্বালে না বনমালী, মহাজনের মেয়ের ঘুম বড় পাতলা।
–কী হয়েছে?
হরিপদ মাথা নীচু করে বলে—কী আর হবে। বুড়ো হয়েছে! বয়সটাই তো রোগ। যেবার বাবা ফেঁপে-ফুলে মরে গেল, সেই থেকে মা আর মা নেই। তুমি তো অতশত খবর রাখে না। মার বড় টান ছিল তোমার ওপর।
ফিসফিস করে বনমালী জিগ্যেস করে—কীরকম টান?
হরিপদ বলে—দেরি কোরো না দাদা, যদি যেতে চাও তো চলো, সাড়ে বারোটায় শেষ ট্রেন। যদি তুমি না যাও, আমাকে ফিরতেই হবে।
বনমালী তবু ওঠে না, একটু চুপ করে থেকে বলে—যাচ্ছি। টানের কথাটা কী যেন বলছিলি!
—মার খুব টান ছিল তোমার ওপর। প্রায়দিনই তালের বড়াটা, নারকোলের নাড়ুটা বানিয়ে কৌটোয় ভরে আমাদের সঙ্গে দিয়ে দিত তোমাকে দেওয়ার জন্য।
—তোরা কখনও দিসনি তো!
—দেব কী! বউদি রাগারাগি করবে হয়তো, আর সেসব কি এখন আর তোমরা খাও! ভালো ভালো খাবার তোমাদের। আমরা তাই সেসব নিজেরাই লুকিয়ে খেয়ে ফেলতাম। তবু মা মরে মরে তৈরি করত। কতদিন তোমাকে দেখতে চেয়েছে! গত তিন-চার মাস একটানা মা তোমাকে দেখেনি। দাদা, ওঠো। বেশি সময় নেই।
